দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উত্তেজিত হওয়ার–অন্তত ভাবিত হওয়ার–যথেষ্ট কারণ ছিল। প্রথম ছিল দুর্ভিক্ষাবস্থা। এ-নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার অবধি ছিল না। বাংলাদেশে খাদ্যাভাব নিয়ে একটি ব্রিটিশ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তৈরি তথ্যচিত্র আমরা দেখলাম টেলিভিশনে। লঙ্গরখানার ছবি–আনজুমানে মফিদুল ইসলামের গাড়িতে লাশ নিয়ে যাচ্ছে–তার ছবি। এক বৃদ্ধা লাঠিতে ভর করে কোনোমতে লঙ্গরখানায় যাচ্ছেন। যে-বাঙালি ছেলেটি দোভাষীর কাজ করছে, সে তাকে জিজ্ঞাসা করলো, তার কী অসুবিধে। বৃদ্ধা বললেন, বাতের কষ্ট। ছেলেটি ইংরেজি করে বললো, ভাতের অভাব। পরিবর্তনটা ইচ্ছাকৃত। আমি বললাম, এটা অসংগত, বিকৃতি। কামাল তাতেই খুশি–টেলিভিশনের শ্রোতারা বেশির ভাগ তো ইংরেজিটাই মানবে।
খাদ্য-পরিস্থিতি ছাড়াও রক্ষীবাহিনী নিয়ে বিতর্ক আছে। তার ওপর রাজনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে পড়েছিল। ডিসেম্বরের শেষে সারা দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা, মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়ে যায়। আমার খালি মনে হয়, মাত্র দু বছর আগে যে-সংবিধান রচিত হলো এত কষ্টে ও এত যত্নে, কী হলো তার হাল!
লিডস থেকে ফিরে আসতে আসতে জরুরি ক্ষমতা আইন ঘোষিত হলো। সেই আইনবলে সভা, সমাবেশ, ধর্মঘট নিষিদ্ধ হয়ে গেল। তার আগে পুলিশের হাতে আটক অবস্থায় সিরাজ শিকদার নিহত হলেন। সংসদে এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু এমন উক্তি করলেন যা মানবিক নয়!
আমি কখনোই সিরাজ শিকদারের রাজনীতির সমর্থক ছিলাম না। শ্রেণিসংগ্রামের নামে তাঁর দলীয় কর্মীদের হাতে অনেক নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, বহু পরিবার ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু বিনাবিচারে পুলিশের গুলিতে কারো মৃত্যু কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। সংসদে বঙ্গবন্ধু যা বললেন এবং যেভাবে বললেন, তাঁর মতো সংগ্রামী রাজনীতিকের ও দরদি মানুষের তা উপযুক্ত হয়নি। আমার মন খারাপ হয়ে গেল।
৭.
১৯৭৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি মন্ত্রিত্ব থেকে ছুটি নিয়ে কামাল হোসেন অক্সফোর্ডে চলে এলেন অল সোলস কলেজের ফেলো হয়ে। সঙ্গে তার পরিবারের সকলে। প্রথম সুযোগেই আমরা সবাই মিলে অক্সফোর্ডে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করে এলাম। তখন জানলাম, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ড. নূরুল ইসলাম সরকার থেকে পদত্যাগ করে সেন্ট অ্যান্থনিজ কলেজে যোগ দিয়েছেন ফেলো হয়ে।
সেদিন রোববার ছিল। আমি একাই লন্ডন থেকে গেছি অক্সফোর্ডে। কামালের বাড়িতে নূরুল ইসলামকে পেলাম। খানিকক্ষণ পরে এক বাঙালি ছাত্র এসে খবর দিল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার এবং একটিমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও বাকশালের সভাপতির পদ গ্রহণ করেছেন। শুনে আমি খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়লাম। নূরুল ইসলাম আমাকে বললেন, ‘অত চিন্তার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশে কোনো ব্যবস্থাই ঠিকমতো চলে না। দেখবেন, আপনি যেরকম একদলীয় ব্যবস্থার কথা ভেবে দুশ্চিন্তা করছেন, আসলে ব্যাপারটা সেরকম হবে না। কামালের প্রতিক্রিয়া থেকে ধারণা হলো, এমন যে কিছু একটা হতে যাচ্ছে, তা তিনি জানতেন। আমার এখন প্রত্যয় হলো যে, এই ধরনের অবস্থা থেকে নিজেকে বিযুক্ত রাখতেই তিনি লেখাপড়ার জগতে ফিরে এসেছেন।
আমার মনে পড়ল, আমার বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের সহপাঠী, সিভিল সার্ভিসের সদস্য, সদ্য পাকিস্তান-প্রত্যাগত ড. আবদুস সাত্তার একদিন ঢাকায় কামালের বাড়িতে বসে তানজানিয়ার আদর্শে বাংলাদেশে একদলীয় সরকারপদ্ধতি প্রবর্তনের পক্ষে খুব যুক্তি দিচ্ছিলেন। কামাল তাঁকে এসব কথা বলতে নিষেধ করেন এবং এক পর্যায়ে তার বাড়ি থেকে সাত্তারকে চলে যেতে প্রায় বাধ্য করেন। তবে এতে একদলীয় রাষ্ট্রের পক্ষে সাত্তারের অভিযান ব্যাহত হয়নি। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু আমার সামনে একাধিকবার বলেছেন, আমি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র দুইই চাই একসঙ্গে। তবে যদি সমাজতন্ত্রের জন্যে গণতন্ত্র ছাড়তে হয়, তাহলে আমি তা-ই করবো। একবার একজন সংসদ-সদস্য যুগোস্লাভিয়া থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুর কাছে সে-দেশের খুব সুখ্যাতি করছিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘টিটোকে তো আর বিরোধী দল কি লালবাহিনী সামলাতে হয় না? তখন বোধহয় লালবাহিনী একদিন ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু। আমাকে বললেন, ‘কোথাও সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকে, এমন শুনেছ?’ (বাকশাল-গঠনের ঠিক আগে জরুরি ক্ষমতা আইনে শ্রমিক লীগের সভাপতি ও লালবাহিনীর প্রধান, সংসদ-সদস্য আবদুল মান্নানকে গ্রেপ্তার করা হয়।) বঙ্গবন্ধুর এসব কথার তাৎপর্য এখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
লন্ডনে ফিরে এসে আবদুল গাফফার চৌধুরীকে ফোন করলাম। বাকশালের প্রতিষ্ঠায় তিনি আমারই মতো উদবিগ্ন। পরে অবশ্য তাঁর মত পালটে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি প্রকাশ্যেই বাকশালের সমর্থনে লিখেছেন ও বলেছেন। আমি তখনো ভেবেছি এবং এখনো মনে করি, বাকশাল গঠন করাটা ভুল হয়েছিল।
চতুর্থ সংশোধনীর বিরোধিতা করে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন জেনারেল এম এ জি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। বাকশালে যোগ না দেওয়ায় পরে সংসদ-সদস্যপদ হারান আবদুল্লাহ সরকার ও মইনুদ্দীন আহমদ মানিক। কিন্তু জনে জনে দলে দলে নানা পেশার নানা বয়সের নানা দলের লোক একাকী কিংবা শোভাযাত্রা করে বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন। মেজর-জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ সশস্ত্র বাহিনীর কাউকে কাউকেও বাকশালে যুক্ত করা হয়েছিল। তখন যারা সোৎসাহে বাকশালে যোগ দেন, বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরে তারা অনেকে তেমনি উৎসাহের সঙ্গে বাকশালের নিন্দা করেছিলেন।
৮.
সোয়াসের লাইব্রেরিতে কাজ করতেন আমার শিক্ষক সৈয়দ আলী আশরাফের শ্যালিকা। তিনি একদিন আমার কাছে জানতে চাইলেন, বাংলাদেশে নাকি আজান দেওয়া বন্ধ এবং মসজিদে গিয়ে নাকি নামাজ পড়া যায় না? অপপ্রচার কতদূর গড়াতে পারে এবং তাতে মানুষ কতটা আস্থা স্থাপন করতে পারে, সে-কথা ভেবে আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাকে বললাম, এটা সর্বৈব মিথ্যে প্রচারণা–ওর সত্যতা তাঁদের ভাইজানের–অর্থাৎ সৈয়দ আলী আহসানের কাছ থেকেই তারা জেনে নিতে পারেন। মনে হলো, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আলী আহসান ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে তার ওপরে তাদের আস্থা বিচলিত হয়েছে।
