ই ই টেম্পল উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করে আমাকে বসতে বললেন, তবে আমার প্রার্থনায় তিনি যে বিরক্ত হয়েছেন, তা আমার অগোচর রইলো না। তিনি বললেন, বৃত্তির শর্ত সম্পর্কে তোমাকে তো আরেকবার বলার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া আমরা চাই না, আমাদের বৃত্তিভোগী কেউ রাজনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ুক। আমি একটু চমকে উঠে বললাম, রাজনৈতিক কাজ আবার কোথায়? জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ হলেও না হয় বুঝতাম–আমি তো যেতে চাইছি ইউনেসকোর সাধারণ পরিষদে–সেটা তো শিক্ষাসংস্কৃতিমূলক কাজ। ভদ্রলোক ঈষৎ হাসির ভঙ্গি করলেন। বললেন, জাতিসংঘে এবং তার সকল অঙ্গ সংগঠনেই রাজনীতি আছে–দল আছে, গোষ্ঠী আছে; মত আছে, মতান্তর আছে; তদবির আছে, ভোটাভুটি আছে; প্রতিযোগিতা আছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে; পক্ষ আছে, বিপক্ষ আছে। আমাদের বৃত্তিভোগীরা তার সঙ্গে যুক্ত হবে, সেটা কেউ চাইবে না। তোমার সরকারকে তুমি বুঝিয়ে বোলো, এইখানে তোমার গবেষণার সময়টায় তারা যেন তোমাকে নিশ্চিন্ত থাকতে দেয়। সেটা তোমার পক্ষে ভালো, আমাদের পক্ষেও সুবিধেজনক।
আমি পালাতে পারলে বাঁচি। সেখান থেকে সরাসরি আমাদের হাই কমিশনে এসে কামালকে বার্তা পাঠালাম–আমি যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছি না, বিকল্প প্রতিনিধি মনোনীত করুন।
৬.
ব্রিটিশ কাউনসিল থেকে একদিন কাজ সেরে বেরিয়ে আসছি। দেখা হয়ে গেল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ড. রশিদুল হকের সঙ্গে। তিনি আমার আগের বছরে একই বৃত্তি নিয়ে এখানে এসেছিলেন। এখন ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, ফিরে যাওয়ার কথা তিনি ভাবছেন না।
কারণটা বুঝতে আমার বিলম্ব হয়নি। বিষয়টি সংক্ষেপে বললে বোঝা যাবে কি না জানি না, কিন্তু সবিস্তারে বললে হয়তো পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। রশিদুল হক যখন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সপরিবারে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন তাঁর ভগ্নিপতি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তা আতাউর রহমান কিছুটা দেরিতে হলেও পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। ১৯৭২ সালে বিদেশ থেকে তিনি তাঁর জিনিসপত্র পাঠিয়ে দেন রশিদুল হকের কাছে। বাড়িতে স্থান সংকুলান হবে না জেনে রশিদুল হক সেগুলো রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের কেন্দ্রীয় গুদামে। হঠাৎ ছাত্রলীগের কিছু কর্মীর নেতৃত্বে একদল ছাত্র এক রাতে এইসব জিনিসপত্র নিয়ে এমন হই-হাঙ্গামার সৃষ্টি করে যে, রশিদুল হক বিস্মিত, অপদস্থ ও বিমূঢ় হয়ে যান। এ ঘটনায় তার প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়। তিনি যে চট্টগ্রামে ফিরতে চাননি, আমার বিশ্বাস, সেটিই ছিল তার প্রধান কারণ। কিছুকালের মধ্যে তিনি লিবিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে সরাসরি চলে যান। তার বহু বছর বাদে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
লন্ডনে রশিদুল হকের সঙ্গে কথা বলে আমি যখন তাঁর মনোভাব আঁচ করতে পারি, তখন গভীর দুঃখ পেয়েছিলাম। তাঁর মতো দেশপ্রেমিক ও কৃতী অধ্যাপক মনের দুঃখেই যে দেশে ফিরতে চাইলেন না, সে-ক্ষতি তাঁর একার নয়।
ক্রিসমাসের অবকাশে লিডসে গেলাম সবাই মিলে। আবদুল মোমেন ও রোজীর বাড়িতে ওঠা গেল। মোমেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের আগেই তিনি লিডসে এসেছিলেন উচ্চশিক্ষা নিতে। মুক্তিযুদ্ধের কাজে নিজেকে জড়িত করায় তার পড়াশোনার কিছু ব্যাঘাত ঘটেছিল এবং আমরা যখন বিলেতে যাই তখনো তার রেশ কাটেনি। লিডসে আমাদের বন্ধু ওসমান জামাল ও মঞ্জু থাকতেন। জামালও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমরা সামান্য কিছু আগে-পরে কাটিরহাট-রামগড়-আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছেই। জামাল একসময়ে লিডসে একটি স্কুলে পড়াতেন। কলকাতা থেকে তিনি সে-কাজে ফিরে যান। পরে মঞ্জু তার সঙ্গে যোগ দেন এবং তারা লিডসেই পাকাপাকিভাবে রয়ে যান। এই দুই পরিবারের বাইরে লিসে গিয়ে দেখা পেলাম কুদুস ও রেশমা, বেণু ও শাহীন এবং ইকবাল ও সাকীর। তাছাড়া আমারই মতো লন্ডন থেকে গেছেন সিভিল সার্ভিসের কামাল সিদ্দিকী–তিনিও তখন সোয়াসে পিএইচ ডি ডিগ্রির জন্যে গবেষণা করছেন। তার বোন পড়ে লিডসে–তার কাছেই গেছেন তিনি। বাঙালি আড্ডার জন্যে ও-ই যথেষ্ট সমাগম। বাঙালি আড্ডায় যেমন হয়, রাজনীতিই চলে আসে আলোচনার কেন্দ্রে।
সরকারি কর্মকর্তা হলেও কামাল সিদ্দিকীর রাজনৈতিক সত্তা প্রবল। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কঠোর সমালোচক–প্রবল বিরোধী বললেই ঠিক বলা হয়। সমাজতন্ত্রে নিবেদিতপ্রাণ মোমেনও সরকারের সমালোচক, তবে কামালের মতো অত তীব্র নন। জামাল প্রকৃতিগতভাবেই মৃদুভাষী ও মৃদুকণ্ঠ–তিনি সর্বদিক দেখতে অভ্যস্ত, এবং শুনতে অধিক আগ্রহী। সরকারের দোষত্রুটি কিছু দেখতে পেলেও আমি মোটামুটি তাকে সমর্থন করছি। এই অবস্থায় কামাল সিদ্দিকীর উত্তেজনা কিছু বাড়ে।
একরাতে এমনি উত্তেজিত আলোচনার মুখে আনন্দ আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে আড্ডারত মহিলাদের খবর দিলো, ও ঘরে ‘গোমলাল’ লেগে গেছে। কামালের বোন হেসেই অস্থির। সে আনন্দকে দেখে বলতো, ‘একেবারে মেজো ভাই’ অর্থাৎ কামাল সিদ্দিকী। আনন্দের চোখদুটো বড়ো, চুলও ছিল লম্বা–কোথাও তাদের সাদৃশ্য থেকে থাকবে।
