তাজউদ্দীনের কাছ থেকে ফিরলাম একটু বিচলিত হয়েই। কিন্তু তাকে নিয়ে আরো বিষণ্ণতা আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। তিনি যে মন্ত্রিত্ব ছাড়বেন, সেকথা বোধহয় বেশি লোককে বলে ফেলেছিলেন। ফলে দেশে ফেরার কয়েকদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে লিখিত নির্দেশ পেলেন পদত্যাগ। করবার। অক্টোবরের শেষেই তিনি পদত্যাগপত্র পেশ করলেন, কেবল স্বেচ্ছায় মন্ত্রিত্বত্যাগের সম্মানটুকু থেকে বঞ্চিত হলেন। আমরা যারা ঘটনাধারার সঙ্গে পরিচিত, তারা জানি, তাজউদ্দীন যথার্থই ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু পাথুরে প্রমাণ রয়ে গেল যে, তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এমনকী, কী ভাষায় তিনি পদত্যাগপত্র লিখবেন, তাও স্থির করার সুযোগ পাননি। এই অসম্মান তার প্রাপ্য ছিল না।
লন্ডনের ওই সাক্ষাঙ্কারই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা।
৫.
লন্ডনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সৈয়দ আবদুস সুলতান আমার পূর্বপরিচিত–রাজনীতি ও ওকালতির পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা করেন, আমার আব্বার সঙ্গে তাঁর আলাপ ছিল কলকাতা থেকে, তার এক মেয়ে ও এক ছেলের আমি সরাসরি শিক্ষক। ছেলেটি তার সঙ্গেই তখন লন্ডনে ছিল, ওয়েস্ট এন্ডের একটি সিনেমায় আশারের–দর্শকদের আসন দেখিয়ে দেওয়ার–কাজ নিয়েছিল। তাতে তার বাবার খুব আপত্তি–হাই কমিশনারের ছেলে হবে থিয়েটারের আশার! ফিরোজ বলে, আপনারা না শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কে রচনা লিখতে শিখিয়েছেন! নিজের যোগ্যতায় যে কাজ পাই, তাই করে খাবো। বাবার ঘাড়ে বসে খাওয়ার চেয়ে তো ভালো। হাই কমিশনার একদিন বেবীকে ও আমাকে তার বাসভবনে দাওয়াত করে খাইয়েছিলেন–সেদিন অবশ্য ফিরোজ ছিল না। তিনি থাকতেন পাটনিতে, বেশ বড়ো একটা বাড়িতে। তা নিয়ে লন্ডনের বাঙালিরা সমালোচনা করতো এই বলে যে, আমাদের মতো দরিদ্র দেশের হাই কমিশনারের পক্ষে অমন বাড়িতে থাকা বিলাসিতা। কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
ডেপুটি হাই কমিশনার ছিলেন ফারুক চৌধুরী–বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে আমার এক ক্লাস ওপরে পড়তেন। আগের মতোই হাশিখুশি দিলখোলা আছেন। আমার সহপাঠী নূরুল মোমেন খান ওরফে মিহির ছিল কাউনসেলর। সেকেন্ড সেক্রেটারি এ কে এম আবদুর রউফের কথা আগেই বলেছি–তার সৌজন্যে মাঝেমাঝে শুল্কমুক্ত পানীয় ও সিগারেট সংগ্রহ করা যেতো। সব মিলিয়ে লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের পরিবেশ আমার জন্যে বেশ অনুকূল ছিল।
অক্টোবর বা নভেম্বরে হাই কমিশনের মাধ্যমে কামাল হোসেনের চিঠি পেলাম–ইউনেসকো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে প্যারিসে যাওয়ার জন্যে আমি যেন প্রস্তুতি নিই।
ব্যাপারটা এরকম। ইউনেসকোর সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের জন্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল যাবে। নেতৃত্ব দেবেন শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী। দেশের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে সদস্যসংখ্যা কম রাখা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন প্রস্তাব করলেন, প্রতিনিধিদলে আমাকে সদস্য রাখা হোক–আমি লন্ডনে আছি, সেখান থেকে আমাকে প্যারিসে পাঠাতে সরকারের খরচা কম পড়বে। আসলে ব্যয়সংকোচটা বড়ো কথা নয়, আমাকে দলে অন্তর্ভুক্ত করার অজুহাত মাত্র, তবে সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের কাছে তা গ্রাহ্য হয়েছিল।
আমার পক্ষে তখন যুক্তরাজ্যের বাইরে যেতে হলে আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বৃত্তিদাতাদের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন, কেননা বৃত্তির একটা শর্ত ছিল এই যে, বৃত্তিভোগকালে ওই গবেষণার কাজ ছাড়া আমি অন্য কিছু করবো না। এখন একটা দরখাস্ত করলাম–আমাকে কয়েকদিনের ছুটি দেওয়া হোক বিনাবৃত্তিতে, আমি ইউনেসকোর সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেবো, ফিরে এসে আবার গবেষণার কাজ ধরবো। দরখাস্ত নিয়ে প্রথমে গেলাম প্রফেসর রাইটের কাছে। এমন আবদারের জন্যে তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না–কী করবেন, কী লিখবেন, কিছুই ভেবে পাচ্ছিলেন না। শেষে অ্যাসোসিয়েশন অফ কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটিজের অফিসে রেবেকা জেমসকে ফোন করে জানালেন তার বিপত্তির কথা। তারপর আমাকে বললেন, আবেদনপত্রটা আমি ফরোয়ার্ড করে দিই ওদের কাছে, কেমন? অর্থাৎ সুপারিশ করার কাজটা এড়িয়ে গেলেন। আমি তখন আবেদনপত্র নিয়ে গেলাম মিসেস জেমসের কাছে। তিনি মৃদু হেসে বললেন, মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে তুমি একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ-নইলে সরকার তোমাকে ইউনেসকোতে পাঠাতে চাইবে কেন? তবে বৃত্তির যা শর্ত, তাতে তোমাকে ব্রিটেনের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া শক্ত–তাও এমন কাজে যার সঙ্গে তোমার গবেষণার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে তুমি যেতে পারলে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুশিই হবো-আর কিছু না হোক, তোমার একটা অভিজ্ঞতা হবে বলে। তাছাড়া, প্যারিস–ও, সেখানে আগে গেছো? তা হোক–ওটা এমন শহর যেখানে বারবার যাওয়া যায়। তোমার আবেদনপত্রটা নিয়ে আমি সেক্রেটারির কাছে যাই–দেখি, কর্তা কী বলেন!
খানিক পর ফিরে এসে বললেন, সেক্রেটারি তো তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দিলেন না। কাগজটা রেখে দিলেন। তুমি আমাকে পরশু সকালে একবার ফোন করবে? কী স্থির হয়, তোমাকে জানাবো। তোমাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেললাম বলে দুঃখিত।
তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে এলাম। যথাসময়ে ফোন করলাম। তিনি বললেন, আজ কি তুমি সারাদিনের মধ্যে একবার আসতে পারো? সেক্রেটারি কথা বলতে চান তোমার সঙ্গে।
