Birbeck, and Brougham, and Gregory,
And other Wicked People,
Had laid a Plan to undermine
The Church, if not the Steeple!
The London University!
O what a shocking notion;
To think of teaching anything
But Church and State devotion!
অন্যপক্ষে, পাঠ্যবিষয় হিসেবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম প্রবর্তিত হয় ইংরেজি সাহিত্য এবং আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ছাড়াও নানান আধুনিক ভারতীয় ভাষা। পরে এশিয়া ও আফ্রিকার ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি–এসব অধ্যয়নের জন্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড অ্যাফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) পত্তন হয়। আমি এই সোয়াসেই যুক্ত থাকতে যাচ্ছি।
প্রথম দিনে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান অ্যান্ড সিলোন বিভাগের প্রধান প্রফেসর রাইট আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন এবং সংস্কৃতের অধ্যাপকরূপে সম্প্রতি প্রদত্ত তাঁর উদ্ববাধনী বক্তৃতার একটি কপি উপহার দিলেন। সোয়াসে যা যা করার দরকার–সিনিয়র কমনরুম ব্যবহারের সুযোগ, লাইব্রেরি কার্ডের ব্যবস্থা–এসব করে দিলেন এবং আমাকে যে একটা ঘর বরাদ্দ করতে পারছেন, তার জন্যে দুঃখপ্রকাশ করলেন। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু-উপলক্ষে সেদিন সন্ধ্যায় শিক্ষকদের একটা পার্টি ছিল। রাইট তাতে আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁর কথামতো আমি তাঁর সঙ্গেই পার্টিতে গেলাম এবং তিনি নিজেই অন্তত বিশ-পঁচিশ জন শিক্ষকের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। এই পার্টিতেই হিন্দির শিক্ষক ড. পাণ্ডের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল–আমি যখন শিকাগোতে ছিলাম, তখন তিনি সেখানে হিন্দির লেকচারার ছিলেন। উর্দু ও পাঞ্জাবির শিক্ষক ড. রাসেলের সঙ্গে সেখানে পরিচয় হয়–ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতার দক্ষ অনুবাদক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন। অর্থনীতির রিডার ড. কে এন [কীর্তিনারায়ণ] চৌধুরীকেও সেখানে। পেলাম–তিনি নীরদচন্দ্র চৌধুরীর মধ্যম পুত্র। যেহেতু রাইট আমাকে বলে কয়ে পার্টিতে নিয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গে করে, আমি লক্ষ রাখছিলাম, উনি কখন পার্টি ছেড়ে যান। উনি বেরোবার উপক্রম করতে আমিও তার সঙ্গে যোগ দিলাম। মনে হয়, এতে তিনি খুশি হয়েছিলেন। রাইট মানুষ ভালো, তবে তাঁর মধ্যে আনুষ্ঠানিকতার একটা ব্যাপার ছিল। আনিস বলা দূরে থাক, তিনি আমাকে আনিসুজ্জামান বলেও ডাকতেন না, সব সময়ে প্রফেসর আনিসুজ্জামান। বলে সম্বোধন করতেন। আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে কি না সে-বিষয়ে জানতে চাইতেন, কিন্তু আমার কাজের অগ্রগতি সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করতেন না। ফলে তাঁর সঙ্গে আন্তরিক কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারেনি।
সকালে প্রফেসর রাইটের কক্ষ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের ঘরে। আগের বার যখন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তিনি অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর স্ত্রীর জন্যে কালো জমিনের একটা জামদানি শাড়ি নিয়ে যেতে। আমার শ্যালিকা নাজু তার পরিচিত কারিগর দিয়ে তা বানিয়ে দিয়েছিল। সেটা সমর্পণ করা গেল তাঁর হাতে। স্থির হলো, দুপুরে সিনিয়র কমনরুমে একসঙ্গে যাবো, সন্ধ্যার পার্টিতেও আবার মিলিত হবো। তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন লাইব্রেরিয়ান বি সি ব্লুমফিল্ডের কাছে। ব্লুমফিল্ড সদাশয় ব্যক্তি। মুখে প্রায় সর্বদা হাসি লেগে আছে এবং সে-হাসি প্রায়ই কৌতুকের। সোয়াসের লাইব্রেরির জন্যে আমি বই নিয়ে গেছি বলে তিনি অনেক ধন্যবাদ জানালেন। ড. বোলটন সে-বছরটায় ছুটি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও প্রধানত ওড়িশায় এসেছিলেন গবেষণা ও দেখাসাক্ষাতের কাজে–তাই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হলো না।
তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের অফিসকক্ষের অদূরে রাজেশ্বরী দত্তের অফিসঘর। তিনি সোয়াসে সংগীতের প্রভাষক। শিকাগো ছাড়ার পর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি, কিন্তু তিনি চিনতে পারলেন ঠিকই। পরে জেনেছিলাম, প্রফেসর রাইটের কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন যে, আমি সোয়াসে আসছি। সোয়াসে আমার অফিসঘর থাকবে না জেনে তিনি বললেন, ‘বোলটন তো এ-বছরটা থাকবে না। ওর ঘরটা তোমায় দেয় না কেন?’ বললাম, ‘শুনেছি, বিষয়টা বিবেচনা করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর অসুবিধে সৃষ্টি না করার সিদ্ধান্ত হয়। রাজেশ্বরী যুক্তিটা মানতে চাইলেন না। সন্ধ্যার পার্টিতে তাঁর সঙ্গেও সাক্ষাৎ হলো।
সোয়াসে প্রথম দিনটা আমার বেশ ভালো কাটলো।
৩.
আমার গবেষণার উপকরণ সোয়াসের লাইব্রেরিতে তেমন ছিল না। তবে অন্যান্য বিষয়ে পড়ালেখার জন্যে এ-গ্রন্থাগার আমার বেশ কাজে এসেছিল। আমি কাজ করেছিলাম ব্রিটিশ মিউজিয়ম লাইব্রেরিতে এবং প্রধানত ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। আগেরবার যেখানে কাজ করেছিলাম, ব্রিটিশ মিউজিয়ম লাইব্রেরি তখনো সেখানেই অর্থাৎ মিউজিয়ম-ভবনেই ছিল। কিন্তু আগের জায়গা থেকে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি উঠে এসেছিল ব্ল্যাকফ্রায়ার্স রোডে–ওল্ড ভিক ও ইয়ং ভিক থিয়েটারের কাছে। ব্রিটিশ মিউজিয়ম লাইব্রেরিতে প্রথমে যে-কার্ড করেছিলাম ১৯৬৫ সালে, তার সূত্র ওঁরা খুঁজে বের করলেন এবং সেটারই নবায়ন হলো। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে অবশ্য নতুন করে কার্ড করতে হলো।
প্রথম দু-একদিনে এসব কাজ সারলাম। তারপর গেলাম বুশ হাউজে-বিবিসি বাংলা বিভাগে। জন ক্ল্যাপহাম সেখানে অধিকর্তা–একদা পাদরি ছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে অনেককাল বাস করেছেন। তার পরে আসেন কমল বোস। সৈয়দ শামসুল হক বলতেন, বুশ হাউসের ভিত্তির কাজ করার সময়ে রাজমিস্ত্রি দেখলো একটা লম্বা ছায়া পড়েছে ইটের ওপর–ফিরে তাকিয়ে সে যাকে দেখতে পেলো, তিনিই কমল বোস। তার পরে আছেন সিরাজুর রহমান–আমাদের সিরাজ ভাই–আমার অনেকদিনের পরিচিত। তারপর শ্যামল লোধ, নূরুল ইসলাম, দীপংকর ঘোষ, সৈয়দ শামসুল হক। চাকুরে না। হয়েও প্রোগ্রাম করতে আসেন অনেকে-নাজির আহমদ, নূরুস সাফা, নরেশ ব্যানার্জি, ঝর্ণা গোরলে, শফিক রেহমান, তালেয়া রেহমান, ওয়ালী আশরাফ, মানসী বড়ুয়া, আরো কেউ কেউ। সিরাজ ভাই আমাকেও সেই দলে ভিড়িয়ে দিলেন।
৪.
মাসাধিককাল বিদেশ সফরশেষে দেশে ফেরার পথে তাজউদ্দীন আহমদ লন্ডনে এলেন অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। খবর পেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম হোটেলে। অনেক লোকজন ছিলেন সেখানে। আমরা তার শয়নকক্ষে গিয়ে বসলাম, কিন্তু সেখানেও কেউ কেউ ঢুকে পড়লেন। তাজউদ্দীন কথা বললেন। একটু ছাড়া-ছাড়াভাবে, যেন কিছুটা অন্যমনস্ক। বিভিন্ন দেশ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে তিনি খাদ্যসাহায্য চেয়েছেন, বন্যা-নিয়ন্ত্রণে ও অধিকতর সার-উৎপাদনে অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্যে তাদের সহযোগিতা কামনা করেছেন। এই মুহূর্তে খাদ্যপরিস্থিতি নিয়ে তিনি বেশি চিন্তিত। সরকারি লঙ্গরখানা খোলা হয়ে থাকলেও মানুষ অনাহারে মরছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো নয়। তবে তাঁর সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা এই নিয়ে যে, স্বনির্ভর হওয়ার পথে আমরা এগোতে পারছি না। রাজনৈতিক সহনশীলতারও বড়ো অভাব। মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত। ওয়াশিংটন থেকে দেশে ফিরেই তিনি ইস্তফা দেবেন।
