অ্যাসোসিয়েশন অফ কমনওয়েথ ইউনিভার্সিটিজের পক্ষ থেকে আমাদের স্প্রেংগার মনোজ্ঞ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আরো কেউ কেউ কিছু বলেছিলেন–কিন্তু তা বোধহয় আমার মনে দাগ কাটেনি। বক্তৃতার আগে ছিল পানপর্ব, পরে ভোজনপর্ব। পানপর্বের সময়ে ঘুরতে ঘুরতে রেবেকা জেমসের সঙ্গে দেখা হলো–আমাকে দেখে তিনি প্রীতি প্রকাশ করলেন। একটু পরে দেখি, ক্যাথি কারো সঙ্গে কথা বলছে। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে একটু অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের সঙ্গে আমাকে সম্বোধন করলো এবং তারপর কেবল আমার সঙ্গেই কথা বলতে থাকলো। ফলে তার সঙ্গী ভদ্রলোক সরে গেলেন। সেই সন্ধ্যায় এবং তার পরে একাধিক দিন ক্যাথি আমাকে বলেছিল যে, তার কাছে তখন আমাকে মনে হয়েছিল ঈশ্বরপ্রেরিত তারণকর্তা। ভদ্রলোকের অখণ্ড ও অতিরিক্ত মনোযোগ সে কিছুতেই এড়াতে পারছিল না, যদিও তার সঙ্গে তার আলাপ হয় মাত্র ওই সন্ধ্যায়ই। কাজেই আমি কাছে যেতেই আমাকে আঁকড়ে ধরে সে পরিত্রাণের পথ খুঁজলো। এই ঘটনা নিয়ে আমরা অনেক হাসাহাসি করেছি।
আমাদের যাতায়াত ও বৃত্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে থাকার ব্যবস্থা ছিল ব্রিটিশ কাউনসিলের নিয়ন্ত্রণে। আমাদের আচরণীয় ও অনাচরণীয় কী, তা বোঝাতে একটা অধিবেশন হলো। কমনওয়েলথ ও ব্রিটিশ কাউনসিলের অন্যান্য বৃত্তি নিয়ে যারা গেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই তরুণ–প্রথমবার বিদেশের মাটিতে পা দিয়েছেন। অ্যাকাডেমিক স্টাফ ফেলোশিপ পাওয়া আমরা কজন শুধু একটু অভিজ্ঞ। সুতরাং অনেক সামান্য কথা শুনতে হলো এবং অনেকরকম ফরম হাতে পাওয়া গেল–তার মধ্যে ঘরবাড়ির উদ্দেশ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুপারিশ সংবলিত কাগজ–এসবও ছিল। সভার শেষে আমি যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে একটা কাগজে আমার ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ লিখে দিয়েছিলাম, ভদ্রমহিলা বিস্মিত ও পুলকিত হয়ে বললেন, ‘আহ্, সবাই যদি তোমার মতো স্বনির্ভর হতো!’
একটা বড়ো কাজ বাকি রইলো–রুচি-শুচিকে স্কুলে ভর্তি করা। শুচি এই প্রথম স্কুলে যাবে। তার ব্যবস্থা সহজেই হয়ে গেল। বয়সের হিসেবে রুচিকে যেতে হবে মিডল স্কুলে। আমাদের বাড়ির কাছেই আছে আলফিয়া মিডল স্কুল–কিন্তু সেখানে ওর ক্লাসে সিট খালি নেই। কদিন ঘোরাঘুরির পরে বরা অফ মর্ডেনের শিক্ষা-কর্তৃপক্ষকে বিষয়টা জানালাম। তারা একদিন আমাকে ডেকে পাঠালেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত তরুণী বললো, আলফিয়ায় তারা চেষ্টা করছে, সেখানে ভর্তি করা না গেলে রুচিকে যেতে হবে একটু দূরের স্কুলে। তবে শিক্ষা কর্তৃপক্ষের বাস আছে–তাতে করে সে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে পারবে। তবু রুচির এবং আমাদের কিছুটা অসুবিধে হবে। তা স্বীকার করতে আমরা প্রস্তুত কি না? আমি বললাম, তাই সই। মেয়েটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এলাম। কদিন পরে সে ফোন করে জানালো, সুসংবাদ আছে, আলফিয়ায় তোমার মেয়ের ভর্তির ব্যবস্থা করা গেছে–কালকের মধ্যেই সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হবে। পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আমি তখনই স্কুলে ছুটলাম।
স্কুল থেকে বলে দেওয়া হয়েছিল যে, আমরা যেন বাড়িতে ওদের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা না বলে সর্বদা ইংরেজি বলি। বুঝতে পারি, তাতে ওদের ইংরেজি শেখার সুবিধে হবে। রুচিকে আবার দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে স্কুলে ফরাসি নিতে হয়েছে। ফলে নানা ভাষার চাপ বা দ্বন্দ্ব যত কম হয় তত মঙ্গল। কিন্তু বাড়িতে বাংলা না-বলার কথা আমরা ভাবতে পারলাম না। ঠিক করলাম, ওদের সঙ্গে একযোগে বাংলা-ইংরেজি বলব। যদি ইংরেজি বাক্য ব্যবহার করি, সঙ্গে সঙ্গে তার বাংলাটা বলব; আর যদি বাংলায় কিছু বলি, তবে তার ইংরেজি অনুবাদও করে দেবো একসঙ্গে। ব্যবস্থাটা বোধহয় মন্দ হয়নি। মাঝে পড়ে আনন্দ, দেখি, টেলিভিশন থেকে, আশপাশ থেকে, বোনদের কাছ থেকে ইংরেজি শিখে নিচ্ছে। একবার বোধহয় কেউ একটা দুষ্কর্ম করেছিল। কে করেছিল, অনুসন্ধান করায় আনন্দকে বলতে শুনলাম, শি ডিড ইট–আই ডিডন্ট ডু ইট। আনন্দের বয়স তখন আড়াই হয়েছে কী হয়নি।
শি মানে শুচি। সে স্কুলে পৌঁছে মায়ের হাত ছেড়ে ক্লাস-টিচার মিসেস বোরেটের হাত ধরতো। দিনের শেষে আবার তার হাত ছেড়ে মায়ের হাত। ভদ্রমহিলা ধৈর্য ধরে শুচির আবদার মেনে চলতেন। শুচি স্কুলে ছবি আঁকতে ভালোবাসততা এবং ভালো ছবি আঁকতো। ওর শিক্ষয়িত্রী তাতে খুব প্রীত ছিলেন।
দেশের মতো বিদেশেও সংসারের সব দায়িত্ব ছিল বেবীর। সকালবেলায় আমাদের নাশতা খাইয়ে ছেলেমেয়েদের তৈরি করে কখনো তিনজনকে নিয়ে, কখনো মেয়ে দুজনকে নিয়ে আলাদা আলাদা স্কুলে পৌঁছোনো। বিকেলে আবার আনন্দকে প্র্যামে ঠেলে নিয়ে মেয়েদের স্কুল থেকে আনা। মাঝে বাজার-সওদা করা, রান্নাবান্না সারা, কাপড়চোপড় ধোওয়া, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা। তবে তাতে তার আনন্দের ঘাটতি হতো না।
২.
ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্রিটেনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে পরে, ব্রিটেনের মধ্যেও ইংল্যান্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটে কিছুটা দেরিতে। অকসফোর্ড বারো শতকে আর কেমব্রিজ তেরো শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই তুলনায় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় একেবারেই শিশু–এর সূচনা ১৮২৮ সালে, তবে রাজকীয় সনদ পেতে আরো সাত বছর লেগে যায়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কিন্তু লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিল একাধিক বিষয়ে। প্রথমত, এর দ্বার উন্মুক্ত হয় সকল সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রীর জন্যে; দ্বিতীয়ত, পাঠ্যবিষয় থেকে এখানে ধর্মতত্ত্ব বাদ পড়ে। তাছাড়া গির্জার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এর পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। এসব সিদ্ধান্ত এমনই আলোড়নের সৃষ্টি করে যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়-প্রতিষ্ঠায় অনেক বাধা দেওয়া হয়েছিল। তাতে সফল না হওয়ায় এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অভিহিত করা হয় ‘গাওয়ার স্ট্রিটের নিরীশ্বর প্রতিষ্ঠান’ বলে, আর সমকালীন এক ব্যঙ্গ-কবিতায় লেখা হয় :
