এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার অধ্যাপকের সেই পূরণ-না-হওয়া পদটি বিজ্ঞাপিত হয়েছে। মোহাম্মদ আবু জাফর বিভাগের আরো কয়েকজন তরুণ শিক্ষককে নিয়ে স্বামীবাগে আমার শ্বশুরবাড়িতে–যেখানে আমি থাকছিলাম, সেখানে–এসে হাজির। তাদের ইচ্ছা, আমি যেন এবারে পদপ্রার্থী হই। আমি তাদের স্মরণ করিয়ে দিলাম যে, কাগজে বিবৃতি দিয়ে আমি সকলকে আশ্বস্ত করেছি যে, ‘অদূরভবিষ্যতে এ রকম নিয়োগগ্রহণের কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।’ এরপর দু বছরও হয়নি–ভবিষ্যৎ এখনো দূরস্থিত হয়নি।
আমাকে অবাক করে দিয়ে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানও এক সন্ধ্যায় সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। বললেন, ‘পদটি আপনার জন্যে সৃষ্ট হয়েছিল–আপনারই প্রাপ্য। এখন আপনি আবেদন করবেন কি না? সবিনয়ে বললাম, না।’ তিনি বললেন, ‘আপনি আবেদন করলে আমি করবো না, তবে আপনি যদি আবেদন না করেন, তাহলে আমি করবো।’ রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পে ফটিক চক্রবর্তী যেমন কলকাতা যাওয়ার আগে তার ছিপ ঘুড়ি লাটাই সমস্তই ছোটোভাই মাখনকে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে ভোগদখল করার সম্পূর্ণ অধিকার দিয়েছিল, আমিও তেমনি লন্ডন যাওয়ার প্রাক্কালে অনুজপ্রতিম মনিরুজ্জামানকে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার অধ্যাপকপদে আবেদন করার সম্পূর্ণ অধিকার দিয়ে দিলাম।
২৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ এয়ারওয়েজযোগে স্ত্রীপুত্র ও দুই কন্যা নিয়ে রওনা হলাম। চার সপ্তাহ আগে আনন্দের বয়স দু বছর পূর্ণ হওয়ায় তার জন্যেও একটা আধমূল্যের টিকিট কাটা হয়েছে। ফলে আমরা পাঁচটি আসন দখল করতে পেরেছি। তখনো ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ প্রচুর খাওয়াতো–ছেলেমেয়েরা কেউই অতটা খেতে পারেনি। বিমানবালারা যখন খাবারের ট্রে সরিয়ে নিয়ে যায়, রুচি তখন জানতে চেয়েছিল, উদ্বৃত্ত খাবার তারা কী করবে। বেবী যখন বললো, ফেলে দেবে, তখন সে ছলছল চোখে বলেছিল, ‘কত লোকে খেতে পায় না–তাদের দেয় না কেন?’
রুচির বয়স তখন দশ। দেশে অন্নাভাবের বিষয়টা সে যে লোকালয় থেকে অত দূরে বাস করেও টের পেয়েছিল, তা আগে জানতে পারিনি।
ওই একই ফ্লাইটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণিত বিভাগের ড. মুনিবুর রহমান চৌধুরী একই বৃত্তি নিয়ে সপরিবারে বিলেত যান। আমরা যেদিন রওনা হই, তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। আর আমাদের যাত্রার পরদিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দেন। বাংলায়। সেই প্রথম অমন আন্তর্জাতিক সভামঞ্চে বাংলা ভাষা উচ্চারিত হয়েছিল।
অস্তাচলের পানে
১.
১৯৭৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে লন্ডনে পৌঁছোনো গেল। হিথরো বিমানবন্দরে আমাদের নিতে এলো আমার ভাগ্নে মামুন এবং, বেবীর সম্পর্কে নানা কিন্তু বয়সে ছোটো, হায়দার। ওরা অনেক শীতবস্ত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। তার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল বেবীর।
লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিমে কলিয়ার্স উড অঞ্চলে মামুন আমাদের জন্যে বাড়ি ভাড়া করে রেখেছিল। ২০ ক্লাইভ রোডের বাড়িতে দোতলায় আড়াইটে শোবার ঘর, টয়লেট ও বাথরুম। নিচে বসার ঘর, খাবার ঘর ও রান্নাঘর। পেছনে একটু খালি জমি। হিটিংয়ের ব্যবস্থাটা একটু বৈচিত্র্যপূর্ণ : কোনো ঘরে ইলেকট্রিক হিটার, কোনো ঘরে প্যারাফিন দিয়ে হিটার চালাতে হয়, কোথাও গরম পানি দিয়ে স্বয়ংচালিত তাপবিকিরণের ব্যবস্থা। টেলিফোন সংযোগ আছে, গ্যাস বিদ্যুৎ রয়েছে। বাড়ির মালিক চট্টগ্রামের এক ভদ্রলোক। স্বামী-স্ত্রী মিলে ‘মেঘনা’ নামে একটা গ্রোসারি চালান বালহামে। ভাড়া কম নিয়েছেন। বলেছেন, দেশের লোক বলে এবং একমাত্র ভাড়াটে বলে আমার কাছ থেকে সপ্তাহে তিন পাউন্ড কম নেবেন, কিন্তু কেউ জানতে চাইলে আমাকে বলতে হবে পুরো ভাড়ার পরিমাণ। বলা যায়, মিথ্যে কথা বলার মজুরি বাবদ সপ্তাহে তিন পাউন্ড পেতাম।
আমরা যখন প্রবেশ করলাম, বাড়িটা তখনো অগোছালো। মালিক এবং মামুন মিলে যতটা পারেন, করেছেন তবে আরো অনেক পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সে-কাজ আপাতত মুলতুবি রাখতে হবে। কেননা, পরদিনই মামুন আমাদের সবাইকে নিয়ে গাড়ি করে ওয়েসে বেড়াতে যাবে। গ্ল্যামোরগান অঞ্চলে মার্থার টিডফিল বলে একটা জায়গায় আশরাফ ও নাদিরা নামে এক চিকিৎসক-দম্পতি বাস করেন। আমাদের ভাগ্নে-বউ মীরা। সেখানে এর মধ্যে পৌঁছে গেছে। তার অবকাশের দিনগুলো মামুন সেখানে কাটাবে–সঙ্গে করে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। ব্যবস্থাটা যে আমাদের মনঃপূত হয়েছিল তা নয়, তবে মামুনের সঙ্গে ভালোবাসাটা উভয়পক্ষে এত প্রগাঢ় যে আমরা আর না বলতে পারিনি।
সকালে উঠে দেখা গেল, বেবীর জ্বর। জ্বরগায়েই সে যাত্রা শুরু করলো। পথের দুধারে দেবালয় দেখা হলো না তার এবং পথের প্রান্তে পৌঁছেও সুস্থ হতে একটু সময় লাগলো। মার্থার টিডফিল মনোরম জায়গা-ধারেকাছে কয়লাখনি আছে, কিন্তু পরিবেশে দূষণ নেই। গৃহকর্তা-গৃহকত্রী প্রচুর সমাদর করলেন, মামুনও আমাদের দিকে নজর রাখলো এবং এদিক-ওদিক বেড়াতে নিয়ে গেল। দিন তিনেক পরে লন্ডন-প্রত্যাবর্তন।
ফিরে এসে এবারে ঘরবাড়ি গোছানো, কিছু কাপড়চোপড় হাঁড়িবাসন কেনা, আমার একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং জেনারেল ফিজিশিয়ানের কাছে রেজিস্ট্রিভুক্ত হওয়া। আমরা সবাই পাড়ার সাহেব-ডাক্তারের খাতায় নাম লেখালাম, বেবী চাইলো বাঙালি ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে। সে একটু দূরে গিয়ে মামুনের এক পরিচিত চিকিৎসকের কাছে রেজিস্ট্রি করলো। সাহেব ডাক্তার একটু গোলেই পড়েছিলেন তার ফলে। বললেন, তুমি এবং তোমার তিন সন্তানের নাম দেখা যাচ্ছে আমার তালিকায়–ওদের মা কোথায়?
