বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের যোগদানে বাধা দিতে তাকে পিস্তল। দেখিয়েছিল। তাজউদ্দীন আরো বিস্মিত, তাঁর চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া। বললেন, এ হতে পারে না, আপনি ভুল শুনেছেন। বললাম, আপনিই না বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর নিকটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে চান না, বিশ্বাস করেন না। আপনিও তো তাই করছেন। তিনি চুপ করে গেলেন, বেদনার্তচিত্তে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় একা এলে আমি উঠতাম কাকরাইলে আমার বড়বোনের বাড়িতে। অনেক সময়ে নিরিবিলিতে কথা বলার জন্যে সন্ধ্যার পরে তাজউদ্দীন সেখানে চলে আসতেন। আমার সৌভাগ্য, আমার প্রতি তিনি আস্থা রাখতেন। তাঁর সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতার কারণে আমি তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলাম না।
আগের কথায় ফিরে যাই। আড়াই বছরের মন্ত্রিত্বের বেশির ভাগ সময় তাজউদ্দীনের কেটেছিল দ্বিধাদ্বন্দ্বে, সংশয়ের দোলায়, অনুকূল পরিবেশের অভাবে। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, আমরা গণতন্ত্র চর্চা করছি না, সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে পারছি না। এখন, ৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসে, তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন–অনেক হয়েছে, আর নয়। এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাকে নিরুৎসাহিত করার মতো কোনো কথা আমি আর এবারে বলিনি। আমি তাঁকে জানালাম, সেপ্টেম্বরের শেষে সপরিবারে আমি লন্ডন রওনা হচ্ছি। তিনি বললেন, অক্টোবরে তিনি লন্ডন হয়ে ফিরবেন–তখন যেন সেখানে দেখা করি।
তাজউদ্দীনের সফরসূচিতে এবারে অনেকগুলি দেশ ভ্রমণের কথা ছিল। প্রথমে তিনি যাবেন বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নে, তারপর কানাডায়, সর্বশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এই প্রথম তিনি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করতে তাঁদের দরবারে যাচ্ছেন। বৈদেশিক সাহায্য–বিশেষ করে মার্কিন সাহায্য–গ্রহণ করার বিষয়ে তাজউদ্দীনের অনীহার কথা সর্বজনবিদিত ছিল। বিশ্বব্যাংকের প্রতিও তার মনোভাব অনুকূল ছিল না এবং তার প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারাকে মার্কিন প্রশাসনের একটা বড় খুঁটি জ্ঞান করে তিনি বেশ অপছন্দ করতেন। বাংলাদেশে ম্যাকনামারা যখন প্রথম বেসরকারি সফরে আসেন, বোধহয় ১৯৭২ সালে, তখন তার সঙ্গে তিনি সৌজন্যপ্রকাশেও কুণ্ঠিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে যে-আলোচনা হয়েছিল ঢাকায়, শুনেছি, সেখানেও তাজউদ্দীনের অনাগ্রহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, সমাজতন্ত্রের প্রতি তাজউদ্দীনের পক্ষপাতের কথা জেনেও ম্যাকনামারা নাকি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য সম্পর্কে শ্লেষাত্মক মন্তব্য করতে ছাড়েননি। এখন সমাজতান্ত্রিক দেশ সফরশেষে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তাকে বাধ্য হয়ে বিশ্বব্যাংকের আনুকূল্য চাইতে হবে। এই সম্ভাবনা যে তিনি খুব উপভোগ করছিলেন, তা নয়; কিন্তু দেশের পরিস্থিতি–বিশেষ করে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি–যেদিকে যাচ্ছে তাতে তার সামনে বিকল্প পথও খোলা ছিল না।
তাজউদ্দীনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন আমার বারেবারে ১৯৭১-এর দিনগুলি মনে পড়ছিল।
৩৯.
যেহেতু যুক্তরাজ্যে এক বছর মেয়াদি ভিসার জন্যে আবেদন করবে, তার একটি আবশ্যকীয় শর্ত ছিল ব্রিটিশ হাই কমিশন-মননানীত প্যানেলের একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে সন্তোষজনক মেডিক্যাল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা। আমার স্ত্রীপুত্রকন্যার জন্যেও একই শর্ত প্রযোজ্য। প্যানেলের প্রথম নাম ছিল ড. ব্যাসেটের–তিনি জাতে ইংরেজ, বহুকাল ঢাকায় আছেন। তাঁর কাছেই গেলাম। তিনি আমার ভ্রমণের উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করায় বললাম, গবেষণা। তিনি খানিকটা উত্তেজনার সঙ্গে বললেন, কিসের গবেষণা! ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থে, আমার পয়সায়, তুমি বিলেত যাবে গবেষণা করতে! আমি থতমত খেয়ে বললাম, ব্যাপারটা ওরকমই। তিনি বললেন, আর তোমার পরিবার? বললাম, তারা আমার সঙ্গে থাকবে সেখানে। তিনি বললেন, আমি তোমাকে পরীক্ষা করবো, তোমার পরিবারের সদস্যদের করবো না। আমার মুখে কথা জোগালো না। তিনি একটা ছাপা কাগজে কয়েকটা ঘরে দাগ দিয়ে বললেন, এই পরীক্ষাগুলো করিয়ে নিয়ে এসো, তারপর তোমার শারীরিক পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেবো। তাঁর সহকারীকে ডাক্তারের ফি বাবদ এক শ টাকা দিয়ে বললাম, আমি আর এখানে ফিরে আসছি। পরে ওই প্যানেলভুক্ত একজন স্বদেশি চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ভিসা সংগ্রহ করি।
ড. ব্যাসেট কেন অমন অপমানজনক আচরণ করেছিলেন, তা রহস্যাবৃত রয়ে গেল। এক বছর পর দেশে ফিরে শুনেছিলাম, একদল ইংরেজ নার্স তাঁর বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের নালিশ করেছিল ব্রিটিশ হাই কমিশনে। তারই জের ধরে ড. ব্যাসেটকে ঢাকায় তাঁর প্র্যাকটিস গুটিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে হয়।
এর পরের অধ্যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাড়ি ছেড়ে দেওয়া–অর্ধেক মালপত্র আমার ভাগ্নি সেলির নাসিরাবাদের বাসায় রেখে দেওয়া; অর্ধেক রেলযোগে ঢাকায় এনে শ্বশুরবাড়িতে ফেলা। সোয়াসের গ্রন্থাগারের জন্যে ঢাকায় বই কেনা এবং শিপিং ট্রাংক কিনে তাতে বোঝাই করা। সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া এবং চূড়ান্ত গোছগাছ করা।
