ওদিকে বিদেশ সফরের ওপরে সরকার বাধানিষেধ আরোপ করেছে। এখন বিদেশযাত্রার জন্যে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাড়পত্র ছাড়াও সরকারের অনুমতি সংগ্রহ করতে হবে। অধ্যাপকদের ক্ষেত্রে অনুমতি দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ফাইলটা তাঁর চোখে পড়লে অনুমতি পাবো, তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু বিষয়টা তাঁর নজরে আনছে কে? চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিঠি এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, নথিভুক্ত হয়ে সেসব কাগজ গেছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। মন্ত্রণালয় থেকে জানলাম, ফাইল পড়ে আছে সেখানে। একদিন গেলাম সেখানে। যেতেই তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কেন গেছি সেখানে, জানতে চাইল তোফায়েল। আশ্বাস দিলো, সে দেখবে বিষয়টা।
দেশ ছাড়ার আগে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার। সেপ্টেম্বরের একেবারে গোড়ায় গেলাম তার কাছে। তিনি তখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন মাসকালব্যাপী বিদেশ সফরের। অনেকক্ষণ কথা হলো। বললেন, তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, অক্টোবরে দেশে ফিরে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করবেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বললেন এই কারণে যে, পদত্যাগের কথা আগেও তিনি ভেবেছিলেন। মনে আছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার অল্পকালের মধ্যেই তিনি হতাশা ব্যক্ত করতে শুরু করেছিলেন। প্রশাসনের বিষয়ে কিছু হতাশা ছিল, তবে রাজনৈতিক কারণেই তার হতাশা ছিল বেশি। সেই ৭২ সালেই-তখনো বাজেট দেওয়ার সময় আসেনি–তাঁর বাসভবনের অফিসঘরে বসে এক সন্ধ্যায় কথা বলছিলাম। টেবিলের ওপরে রাখা একটা ফাইলের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, এটা তার জন্যে এক উভয়সংকট। বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হবে। নানা কারণে তাঁর মতে, অকারণেই–উদ্যোগ নিতে দেরি হয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। এখন প্রস্তাব এসেছে, আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান না করেই, গত বছর যারা সার সরবরাহ করেছিল, সেই প্রতিষ্ঠানকেই কার্যাদেশ দেওয়া হোক। তিনি বললেন, ‘প্রস্তাবে সম্মত হওয়া মানে আমার পক্ষে নিয়মভঙ্গ করা, সম্ভবত দুর্নীতিতে সাহায্য করা; আর টেন্ডার আহ্বান করতে বলা মানে সময়মতো সার-সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়া। যেটাই করি, সেটাই অসংগত হবে। এইভাবে দেশ চালানো যায় না।
তবে রাজনৈতিক হতাশা ছিল প্রগাঢ়। তার একটা দুঃখ ছিল এই যে, মুক্তিযুদ্ধের ন মাসের কথা বঙ্গবন্ধু কখনো তার কাছে জানতে চাননি। দলের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ যে চলছিল, সে-কথা তাজউদ্দীন প্রথম থেকেই জানতেন। তাঁর মনে হয়েছিল, একদিকে খন্দকার মোশতাক আহমাদ, অন্যদিকে শেখ ফজলুল হক মনি তাঁর বিপক্ষে কাজ করছেন, বঙ্গবন্ধুকেও নানা কথা বলছেন তাঁরা। আমি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞাসা না করলে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তিনি কিছু বলবেন না। আমি জানতে চাইলাম, এই অবস্থা যদি চলতে থাকে, তবে পরিণামে কী হবে? তিনি একটু উদাস কণ্ঠে বললেন, ‘জানি না।’ তাঁর সুরে কিন্তু ঔদাসীন্য ছিল না, অভিমান ছিল।
১৯৭৩ সালের গোড়ার দিকে এক সন্ধ্যায় তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে গিয়েছিলাম। বারান্দায় দেখা হলো আরহাম আহমদ সিদ্দিকীর সঙ্গে–তাজউদ্দীনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘকালের ঘনিষ্ঠতা। তাঁর সঙ্গে কুশলবিনিময়ের পরে আমি ভেতরে ঢুকলাম। তাজউদ্দীন প্রথমেই বললেন, মন্ত্রিসভা ও দল থেকে তিনি পদত্যাগ করবেন বলে ভাবছেন। আমি জানতে চাইলাম, তারপর তিনি কী করবেন? তিনি বললেন, দেখা যাক। জিজ্ঞেস করলাম, রাজনীতি ছেড়ে দেবেন?’ খানিকটা ম্লান হাসি হেসে বললেন, তা পারব না। প্রশ্ন করলাম, তিনি কি অন্য দলে যোগ দেবেন? জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ তিনি পেয়েছেন বলে কানাঘুষো ছিল–সেকথা স্বীকার করলেন তিনি, কিন্তু তাতে যে যাবেন না, তাও স্পষ্ট বললেন। বললাম, তাহলে তো তার বিকল্প নতুন দল গড়া–তিনি কি তা ভাবছেন? তাজউদ্দীন একটু চুপ করে রইলেন, কিন্তু মনে হলো সেটাই তাঁর অভিপ্রায়। জানতে চাইলাম, তিনি যদি আওয়ামী লীগ ছাড়েন, তাহলে দলের কতজন তাঁর অনুবর্তী হবেন? তিনি একটা আনুমানিক সংখ্যা বললেন। বললাম, তাজউদ্দীন ভাই, আজ আপনি অর্থমন্ত্রী। অনেকে নানা কাজে আসেন আপনার কাছে–নানাভাবে আপনাকে সমর্থন করে যান। যেদিন আপনি আর ক্ষমতায় থাকবেন না, সেদিন এদের অধিকাংশকে আপনার ধারেকাছে পাবেন না। আমি জানি, আপনার অকৃত্রিম বন্ধু ও অনুরাগী আছেন অনেকে-তারা আপনার পাশে থাকবেন। যতজন সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ ছাড়বেন বলে আপনি ভাবছেন, তার দশ ভাগের এক ভাগ হয়তো পাবেন আপনার সঙ্গে। এটা আমার অনুমান–প্রকৃত অবস্থা আমার চেয়ে আপনি ভালো বুঝবেন। যদি মনে করেন, দল ছাড়লে দেশের লাভ হবে, আপনার রাজনৈতিক জীবনের উপকার হবে, তবে তা করুন। নইলে দলের ভেতরে থেকে রাজনৈতিক লড়াই করুন। তিনি চুপ করে থাকলেন। আমার কথা তার মনঃপূত না হলেও তিনি ফেলে দেননি।
তার বাড়িতে নানা সময়ে নানাজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতো। একবার ওপরের বারান্দায় ডেকে পাঠালেন। গিয়ে দেখলাম, গাজী গোলাম মোস্তফা বসে আছেন। গাজী শাহাবুদ্দীনের কাকা হিসেবে ১৯৪৯ সাল থেকে তিনি আমারও মানিক কাকা। তিনি তখন রেডক্রসের চেয়ারম্যান–দেশজুড়ে তাঁর নিন্দাবাদ। আমি তাঁর মধ্যে ক্ষমতার দর্প দেখিনি, দুর্নীতির কথা বলতে পারব না। তাজউদ্দীনের সঙ্গে তিনি খুবই সৌজন্যপরায়ণ ছিলেন। আরেক সন্ধ্যায় দেখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপেক্ষাকৃত এক তরুণ শিক্ষক বেরিয়ে আসছেন তাজউদ্দীন আহমদের ড্রয়িংরুম থেকে। ভেতরে ঢুকে তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চাইলাম, ওই ব্যক্তি তার বাড়িতে কেন? তিনি একটু বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ‘ও তো আমাদের অনেক পুরোনো কর্মী–আপনি চেনেন না ওকে? বললাম, ‘চিনি বলেই তো জিজ্ঞেস করছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে সম্প্রতি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে যারা গোলযোগ করেছিল–এ তাদের মধ্যে একজন।
