সত্যি তা-ই হয়েছিল। তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, আমাকে শিক্ষা সচিব করলে একজন ভালো শিক্ষক হারিয়ে মন্দ প্রশাসক পাওয়া যাবে–তাতে লাভ কী?
পরদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি জানতে চাইলেন, আমি মত পালটেছি কি না। আমি হাসলাম। বললাম, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সুযোগটা ছাড়তে চাই না। আপনি যদি অনুমতি দেন।
তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে। তবে কথা দিয়ে যাও, ফিরে এসে চট্টগ্রামে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যাবে। তখন আমি যা বলব, তা কিন্তু শুনতে হবে।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। যা কখনো করিনি, এরপর আমি তাই করলাম। বঙ্গবন্ধুর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম।
তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘বিদেশ থেকে ফিরেই দেখা করবে আমার সঙ্গে। তারপর অস্ফুটস্বরে বললেন, ততদিনে আমাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখবে কি না, কে জানে!
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কিন্তু তিনি গলা এত নামিয়ে প্রায় স্বগতোক্তির মতো কথাটা বলেছিলেন। তাই আর কিছু বলতে চাইলাম না। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
সেই তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা।
৩৭.
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এলেন। ১৯৭৪ সালের ২৭ জুনে। এর আগে ভুট্টো ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৭১ সালের মার্চে–সে-বছরের পূর্বাপর তার যে-ভূমিকা তা বিস্মরণযোগ্য ছিল না। ভুট্টোর আগমন–অন্তত আমার মনে–সে-তিক্ত স্মৃতিই জাগিয়ে তুলেছিল।
আমি অবশ্য ঢাকায় ছিলাম না, ছিলাম চট্টগ্রামে। খবরের কাগজে পড়েছিলাম, বিমানবন্দর থেকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পর্যন্ত রাস্তার দু ধারে ভিড় করে মানুষ তাঁকে সংবর্ধনা জানিয়েছে। লোকমুখেও শুনেছিলাম, বাংলাদেশের নাগরিকেরা তাঁর ও তাঁর দেশের নামে জয়ধ্বনি দিয়েছে, তার উদ্দেশে পুষ্পবৃষ্টি করেছে। অবাক হয়েছিলাম, জানতে চেয়েছিলাম, কারা এই উল্লসিত জনসমষ্টি?
বঙ্গবন্ধু অবশ্য বক্তৃতায় বলেছিলেন ভুট্টোকে–ধ্বংসস্তূপের ওপরে দাঁড়িয়ে তিনি অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন অতিথিকে। বলেছিলেন, প্রতিশোধের বা প্রতিহিংসার মনোভাব থেকে তিনি একাত্তরের ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন না, কিন্তু সে দিনগুলো ভুলে যাওয়া যায় না। বাংলাদেশের লক্ষ্য যে পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলা–সেকথা তিনি বলেছিলেন। আর বলেছিলেন, নিষ্পত্তির উপায় হলো দু-দেশের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো মীমাংসা করে ফেলা।
যতদূর মনে পড়ে, ১৯৭১এর ঘটনাবলির জন্যে ভুট্টো অনুশোচনা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু যারা তার কথা শুনেছিলেন, তাঁদের মনে হয়েছিল, এবং ঠাণ্ডা ছাপানো বিবরণ পড়ে আমাদেরও মনে হয়েছিল, সে-অনুশোচনা আন্তরিক নয়, আনুষ্ঠানিক ছিল মাত্র। ভুট্টো বরঞ্চ বলছিলেন, সেই মর্মান্তিক ঘটনার ইতি হোক এখানেই। আর বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের জের ধরে বলেছিলেন, তিনি চান উভয় দেশের মধ্যে শর্তহীনভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
শর্তহীনতার কথা থেকে ভুট্টো আর নড়েননি। বক্তৃতায় বা সরকারি আলোচনায় কিংবা সাংবাদিক সম্মেলনে যতবার ১৯৭১ সালের নৃশংসতার কথা উঠেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা উঠেছে, পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনার কথা উঠেছে, আটকে-পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা উঠেছে, ভুট্টো ততবারই সেসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন, বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। তবে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে যা তাঁর কর্তব্য ছিল, একাত্তরে তিনি তা-ই করেছিলেন।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে ভুট্টো চরম অসৌজন্য প্রদর্শন করেছিলেন। রংচঙে পোশাকে ও বেমানান ক্যাপে সজ্জিত হয়ে তিনি গিয়েছিলেন সেখানে। চাঁদ সদাগর যেমন বা হাতে ফুল দিয়ে মনসাকে পুজো করেছিলেন, প্রায় তেমনি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে পুষ্পস্তবক দিয়েছিলেন স্মৃতিসৌধে। আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার আগেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন ফিরে আসার জন্যে–বোধহয় আমাদের চিফ অব প্রোটোকলই শিষ্টাচার বিসর্জন দিয়ে হাতে ধরে ঘুরিয়ে বিদেশী অতিথিকে আবার নিজের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তারপরও তিনি ওই স্থান ত্যাগ করার জন্য খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। অভ্যাগতদের মন্তব্যের খাতায় তিনি কিছু লিখতে অস্বীকার করেছিলেন, বাংলাদেশ বেতারের প্রতিনিধির কাছেও কোনো মন্তব্য করতে স্বীকৃত হননি।
তবে ভুট্টো যখন স্মৃতিসৌধে যান, তখন তাঁর বিরুদ্ধে কিছুসংখ্যক লোক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল। তাঁর সমালোচনা করে একটা প্রচারপত্রও বিলি করা হয় এ-সময়ে।
দু-পক্ষের আলোচনা সম্পর্কে যে-সরকারি বিবরণ বেরিয়েছিল, তাতে উভয়পক্ষের কোনো মতৈক্যের উল্লেখ ছিল না। তবে পত্রিকার ভাষ্যমতে, আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল। এই সফরকালে ভুট্টোর আচরণ আমার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়েছিল।
৩৮.
দেশের অবস্থা বেশি ভালো লাগছে না। এদিকে-ওদিকে খাদ্যাভাব দেখা দিচ্ছে। তার মধ্যে জাতীয় সংসদে পাশ হয়ে গেল বিশেষ ক্ষমতা আইন। ইংরেজিতে যাকে বলে ড্রেকোনিয়ান ল–এই আইনটি ঠিক তেমন। অথচ জাসদ-দলীয় ও স্বতন্ত্র সদস্যেরা মিলিয়ে মোট পাঁচজন মাত্র তার প্রতিবাদ করলেন। এই আইনে আমাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হলো–অথচ সে-সম্পর্কে সরকারদলীয় কোনো সদস্য মুখ খুললেন না। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরের কথায় মনে হলো, এই আইন পাশ করে তিনি বড় ধরনের কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
