যার সঙ্গে আমাকে ঘর ভাগ করতে হলো, সে একজন গ্রিক নাবিক। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে সে জাহাজ ধরবে। মাঝখানে বিনা পয়সায় ব্যাংককে আসতে পেরে সে খুশি। তার ইচ্ছে হলো, একটু ফুর্তি করবে। খানিক পরে এক হাড়-জিরজিরে স্বদেশিকে ধরে নিয়ে এসে সে বললো, ও খানিক রাত আমার বিছানায় ঘুমাবে, আমি ফিরে এলে আবার নিজের ঘরে চলে যাবে। আমি দরজায় করাঘাত করলে ও খুলে দেবে, তবে ও ঘুমিয়ে গেলে তুমি খুলে দিও একটু কষ্ট করে। আমি কোনো কথাই বললাম না।
হাড়-জিরজিরে বোধহয় একেবারেই ইংরেজি বলে না। বিনা বাক্যব্যয়ে সে বিছানায় চলে গেল এবং মৃদু নাক ডাকতে আরম্ভ করলো। আমাকে জাগিয়ে রাখতে সেই শব্দই যথেষ্ট। খানিক পরে দরজায় টোকা। আমি খুললাম। গ্রিক নাবিক ফিরে এসেছে স্যুটকেস থেকে কিছু একটা নিতে। প্রচুর দুঃখপ্রকাশ করে সে বিদায় নিলো। খানিক পরে আবার টোকা। দরজা খুলে দেখি, শুধু তোয়ালে পরা একটি থাই মেয়ে পাশের ঘরের দরজায় আঘাত করছে। আবার টোকা। এবারে করিডোরে কেউ নেই। অনেক পরে গ্রিক নাবিকের প্রত্যাবর্তন এবং হাড়-জিরজিরের প্রস্থান। আশা করলাম, এবার শান্তিতে ঘুমোতে পারব, কিন্তু মেজাজ খিঁচিয়ে গেছে বলেই বোধহয় ঘুম আর এলো না।
পরদিন ঘটনাবর্জিত ভ্রমণ এবং ঢাকা-প্রত্যাবর্তন।
৩৪.
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পরে আবু হেনা মোস্তফা কামাল থাকছিলেন আমার সঙ্গেই। তাতে আমাদের খুব আনন্দ হচ্ছিল, তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও সরসতা সবসময়ে একটা উপভোগ্য পরিবেশ রচনা করে চলত। তবে দুপুরবেলায় তাঁর অভ্যস্ত বিশ্রাম ঠিকমতো নেওয়া হতো না। দিবানিদ্রাকালে তার বাড়ি যেমন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে থাকত, আমাদের বাড়িতে। ততখানি হতো না। একবার কোনো এক অবকাশে রাজশাহীতে রওনা হওয়ার সময়ে তিনি আমার ছেলেমেয়েদের বিদায়-সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন এই বলে : ‘চাচা, আমি চললাম, এখন আপনারা যত খুশি আওয়াজ করতে পারেন।’ আমার ছেলেমেয়েদের প্রত্যেককেই তিনি আপনি করে বলতেন।
স্বভাবতই বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় একটা বাসা বরাদ্দ পাওয়ার জন্যে আবু হেনা ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। উপাচার্য আবুল ফজল একদিন আমাকে। ডেকে বললেন, ‘পাহাড়ের ওপরে একটা বাড়ি খালি হয়েছে। তুমি যদি সেটায় যেতে সম্মত হও, তাহলে তোমার বাসাটা আবু হেনাকে দিতে পারি। পাহাড়ের ওপরে উপাচার্যের বাসভবন-সংলগ্ন একটি দোতলা বাড়িতে রেজিস্ট্রার থাকতেন, অদূরে আরো দুটি বাড়ি ছিল অধ্যাপকদের জন্যে। একটিতে থাকতেন। ইতিহাসের আবদুল করিম। সব শেষেরটিতে প্রথমে সৈয়দ আলী আহসান, তারপরে মোহাম্মদ শামসুল হক। বাড়িটি চমৎকার। তবে গাড়ি ছাড়া সেখানে যাতায়াত করা মুশকিল। মেয়েদের পায়ে হেঁটেই স্কুলে যেতে হবে। সামান্য কিছুর প্রয়োজন হলে হয় নিজেকে গাড়ি নিয়ে ছুটতে হবে, নইলে কাউকে পায়দল ছোটাতে হবে।
দুশ্চিন্তার আরো একটি কারণ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়িসংক্রান্ত নিয়মাবলি প্রণয়নের জন্যে উপাচার্য একটি কমিটি তৈরি করেছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীকে সভাপতি করে। সেই কমিটির সুপারিশে বলা হয়, তিন মাসের বেশি সময়ের জন্যে কেউ ক্যাম্পাসের বাইরে চলে গেলে তাকে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে (অবশ্য পরের বছরে মোহাম্মদ আলীর যখন বিদেশে যাওয়ার সময় হয়, তখন এই মেয়াদ বাড়িয়ে এক বছর করা হয়েছিল, কিন্তু সে পরের কথা)। কিছুকাল পরে সপরিবারে বিলেত যাবো বলে আশা করছি। এখন একবার বাড়ি বদলাবো, তারপর তখন আবার বাঁধাছাদা করে বাড়ি ছাড়া–চাপটা বেবীর ওপরে অতিরিক্ত হয়ে যাবে। তবু, আমি বাড়ি বদলালে আবু হেনা বাড়ি পাবেন এবং পরিবার নিয়ে আসতে পারবেন, একথা ভেবে বেবী সম্মতি দিলো। সমতলে যে-বাড়িতে ছিলাম, তার একটি স্মৃতি অবিস্মরণীয়। সেখানে এক দুর্ঘটনায় গরম পানিতে আনন্দের পিঠ পুড়ে গিয়েছিল এবং জখমটা হয়েছিল মারাত্মক। চিকিৎসকদের ক্লান্তিহীন প্রয়াসে সে ভালো হয়ে ওঠে। সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শ্রেণির মানুষের যে-সহমর্মিতার পরিচয় পাই, তা ভোলবার নয়। আবাসিক এলাকার মসজিদে আমার যাতায়াত ছিল না, অথচ আমার সন্তানের আরোগ্যকামনায় সেখানে বিশেষ মোনাজাত হয়েছিল–তাতে আমি খুবই অভিভূত হয়েছিলাম।
পাহাড়ের বাড়িতে গিয়ে আমি একটা গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখতে পেরেছিলাম অনেকদিন পরে। চর্যাগীতির সমাজচিত্র’ নামে এই লেখাটি আমাদের বিভাগীয় সমিতির এক সেমিনারে পড়েছিলাম অধ্যাপক আবদুল করিমের সভাপতিত্বে। সেটি প্রকাশিত হয়েছিল আমাদের বিভাগীয় গবেষণাপত্র পাণ্ডুলিপিতে, পরে তা আমার স্বরূপের সন্ধানে (ঢাকা, ১৯৭৬) বইতে স্থান পায়।
এ-সময়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলীর শক্তি বেশ বৃদ্ধি পেলো। মোহাম্মদ আবদুল কাইউম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ ডি করে ফিরে এলেন। আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ ফিরলেন ব্রিটিশ কলাম্বিয়া থেকে–অল্পকাল পরে তার এম এ ডিগ্রিলাভের খবর এলো। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের হিসেব নিলে আমাদের স্থানটা বেশ গৌরবজনক হবে।
এর মধ্যে মাহমুদ শাহ কোরেশীকে অধ্যক্ষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা বিভাগ খোলা হয়েছে। প্রথমে তার শিক্ষকসংখ্যা দুই-ফরাসিতে কোরেশী, রুশ ভাষায় প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের ড. শফিক হায়দার চৌধুরী–উভয়েই খণ্ডকাল শিক্ষক। কেবল খণ্ডকাল-শিক্ষক নিয়ে বিভাগ প্রতিষ্ঠার আর দৃষ্টান্ত আছে কি না, আমার জানা নেই। নিজের বিবেচনায় উপাচার্য যা করেছেন, তাতে আমাদের কী বলার থাকতে পারে! পরে বাংলা বিভাগে কর্মরত পালির শিক্ষক রণধীর বড়ুয়া এবং সংস্কৃতের শিক্ষক ভুবনমোহন অধিকারীকে ওই বিভাগে বদলি করা হয়। আমি একবার কোনো কাজে ঢাকায় এসেছিলাম, ফিরে গিয়ে শুনি, নির্বাহী আদেশে এই দুই সহকর্মীকে বদলি করা হয়েছে। তা হোক, কিন্তু উপাচার্য যে সৌজন্যের খাতিরেও তাঁদের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এ-বিষয়ে আমার কোনো মতামত চাইলেন না, তাতে আমি একটু ক্ষুব্ধ না হয়ে পারলাম না। মনে হয় এই স্বাভাবিক নিয়ম পালন না করার পরামর্শ উপাচার্যকে কেউ দিয়েছিলেন।
