অথচ অধ্যাপক আবুল ফজলের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ভালো। সামাজিক-সাংস্কৃতিক বহু কাজে একযোগে শরিক আমরা। রশিদ চৌধুরী যখন উদ্যাগ নিলেন চট্টগ্রামে একটা আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্যে, তখন স্থানীয় বিশিষ্টজনদের জড়ো করা হয় সাহিত্য-নিকেতনে। সেখানে আমিও ছিলাম। চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্যে যে-কমিটি হয়, তাতে আমারও নাম থাকে। তাছাড়া, আরো কতরকম সভা-সমিতিতে আবুল ফজলের সহচর ছিলাম আমি। তিনি সবসময়েই আমাকে হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সম্পর্ক মোটের উপর আনুষ্ঠানিক পর্যায়েই রয়ে গিয়েছিল। সেই আনুষ্ঠানিকতারও হানি যে কখনো কখনো হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত দিয়েছি। তবে আমার বিশ্বাস, তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনো ক্ষুণ্ণ হয়নি। আমি বরাবরই তাঁর স্নেহলাভ করেছি।
৩৫.
শিক্ষা-কমিশনের কাজ শেষ হয়ে এলো। ১৯৭৩ সালের জুন মাসে কমিশন। একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট পেশ করে এবং চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়ার জন্যে সময় চেয়ে নেয়। এখন সেই চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়ার সময় এসে গেল।
ত্রিশ বছর পেছনের দিকে তাকিয়ে আমি এখনো মনে করি, এই কমিশন একটি ভালো রিপোর্ট দিতে পেরেছিল। এর কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়তো বাহুল্য হবে না। আমরা জোর দিয়েছিলাম সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার ওপরে এবং প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পাঁচ থেকে বাড়িয়ে আট বছর পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেইসঙ্গে এই যুগান্তকারী সুপারিশ করা হয়েছিল যে, আট বছরের এই প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বক্ষেত্রে–স্কুলে ও মাদ্রাসায়–অভিন্ন পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা হবে। এ-বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষকদের সম্মত করতে বেগ পেতে হয়েছিল, কিন্তু কুদরাত-এ-খুদা তা করতে সমর্থ হয়েছিলেন তাঁর অসীম ধৈর্য ও প্রবল প্রত্যয়ের কারণে। মাদ্রাসায়–এবং সেইসঙ্গে (সংস্কৃত) টোল ও পালি টোলে–এই অভিন্ন পাঠ্যসূচি এক ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারত। মাদ্রাসা-বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এর বিনিময়ে একটা ছাড় আদায় করে নিয়েছিলেন, তা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে ধর্মশিক্ষার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। আদিতে আমরা নীতিশিক্ষার সুযোগ রেখেছিলাম। ধর্মশিক্ষার পণ্ডিতেরা যখন ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে চান, তখন আমি আপত্তি করি। আমার সঙ্গে আরো কেউ কেউ মতৈক্য পোষণ করেছিলেন। কুদরাত-এ-খুদা যদিও আমাদের বুঝিয়েছিলেন, ধর্মশিক্ষার বিকল্পে নীতিশিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, তবু আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে, বিকল্প থাকলে নীতি আর পড়ানো হবে না, ধর্মশিক্ষাই দেওয়া হবে এবং অনেক জায়গায় ইসলাম ছাড়া। অন্য ধর্মশিক্ষার সুযোগ থাকবে না, অমুসলমান ছাত্রকেও ইসলাম ধর্মশিক্ষা নিতে হবে। তারপরও কুদরাত-এ-খুদা বলেছিলেন, মাদ্রাসায় যদি বাংলা মাধ্যম ও অভিন্ন পাঠ্যসূচি অবলম্বন করা হয়, তাহলে যে-লাভ হবে, সেই তুলনায় ধর্মশিক্ষার প্রবর্তন হবে অল্প ছাড়।
প্রাথমিক স্তরের পরে বৃত্তিমূলক শিক্ষা হিসেবে ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। মাদ্রাসার ছাত্রেরা ইচ্ছে করলে এটাও নিতে পারবে এবং উচ্চতর স্তরে ধর্ম বা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব শিক্ষালাভের সুযোগ তাদের থাকবে। আরো কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল যাতে মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার ভেদ কমিয়ে আনা যায়। মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে যারা জড়িত, এই সুপারিশ তাঁরা যে মেনেছিলেন, তাতে কমিশনের সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সিরাজুল হকের ইতিবাচক ভূমিকা ছিল।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপরে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল কমিশনের রিপোর্টে। দেশে শিল্পের বিকাশ কত দ্রুত ও ব্যাপক হতে পারবে, তার কোনো ইঙ্গিত ছিল না। ফলে কৃষিভিত্তিক বৃত্তিশিক্ষার কথা ভাবা হয়েছিল। শিক্ষক-শিক্ষণকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্যারামেডিক তৈরির একটা পরিকল্পনাও ছিল। এছাড়া, এমন সব বৃত্তিশিক্ষার প্রস্তাব ছিল যা লাভ করলে স্বনিয়োজিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকত। শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের ৫ শতাংশ নিয়োগ করার পরামর্শ ছিল এবং পরে তা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্রদের বেতন বাড়াবার প্রস্তাব ছিল।
রিপোর্টের হতাশাব্যঞ্জক দিক ছিল নারীশিক্ষার বিষয়ে ভাবনায়। তখনো আমরা মেয়েদের উপযোগী শিক্ষার কথা ভেবেছি, দৈনন্দিন সাংসারিক জীবনে কোন শিক্ষা তাদের কাজে আসবে, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি।
সংবিধানে যে অভিন্ন পদ্ধতির শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল, তা পুরোপুরি অর্জনের সম্ভাবনা এই রিপোর্টে দেখা যায়নি। তবে এই রিপোর্টের সুপারিশ বাস্তবায়িত করার পরে অল্পকালের মধ্যে শিক্ষা-পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করার সুপারিশ করা হয়েছিল। নিজেদের সুপারিশকে আমরা অজর, অমর, অক্ষয় বলে দেখিনি।
৩৬.
১৯৭৪ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর কাছে আমরা শিক্ষা কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করতে গেলাম। সভাকক্ষে এসে আসনগ্রহণের পরে তিনি আমার দিকে। তাকিয়ে বললেন, সভার পরে আমি যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করে যাই।
