রউফের বাড়িতে তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর অপরিসীম যত্নে এক সপ্তাহ আনন্দে কাটানো গেল। তার মধ্যে এক সন্ধ্যায় আবু রুশদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ। তিনি বাংলাদেশ হাই কমিশনে এডুকেশন কাউনসেলর। বেশ বড়োসড়ো পার্টির আয়োজন করেছেন, তবে তা নারীচরিত্র-বর্জিত। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে সৈয়দ হোসেন, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, তবে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি হওয়ার সূত্রে পদমর্যাদা যতটা দাবি করে, তার প্রভাব তার চেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। সিভিল সার্ভিসের দুই জ্যোতিষ্ক–মনোয়ারুল ইসলাম ও সৈয়দ শামীম আহসান–উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা তিনজন সম্ভবত কোনো সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকা থেকে এসেছিলেন। আলমগীর সিরাজুদ্দীন আর আমি ছিলাম। আরো কয়েকজন ছিলেন। সৈয়দ হোসেন সদ্যপরিচিতদের প্রত্যেকের কাছেই জানতে চাইছিলেন, কে কেন কতদিন বিদেশে আছেন এবং কবে দেশে ফিরে যাবেন। তার কণ্ঠের দৃঢ়তাহেতু মনে হচ্ছিল, তিনি ধমক দিয়ে কথা বলছেন–সেটা আমার ভালো লাগেনি। আবু রুশদ যখন এরপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কী পান করবেন, তখনো তিনি অনাবশ্যক জোরের সঙ্গে বললেন, ‘সফট ড্রিংক, অফ কোর্স। তারপর যাকেই জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনিই বলেন, কোমল পানীয় খাবেন; এমনকী যার সুরাসক্তির খ্যাতি আছে, তিনিও বলেন, হালকা কিছু খাবেন। তাঁদের কথায় গৃহকর্তা বিব্রত হতে থাকলেন, কেননা, মনে হলো, তার প্রশ্নটাই ছিল অনাবশ্যক ও অনুচিত। সুতরাং আমি যখন বললাম, শক্তমতো কিছু খাবো, তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি একটা ককটেল বানিয়েছিলেন। আমাকে দিলেন, নিজে নিলেন, এবং বললেন, ‘আনিসুজ্জামান সাহেব, খান, কারো পরোয়া করবেন না।’
বেপরোয়া খেতে গিয়ে আমি অসুস্থ হয়ে গেলাম এবং সেটা কারো অগোচর রইলো না। নিজে কুণ্ঠিত হলাম এবং গৃহকর্তাকেও বিব্রত করলাম। শামীম আহসান পকেট থেকে কী-একটা বড়ি বের করে খেতে দিলেন। আমি খেতে চাইছিলাম না, তিনি বললেন, এটা আপনার খাওয়া দরকার। খেলাম। শেষে লজ্জিতমুখে ও অবনতমস্তকে বসে রইলাম চুপ করে। ওই অবস্থায় ঘুম পেতে লাগল। তারপর এক সময়ে আলমগীর এবং আমি বিদায় নিয়ে পদব্রজে টিউব স্টেশনে চললাম। একই ট্রেনে উঠে আমি নেমে গেলাম অদূরে। রউফের বাড়িতে বাকি পথ হেঁটেই ফিরলাম।
এর মধ্যে বেবীর পাঠানো খবর এলো : আমাকে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমিক স্টাফ ফেলোশিপ মনজুর করার চিঠি চট্টগ্রামে পৌঁছে গেছে। সুতরাং অ্যাসোসিয়েশন অফ কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটিজে গিয়ে আলাপ করে এলাম। সেখানে কমনওয়েলথ বৃত্তির দায়িত্বে ছিলেন রেবেকা জেমস-মহিলা অতি সদাশয়। সত্যিকার উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম তার কাছে আর পেলাম বহুরকম প্রয়োজনীয় পরামর্শ। তাঁর সহকারী ক্যাথির সঙ্গে পরিচয় হলো–খুব হাসিখুশি মেয়েটি। তার পদবি এখন মনে নেই, তবে অল্পকাল পরে বিয়ে করে সে ক্যাথলিন রবার্টস নামে পরিচিত হয়েছিল। আমার কাজের ক্ষেত্র নির্বাচন করেছিলাম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (সোয়াস)। সেখানকার বাংলার প্রফেসর টি ডব্লিউ ক্লার্ক কিছুকাল হলো গত হয়েছেন। এখন বাংলা পড়ান ড. তারাপদ মুখোপাধ্যায় এবং বাংলা ও ওড়িয়া পড়ান ড. জে ভি বোলটন–উভয়েই লেকচারার। সুতরাং আমার গবেষণাকর্মে কোনো উপদেষ্টা নিযুক্ত হননি, তবে আমাকে যুক্ত করা হয়েছে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও সিলোন বিভাগের প্রধান এবং সংস্কৃতের প্রফেসর জে সি রাইটের সঙ্গে। সোয়াসে গিয়ে প্রফেসর রাইটকে পেলাম না, বোলটনও লন্ডনের বাইরে, কিন্তু তারাপদ মুখোপাধ্যায়কে পাওয়া গেল। তিনি আমাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। আমার শিক্ষক শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। সেকথা বললেন, অনেকের খবরাখবর নিলেন। আমাকে নিয়ে লাইব্রেরি দেখাতে গেলেন। সেখানে সহকারী গ্রন্থাগারিক ডোগরা অনুরোধ করলেন, যখন সোয়াসে যোগ দিতে আসবো, তখন যেন বাংলাদেশ থেকে বই কিনে নিয়ে আসি যতটা পারি। ওঁরা আমাকে তার মূল্য এখানে পরিশোধ করে দেবেন।
খুশিমনে লন্ডন থেকে রওনা হলাম। দিল্লিতে ড. মল্লিকের বাড়িতে থাকলাম দুদিন। ভাবির আতিথেয়তার তুলনা হয় না। তারপর থাই এয়ারওয়েজযোগে ঢাকায় আসার পালা। ঢাকায় নামবার সময় হয়ে গেছে, তখনো দেখি বিমানটির উচ্চতার কিছু লাঘব হচ্ছে না। এয়ারহোস্টেসকে ডেকে জানতে চাইলাম, কী ব্যাপার। সে একটু দেরি করে ফিরে বললো, ক্যাপ্টেন জানাবেন। আমি তো বুঝে গেছি যা বোঝার। তার বেশ খানিকক্ষণ পরে ক্যাপ্টেন ঘোষণা করলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ঢাকায় অবতরণ করা সম্ভবপর হলো না। আমরা সোজা ব্যাংকক যাচ্ছি। সেখান থেকে পরদিন যাত্রীদের ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা যাবে। আমার পকেটে তখন ৪০ ব্রিটিশ পেনি এবং বাংলাদেশের ৫০ টাকা আছে মাত্র।
ব্যাংককের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়টা ভালো হয়নি। সেই ১৯৭৪ সালে ব্যাংকক আজকের মতো উন্নত হয়নি। তার ওপর এতজন যাত্রী একসঙ্গে চলতে প্রতিপদে বিলম্ব হতে লাগল। বিমানবন্দর থেকে গাদাগাদি করে বাসে যাওয়া হলো হোটেল এশিয়ায়। কর্তৃপক্ষ বললো, একেক ঘরে দুজন যাত্রীকে থাকতে হবে–সবাইকে আলাদা ঘর দেওয়ার মতো প্রচুর ঘর খালি নেই। তবে আমরা সকলে ঢাকায় ফোন করে খবর দেওয়ার সুবিধে পাবো।
