সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলাম বলে ওই কলোকিয়ামে আমি কিছু বাড়তি সমাদর পেয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ভালো আলাপ হয়েছিল সংস্কৃতি বিষয়ক অধিবেশনের আর দুই অংশগ্রহণকারীর। একজন দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাসিত কবি ডেনিস ব্রুটাস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক। অপরজন মোহাম্মদ সালাহ স’ফিয়া–তিউনিসিয়ার মানুষ, কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব পড়ান। এঁদের সৌজন্য মনে রাখার মতো। সালাহ্ সফিয়ার সঙ্গে পরবর্তীকালে আমার আরেকবার দেখা হয়েছিল–তাঁর হৃদয়ের উত্তাপ তখনো অনুভব করেছি।
ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন যে কত বড়ো পণ্ডিত, তা আমার জানা ছিল না, তাঁর ‘ওয়র্লড-সিস্টেমে’র তত্ত্বের সঙ্গেও আমার পরিচয় ছিল না। তার তত্ত্ব অনুসরণ করে লিখিত এবং অন্য অধিবেশনে উপস্থাপিত একটি প্রবন্ধের প্রসঙ্গে আমি যখন জানতে চাইলাম, ‘ওয়র্লড-সিসটেন্স’ না বলে ‘ওয়ার্লড সিসটেম’ বলা হচ্ছে কেন, তখন নিজের অজ্ঞতাই জাহির করা হয়েছিল। ওয়ালারস্টাইনের তত্ত্ব-অনুযায়ী সারা পৃথিবী এক অর্থনীতির অধীন। আমি যেহেতু পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রকে দুই পৃথক ব্যবস্থা বলে গণ্য করতাম, তাই জানতে চেয়েছিলাম, বিশ্ব-ব্যবস্থা কি এক না একাধিক? ওয়ালারস্টাইনের তত্ত্ব সম্পর্কে আরো না জেনে আমার কিছু বলা ঠিক হয়নি। এমনকী, রামকৃষ্ণ মুখার্জিও পরে বললেন, ‘ও-প্রশ্ন না করলেই পারতে। সকালে তুমি এত ভালো বললে!’ অর্থাৎ নিজেকে ডুবিয়েছি। আসলে গোটা কলোকিয়ামই পরিচালিত হয়েছিল ওয়ালারস্টাইনের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, ব্যাপারটা আমি আগে বুঝিনি।
ওয়ালারস্টাইনের ব্যবহারে অবশ্য কোনো তারতম্য দেখিনি। এই কলোকিয়ামের প্রবন্ধগুলি সংগ্রহ করে যখন ওয়ার্লর্ড ইনইকুয়ালিটি (মন্ট্রিয়ল, ১৯৭৫) নামে বই বের হয়, তখন একটি দীর্ঘ চিঠিতে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে, ব্রাজিলের সেই প্রবন্ধটি তত সন্তোষজনক বিবেচিত না হওয়ায় তা মুদ্রিত হয়নি এবং মূল প্রবন্ধ মুদ্রিত না হওয়ার কারণে আমার আলোচনাও বইতে স্থান পায়নি–আমি যেন কিছু মনে না করি। পরে তিনি ফার্ডিনান্ড ব্রডেল সেন্টারের পরিচালক হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলে দীর্ঘকাল ওই সেন্টারের কাগজপত্র আমাকে পাঠাতেন। তাছাড়া, আনোয়ার আবদেল মালেক আয়োজিত অন্য একটি সেমিনারে তাঁর সঙ্গে আমিও অংশগ্রহণ করি। সেখানেও তিনি খুব সহৃদয় আচরণ করেছিলেন।
ওই কলোকিয়ামে উপস্থিত দুই বাঙালি শ্রোতা আমার খুব সমাদর করেছিলেন এবং একজন নিজের গাড়িতে করে মন্ট্রিয়ল শহর ঘুরে দেখিয়েছিলেন।
৩৩.
মন্ট্রিয়লে সেমিনার শেষ করেই আমি লন্ডনে ফিরে এলাম। ইয়েন মার্টিন হিথরো থেকে আমাকে নিয়ে চললেন এ কে এম আবদুর রউফের বাড়িতে। তার আগে মুশারফ হোসেনের চিঠি পড়ে বললেন, মুশারফ তোমাকে কিছু পাউন্ড দিতে বলেছে–এটা তুমি আগে জানালে আমি এখানেই তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতাম। ঠিক আছে, কাল দেওয়া যাবে। চিঠিতে মুশারফ কী লিখেছেন, তা আমার আদৌ জানা ছিল না, সুতরাং ইয়েনকে কিছু জানাবার সুযোগই ছিল না। মুশারফ হোসেন যে বিদেশ-বিভুঁইয়ে আমাকে অর্থসাহায্য করার কথা ভেবেছেন, তাও অপ্রত্যাশিত ছিল।
রউফের বাড়ি পৌঁছে কলিং বেল টিপে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। একটা টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করলাম। ফোন বাজছে, কেউ ধরে না। ইয়েনের প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল, বাড়ির নম্বর ভুল হয়েছে কি না, টেলিফোনে সাড়া না পেয়ে বললেন, কিছু একটা হয়েছে–ওরা কেউ বাড়ি নেই। আমি খুব লজ্জিত হয়ে বললাম, দুঃখিত। তুমি আমাকে একটা শস্তা হোটেল বা গেস্ট হাউজে নিয়ে চলো। ইয়েন বললেন, তুমি আমার বাড়ি চলো। আমি খুব অগোছালো থাকি, তোমার অসুবিধে হবে। তবে তোমাকে হোটেলে নেওয়ার চেয়ে নিজের বাড়িতে নেওয়া ভালো। আমার মৃদু আপত্তি কোনো কাজে এলো না। ইয়েন থাকতেন এসেক্সে। দক্ষিণ-পশ্চিমে বিমানবন্দর থেকে আমাকে নিয়ে উত্তরে রউফের বাড়ি হয়ে পুবে নিজের বাড়িতে ফিরতে হলো বেচারাকে। সরাসরি বাড়িতে নেওয়া অনেক সহজ হতো।
সকালবেলা ইয়েনের বাড়িতে খেয়ে, তাঁর কাছ থেকে পাউন্ড নিয়ে, আলমগীর সিরাজুদ্দীনের বাড়িতে স্যুটকেস রেখে, গেলাম আমাদের হাই কমিশনে। সেখানে রউফ নেই, তাঁর হদিস ঠিকমতো পেলাম না। মামুনের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারিনি। আলমগীর বললেন, তাঁদের নাফিল্ডের ফ্ল্যাটে অতিথি রাখার নিয়ম নেই। তবে তাঁর পাকিস্তানি শ্যালক বন্ধুদের নিয়ে যে-ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকে, সেখানে রাত কাটাতে পারি। সেখানেই গেলাম। গভীর রাতে ঘরের দরজায় করাঘাত। আশ্রয়দাতা জানালো, আমার খোঁজে কে যেন এসেছে। নিচে নেমে দেখি, মামুন। সেই দণ্ডেই আসমা সিরাজুদ্দীনের ভাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে মামুনের গাড়িতে উঠে পড়লাম। তার কাছ থেকে জানা গেল, রউফের পুরো পরিবার খাদ্যের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ভাবি কোনোমতে টেলিফোনের কাছে এসে এমারজেন্সির নম্বর ডায়াল করেন। তারপর অ্যামবুলেন্স এসে বাড়ির পাঁচজনকেই নিয়ে যায় হাসপাতালে। আজই বন্ড দিয়ে তারা বিকেলে ঘরে ফিরেছেন–তাও আমার জন্যে। মামুনকে বলেছেন, আমাকে খুঁজে বের করে তাদের বাড়ি নিয়ে যেতে। মামুন প্রায় গোয়েন্দার মতো অনুসন্ধান চালিয়ে আমাকে ধরতে পেরেছে।
