কিন্তু প্রবন্ধটি শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছোলো না। ঝাড়া হাত-পা নিয়ে রওনা হলাম। লন্ডনে যাত্রাবিরতি, থাকার ব্যবস্থা হিথরো বিমানবন্দর-এলাকার একটি হোটেলে। সেখানে স্যুটকেস রেখে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের শিল্পীবন্ধু এ কে এম আবদুর রউফ বাংলাদেশ হাই কমিশনে দ্বিতীয় সচিব। তাঁর সঙ্গে ব্যবস্থা করে এলাম, মন্ট্রিয়ল থেকে ফেরার পথে লন্ডনে তাঁর বাড়িতে সপ্তাহখানেক থাকবো। আমার ভাগ্নে ডা. মামুন ফেরদৌসীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম না। আমাদের সহকর্মী আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন তখন নাফিল্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ নিয়ে গবেষণা করছেন লন্ডনে এবং সপরিবারে থাকছেন সেখানে। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করে এলাম।
ফেরার পথে কিংস ক্রসে টিউব-লাইন বদলাতে হবে। সেকথা যখন খেয়াল হলো, তখন কিংস ক্রস ছাড়িয়ে গেছি। অ্যানজেলে নেমে ফিরতি ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকলাম প্ল্যাটফর্মে। এক শ্বেতাঙ্গিনী হাতে সিগারেট নিয়ে আমার কাছে আগুনের সন্ধান করলো। লাইটার দিয়ে তার সিগারেট ধরিয়ে দিলাম। সেই অবকাশে সে জানতে চাইলো, আমার বান্ধবী চাই কি না। সবিনয়ে বললাম, এখন নয়। তরুণীর কোনো ভাবান্তর দেখলাম না। আমি কোত্থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি, জিজ্ঞেস করলো। যথাযথ উত্তর দিলাম। হোটেলের নাম শুনে বললো, ওদিকটায় খুব যাওয়ার ইচ্ছা, কখনো যাওয়া হয়নি। বললাম, আশা করি, তোমার মনোবাঞ্ছ অচিরে পূর্ণ হবে। সে বললো, কেউ না নিয়ে। গেলে হবে না, একা-একা যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের হয়রানিতে পড়তে হয়। তার কথার জবাব না দিয়ে এবারে আমি জানতে চাইলাম, খদ্দেরের কাছে সে কত দাবি করে। মেয়েটি বললো, দশ পাউন্ড পেলে খুশি হই, তবে অবস্থাভেদে কম নিয়েও সন্তুষ্ট থাকি। এর মধ্যে ট্রেন এসে গেল। আমরা একই কামরায় উঠলাম এবং পরের স্টেশনে বিনা বাক্যবিনিময়ে আমি নেমে গেলাম।
অধ্যাপক মুশারফ হোসেন তার বন্ধু, পরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব এবং পূর্ব তিমুরে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধি, ইয়েন মার্টিনকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন আমার হাতে। ইয়েন যখন ঢাকায় ফোর্ড ফাউন্ডেশনে কাজ করতেন, তখন তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। ১৯৭১ সালে তিনি কর্মরত ছিলেন করাচিতে। পূর্ব বাংলায় তার পরিচিতজনের খবর নিতে তিনি ব্যাংকক হয়ে কলকাতায় আসেন সম্পূর্ণ নিজের উদযোগে। তখন আমরা কথা বলতে বলতে এবং নিঃশব্দে রাস্তায় অনেকক্ষণ পায়চারি করেছিলাম একসঙ্গে। ইয়েন এখন লন্ডনে, ব্রিটিশ লেবার পার্টির কাজে স্বনিয়োজিত। রাতে হোটেল থেকে ফোন করে তাঁকে পেলাম। তিনি বললেন, মন্ট্রিয়ল থেকে আমি যেদিন ফিরব, সেদিন তিনি বিমানবন্দর থেকে আমাকে নিয়ে পৌঁছে দেবেন গন্তব্যে, তখন কথা হবে, চিঠিটাও নেবেন।
মন্ট্রিয়ল রওনা হওয়ার সময়ে দেখি, এয়ার কানাডার কম্পিউটার কাজ করছে না। অতএব, যে যেখানে পারো বসে যাও। ধূমপান করা চলে, এমন এলাকায় আসন পেলাম না। ফলে, আমার আসন থেকে খানিক হেঁটে গিয়ে ধূমপায়ীদের এলাকায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অভ্যাসের দাসত্ব করতে হলো। এক বয়স্ক শ্বেতাঙ্গেরও একই অবস্থা। তিনি খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, যখন কম্পিউটার ছিল না, তখন এরা হাতে লিখে যেভাবে আসন বণ্টন করতে পারতো, যন্ত্র খারাপ হলে সেটা করতে পারবে না কেন? আমার মনে হয়, যন্ত্র এদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে না, বরঞ্চ অলস করে দিচ্ছে।
মন্ট্রিয়লের হোটেলে পৌঁছোলাম বিকেলবেলায়। আমার আলোচ্য প্রবন্ধ তখনো হাতে পেলাম না। নিজেকে দোভাষী পরিচয় দিয়ে একটি মেয়ে এসে বললো, ব্রাজিলিয়ান অংশগ্রহণকারী প্রবন্ধটি লিখেছেন পর্তুগিজে; সে একটা টেপ-রেকর্ডারে তা মুখে মুখে অনুবাদ করে দেবে; রাতে টেপ শুনে আমার মন্তব্য তৈরি করতে হবে। তারা দুঃখিত, কিন্তু এখন লিখিত অনুবাদ প্রস্তুত করার সময় নেই। রাতে একবার টেপ শুনে কিছু কথা টুকে রাখলাম, ভোরবেলা আরেক দফা কসরত করলাম। সেদিন সকালের অধিবেশনে ওই প্রবন্ধ-পাঠ এবং আমার মৌখিক আলোচনা। পরে দোভাষী আমাকে বলেছিল, প্রবন্ধ-উপস্থাপনের সময়ে ভদ্রলোক বেশ কিছু কথা বাদ দিয়েছেন, নতুন দু-একটি কথা যোগ করেছেন। আগে টেপে অনুবাদ শোনায় আমি আর ওঁর তাৎক্ষণিক উপস্থাপনের অনুবাদে মনোযোগ দিইনি। ফলে, দোভাষীর মতে, প্রবন্ধে ও আলোচনায় কিছু গরমিল রয়ে গেছিল। প্রবন্ধের সঙ্গে আমার মন্তব্যের যোগ যেখানে শ্রোতারা খুঁজে পাননি, সেসব জায়গা হয়তো তারা আমার মৌলিক বক্তব্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। যারা আমার আলোচনায় প্রীত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সিক্স ভিলেজেস অফ বেঙ্গল (কলকাতা, ১৯৪৪)-খ্যাত রামকৃষ্ণ মুখার্জি। তিনি তখন কলকাতায় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে ডিসটিংগুইশড সাইনটিস্ট পদের অধিকারী এবং সম্ভবত ওই কলোকিয়ামের সবচেয়ে প্রবীণ অংশগ্রহণকারী। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আমাকে তার পক্ষপুটের আশ্রয়ে নিয়েছিলেন। আমাকে দেওয়া তাঁর একটি পরামর্শ ছিল এই : ‘এদের আমন্ত্রণে আসবে এবং এদের কষে গাল দেবে, তবেই এদের সমাদর পাবে। এই ডাকসাইটে সমাজবিজ্ঞানী সম্পর্কে আমার কিছু ধারণা ছিল। এই সেমিনারে যোগ দেওয়ায় আমার সবচেয়ে লাভ হয়েছিল সেই থেকে অবিরাম ধরে তাঁর। আনুকূল্য পাওয়া।
