সেনাবাহিনী ছাত্রদের হলগুলি অনুসন্ধান করে তেমন কিছু পায়নি। কিন্তু ক্যাম্পাসের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও গ্রেনেড বা গোলাগুলি পেয়েছে। দু-চারজন ছাত্র ও কর্মচারীকে নিয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত সেনাবাহিনীর ইন্টারোগেশন সেন্টারে। সন্ধে নাগাদ শোনা গেল, আমাদের সহকারী মেডিক্যাল অফিসার ডা. আখতারুজ্জামানকে আটক করা হয়েছে। আখতারুজ্জামান একই সঙ্গে সফল চিকিৎসক ও ভালো মানুষ। সুতরাং তার জন্যে আমরা অনেকেই উৎকণ্ঠিত হলাম। উপাচার্যকে তার শহরের বাসভবনে ফোন করে আমাদের উদবেগের কথা জানালাম। তিনি বললেন, রেজিস্ট্রারকে তিনি খোঁজ নিতে বলছেন এখনই, আর পরদিন সকালে অফিসে এসে তিনি। নিজেই এ-বিষয়ে কথা বলবেন।
রেজিস্ট্রারের খোঁজখবরে কোনো কাজ হলো না। পরদিন উপাচার্যের দপ্তরে আমরা অনেকে সমবেত হলাম। কর্নেল কুদ্স এলেন–তিনি প্রকৌশলী, কথাবার্তায়ও কুশলী। বললেন, তাঁদের কাছে খবর আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যামবুলেন্সে অস্ত্রশস্ত্র আনা হয়েছে ক্যাম্পাসে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা তাতে শহর ও ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেছে। ওই চিকিৎসককে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার, প্রয়োজনের এক মুহূর্ত বেশি তাকে আটক রাখা হবে না। না, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে আটক করা হয়েছে মাত্র। আনুষ্ঠানিক ভাষা ব্যবহার করলে বলতে হবে, আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি আমাদের কাজে সাহায্য করছেন।
সেদিন শোনা গেল, ইন্টারোগেশন সেন্টারে আটক ব্যক্তিদের কাউকে কাউকে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। কর্নেল কুদুসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বললেন, আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন। তবে নিশ্চিত থাকুন, বেআইনি কিছু করা হচ্ছে না, আবার কেউ আইন-বিরোধী কিছু করে থাকলে তাকেও ছাড়া হবে না। আটক ব্যক্তি কিছু কিছু ছাড়া পেতে লাগলো। তাদের কাছ থেকে সেনা-কর্তৃপক্ষ এই মর্মে লিখিত ঘোষণা নিয়ে রাখলো যে, তাদের প্রতি কোনো শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি–যাদের প্রতি নির্দয় আচরণ করা হয়েছিল, তারাও এরকম প্রত্যয়ন করলো। ডা. আখতারুজ্জামান ছাড়া পেলে। আমাদের ধারণা হয়, তিনি এই শেষ দলভুক্ত।
আমরা আবার উপাচার্যের কাছে গেলাম। তিনি খবর দিলে কর্নেল কুদুস এলেন। আমিই বললাম, ‘দেখুন, আমরা জানতে পেরেছি, যাদের নির্যাতন করা হয়েছে, তাদেরকেও আপনারা লিখে দিতে বাধ্য করছেন যে, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়নি। এটা কী ধরনের কথা?’ কর্নেল বললেন, ‘আমি এই চার। দেয়ালের মধ্যে আপনাদের বলছি, তবে বাইরে স্বীকার করবো না, প্রকৃত তথ্য বের করার জন্য উই হ্যাভ অ্যাপ্লায়েড থার্ড ডিগ্রি টু সাম ইনডিভিজুয়ালস, বাট ফর আওয়ার সেফটি, যাতে কেউ আমাদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় না নিতে পারে, উই আর অবটেনিং ফ্রম দেম এ স্টেটমেন্ট টু দি ইফেক্ট দ্যাট দে ওয়্যার নট ট্রিটেড হার্শলি। প্রফেসর সাহেব, আমি বুঝতে পারছি, আপনার খারাপ লাগছে, বাট দিস ইজ দি রিয়্যালিটি–নিজেদের প্রটেকশনের জন্য পুলিশ এটা করে, প্রয়োজন হলে আমরা করি। আপনি কি মনে করেন যে, আমরা জিজ্ঞাসা করলেই কেউ সত্যি কথা বলবে? সত্যি কথা বলাতে হয়, তার জন্য জোর খাটাতে হয়। কিন্তু আইনত জোর খাটানো যায় না, তাই তাদের কাছ থেকে ওসব লিখিয়ে নিতে হয়।
আমরা এরপর উপাচার্যকে পীড়াপীড়ি করলাম, সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করার জন্যে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করতে। একটু ভেবে নিয়ে আবুল ফজল টেলিফোন করলেন বঙ্গবন্ধুকে। আমরা বিভাগীয় অধ্যক্ষ যারা উপস্থিত ছিলাম–যতদূর মনে পড়ে, ইংরেজির মোহাম্মদ আলী, বাংলার আমি, অর্থনীতির মুহাম্মদ ইউনূস, পদার্থবিজ্ঞানের এখলাসউদ্দীন আহমদ, গণিতের ফজলী হোসেন, পরিসংখ্যানের এম জি মোস্তফা, হিসাববিজ্ঞানের আলী ইমদাদ খান, ব্যবস্থাপনার শামসুজ্জোহা-তাদের সকলের নাম বললেন। জানালেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার চাইছি এবং তিনি আমাদের সঙ্গে একমত। উপাচার্যের অনুরোধ বিবেচনা করবেন বলে প্রধানমন্ত্রী কথা দিলেন। পরদিন সেনাবাহিনীর কাউকে আর ক্যাম্পাসে দেখা গেল না।
৩২.
প্যারিস থেকে আনোয়ার আবদেল-মালেক চিঠি লিখলেন। ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে ‘ইনইকুয়ালিটি সম্পর্কে সেমিনার হবে। তার আয়োজক ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন আমাকে আমন্ত্রণ জানাবেন। আমি যেন অবশ্যই যাই।
এতদিন বামপন্থার সঙ্গে জড়িত আছি, বিষয়টি আমার নয় বলতে দ্বিধা হয়। আবার বিষয়টি সম্পর্কে যেমন বিশেষ জ্ঞান থাকলে অ্যাকাডেমিক সেমিনারে অংশ নেওয়া যায়, তা আমার নেই, এটা ভেবেও সংকোচ হয়। আনোয়ার আবদেল-মালেককে তা-ই লিখলাম, তবে তার আদেশ শিরোধার্য করতে আমি প্রস্তুত, সেকথা জানালাম। বললাম, তার সঙ্গে দেখা হবে, এই সম্ভাবনাও আমাকে টানছে। তিনি লিখলেন, তিনি যাচ্ছেন না, তবে আমাকে যেতে হবে এবং বিশিষ্টজনদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আসতে হবে।
ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর চিঠিতে জানলাম, কুবেক সেন্টার অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এবং ইন্টারন্যাশনাল সোসিওলজিকাল অ্যাসোসিয়েশনের ন্যাশনাল মুভমেন্টস অ্যান্ড ইম্পিরিয়ালিজম-সম্পর্কিত রিসার্চ কমিশনের যৌথ উদযোগে ১৯৭৪ সালের মে মাসের মধ্যভাগে মন্ট্রিয়লে ওয়ার্লড ইনইকুয়ালিটি শীর্ষক একটি কলোকিয়াম অনুষ্ঠিত হবে। তাতে সংস্কৃতি-বিষয়ে একটি অধিবেশন। থাকবে। ব্রাজিলের এক বিশিষ্টজন যে-প্রবন্ধ পড়বেন সেখানে, তার কপি আমাকে আগাম পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আমার দায়িত্ব, ওই প্রবন্ধ সম্পর্কে সুচিন্তিত আলোচনা করা। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, একটা অবলম্বন পাওয়া গেল।
