আমি চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ার দু-একদিনের মধ্যেই বাণী রায় এলেন। বিমানবন্দরে তাঁকে আনতে গেলাম। দ্রুতপদে বিমান থেকে নেমে তিনি আমার সন্নিকটবর্তী হয়ে বললেন, ‘হরপ্রসাদ মিত্রও এই ফ্লাইটে এসেছেন, তবে তাঁকে আপনার কিছু বলার দরকার নেই। তারা দুজনেই প্রায় সমবয়সী। বাণী রায় কবি; ছোটোগল্প, উপন্যাস ও নাটকেও তিনি সিদ্ধহস্ত। হরপ্রসাদ মিত্র খ্যাতনামা। কবি ও সমালোচক, প্রেসিডেন্সি কলেজের বাংলার অধ্যাপক। যৌবনকালে রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প সম্পর্কে লেখা তাঁর প্রবন্ধ পড়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ খুব আপ্লুত হয়েছিলেন। আমি যখন এম এ পড়ি, তখন তাঁর পিএইচ ডি অভিসন্দর্ভের মুদ্রিতরূপ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা ও কাব্যরূপ পড়েছি পরীক্ষাপাশের জন্যে। তিনি চট্টগ্রামে আসবেন জেনে তাকে আমাদের বিভাগে বক্তৃতা করতে আমন্ত্রণও জানিয়ে এসেছি ঢাকায়। এখন বাণী রায়ের কথা শুনে তাঁকে অবজ্ঞা করি কী করে এবং কেনই বা! আমি আমতা-আমতা করছি, তখন বিমান থেকে নেমে হরপ্রসাদ মিত্র হাত নাড়ছেন আমার উদ্দেশে। বাণী রায়কে বললাম, ‘পিসি, উনি এসে পড়েছেন। একসঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া তো যাক, তারপর যা হয় হবে। যেহেতু গাড়ি আমিই চালাই, হরপ্রসাদ বসলেন আমার পাশে, বাণী রায় পেছনে বসলেন আর বিশেষ শব্দ করলেন না। মনে হলো, হরপ্রসাদ ব্যাপারটা খানিক আঁচ করতে পেরেছিলেন। ওঁদেরকে বিভাগে নিয়ে গিয়ে বক্তৃতা করালাম, তারপর তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলেন, বাড়ি যাওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন না। বাণী রায় এবারে খুশি হয়ে আমার সঙ্গে চললেন।
খেতে খেতে বাণী রায় জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কিসের ডাল?’ বেবী চটপট উত্তর দিলো, মাধবীলতার ডাল। আমাদের খাবার টেবিলের পাশে জানলা, সে জানলার ওপারে মাধবীলতার গাছ। তার একটা ডাল বেঁকে ওই জানলা ঘেঁষে আছে। বাণী রায় জানতে চেয়েছিলেন, যে-ডাল তাঁকে খেতে দেওয়া হয়েছে, সেটা কী। আর বেবী ধরে নিয়েছিল, জানলার ধারে উঁকি দিচ্ছে যে-ডাল, তিনি তার পরিচয় জানতে চাইছেন। বেবীর জবাব শুনে বাণী রায় অস্ফুটস্বরে বলতে লাগলেন, জীবনে কত ডাল খেলুম, কখনো মাধবীলতার ডাল তো শুনিনি। তাঁর এই উক্তি শুনে বেবীর চৈতন্যোদয় হলো। তখন সে ডাল এবং ডালের ভেদনিরূপণতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে প্রবৃত্ত হলো।
কলকাতায় ফিরে গিয়ে ভ্রাতুস্পুত্র অনিরুদ্ধের কাছে আমাদের আতিথেয়তার প্রশংসা করেছিলেন বাণী রায়। হরপ্রসাদ মিত্রের সঙ্গে আমার আর জীবনে দেখা হয়নি।
৩১.
চট্টগ্রামে আসার পরে গবেষণার কাজে আমার কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার প্রস্তাবিত প্রবন্ধের জন্যে অনেকখানি শ্রম ও সময় দিয়েছিলাম। সেটা যথাসময়ে শেষ করতে পারলাম না, পরে আর তাতে হাত দেওয়ার তাগাদাও অনুভব করিনি। তাছাড়া, অন্যের বইয়ের ভূমিকা লিখেছি, স্মারকগ্রন্থের জন্যে প্রবন্ধ লিখেছি, খানিক গবেষণামূলক-খানিক সাধারণ পাঠযোগ্য শ্রদ্ধাঞ্জলি লিখেছি মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মৃত্যুতে। কিন্তু প্রকৃত গবেষণার কাজে হাত দিতে পারিনি। সময় যে বৃথা ক্ষেপণ করেছি, তাও নয়। সংবিধান বা অন্যান্য যেসব কাজ করেছি বাংলার প্রয়োগ নিয়ে, সেও তো আমার কাজ। শিক্ষা কমিশনের জন্যে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মে যে-সময় দিয়েছি তাও তো অকাজে নয়। তবু অনুভব করেছি, অন্যান্য দায়িত্ব থেকে সরে এসে গবেষণায় ফেরা দরকার।
মনের মধ্যে একটা কাজের পরিকল্পনাও ছিল। সুশীলকুমার দে-র হিস্ট্রি অফ বেঙ্গলি লিটারেচর ইন দি নাইনটিথ সেঞ্চুরি (কলকাতা, ১৯১৯) বইতে পুরোনো বাংলা গদ্য সম্পর্কে একটি পরিশিষ্ট আছে। সেটা পড়ে মনে হয়েছিল, এ-বিষয়ে কিছু কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সুকুমার সেনের বাঙ্গালা সাহিত্যে গদ্য (কলকাতা, ১৯৩৪) থেকেও সে-ধারণার সমর্থন পাই। স্থির করি, ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের, অর্থাৎ ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ-প্রতিষ্ঠার আগের, বাংলা গদ্য নিয়ে। গবেষণা করব। কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমিক স্টাফ ফেলোশিপের জন্যে যখন আবেদন চাওয়া হলো ১৯৭৩ সালে, তখন সেই প্রস্তাব দিয়ে দরখাস্ত করে দিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোনয়ন পেতে দেরি হলো না।
এর মধ্যে বিভাগ থেকে এক দুপুরে বাড়ি ফিরছি গাড়ি চালিয়ে। পথের মধ্যে দেখি সেনাবাহিনীর কয়েকজন জওয়ান দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যে একজন হাত দেখিয়ে গাড়ি থামালো। তারপর এগিয়ে এসে বাঙালি উচ্চারণ-ভঙ্গিতে জানতে চাইলো, ‘কিধার জাতা হ্যায়?’ বাংলাদেশের সৈনিকের মুখে উর্দুতে এমন প্রশ্ন শুনে ভয়ানক বিরক্ত হলাম। তবে বিরক্তি চেপে রেখে বললাম, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক–এখানে কোয়ার্টারে থাকি, বাসায় যাচ্ছি। সে এবারে আমার ফোকসওয়াগেনের পেছন দিকে গিয়ে বললো, ‘ডিব্বা খুলো।’ বললাম, ‘ওখানে ইনজিন–আপনি সামনে দেখুন।’ সে কিছুমাত্র লজ্জিত না হয়ে সামনে পেছনে-মধ্যে সব দেখে আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিলো।
ঘরে ফিরে রেজিস্ট্রারকে ফোন করলাম। তার কাছ থেকে জানলাম, দেশে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের ধরতে এবং বেআইনি অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করতে বেসামরিক প্রশাসনকে সাহায্য করার জন্যে সামরিক বাহিনী নিয়োজিত হয়েছে। একজন কর্নেলের নেতৃত্বে একদল সৈন্যকে মোতায়েন করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়-এলাকায়। সামরিক-কর্তৃপক্ষের অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসন তাদের সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
