জসীমউদ্দীনের ভাষণে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল। তিনি বেতার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন; কাগজ ও মুদ্রণের ব্যয় এবং বিজ্ঞাপনের উচ্চহার যে ভালো প্রকাশনার অন্তরায় সে কথা বলেছিলেন; ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বইপত্রের অবাধ আদানপ্রদানের প্রস্তাব এনেছিলেন; বাংলাদেশে রবীন্দ্ররচনাবলি মুদ্রণের বিষয়ে বিশ্বভারতীর অনুমতি ও বাংলা একাডেমির উদ্যোগ দাবি করেছিলেন।
সম্মেলন বিভক্ত হয়েছিল অনেকগুলি শাখা-অধিবেশনে এবং কয়েকটি সাধারণ অধিবেশনে। আবুল ফজল, শওকত ওসমান, আবদুল গনি হাজারী, কাজী মোতাহার হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান ও কবীর চৌধুরী সাধারণ অধিবেশনে এবং মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, রোকনুজ্জামান খান, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, রণেশ দাশগুপ্ত, মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা, কাজী আবদুল মান্নান, সৈয়দ মুর্তজা আলী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নীলিমা ইব্রাহিম, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আবদুল আহাদ, কামরুল হাসান ও আমি শাখা-অধিবেশনে সভাপতিত্ব করি। কবিতাপাঠের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন সুফিয়া কামাল এবং সমাপ্তি-অধিবেশনে ম্যহারুল ইসলাম। আমি একটি সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিয়েছিলাম, আর বাংলাদেশের গবেষণা-সাহিত্য শাখা-অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলাম। ওই অধিবেশনে প্রবন্ধ পড়েছিলেন সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, আর আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ। আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন আ কা মো যাকারিয়া, মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল, মুহম্মদ আবদুর রহীম, মাহমুদ শাহ কোরেশী, নেয়ামাল বাসির, আব্দুর রাজ্জাক ও মনিরুজ্জামান। সভাপতির ভাষণের সূচনায় আমি সেই গল্পটি বলেছিলাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরে আমাদের এক সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি বিদেশে গিয়ে সবাইকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা কীভাবে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। তখন শ্রোতাদের একজন উঠে বললেন, আপনাদের দেশ যে একেবারে বুদ্ধিজীবীশূন্য হয়ে গেছে, আপনার কথা শুনে সে-সম্পর্কে আমাদের সম্পূর্ণ প্রত্যয় জন্মেছে। আমি বলেছিলাম, সেই শূন্যতার সুযোগে সভাপতির আসনটি আমার দখলে এসেছে। মনোজ বসু আমার কথা খুব উপভোগ করেছিলেন।
এই সম্মেলনে অন্নদাশঙ্কর রায়, আশুতোষ ভট্টাচার্য, মনোজ বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিনয় সরকার, বাণী রায়–এঁদের সঙ্গে পুরনো পরিচয় ঝালিয়ে নেওয়া গেল। নতুন পরিচয় হলো লীলা রায়, রমা চৌধুরী, হরপ্রসাদ মিত্র–এঁদের সঙ্গে। বাণী রায় অনিরুদ্ধের পিসিমা–সেই সুবাদে তাঁকে চট্টগ্রামে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। শুনলাম, হরপ্রসাদ মিত্র চট্টগ্রামে আসবেন–তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম আমাদের বিভাগে বক্তৃতা দিতে।
সাহিত্য-সম্মেলনের মাঝখানেই খবর পাওয়া গেল, আমাদের পররাষ্ট্র-সচিব এনায়েত করিম ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ইন্তেকাল করেছেন। অফিসেই ছিলেন, সেখানে হৃদযন্ত্র আক্রান্ত হয় তৃতীয়বারের মতো। ১৯৫৯ সালে আমার পিএইচ ডি গবেষণার কাজে কলকাতায় গিয়ে তারই আশ্রয়ে ছিলাম। তারপরেও অনেকবার দেখা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অবস্থায় যখন পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেন, তখনো তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। তবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা-অর্জনের পর পররাষ্ট্র সচিব হয়ে শারীরিক অসামর্থ্য অগ্রাহ্য করে আপ্রাণ সেবা করেছেন দেশের। তার স্ত্রী হুসনা করিম অতি চমৎকার মানুষ। খবর পেয়ে দৌড়ে গেলাম তাঁদের ধানমন্ডির বাসায়। এনায়েত করিমের দাফন হয়ে গেছে ততক্ষণ। হুসনা ভাবির সঙ্গে দেখা করে ফিরে এলাম। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার ছিল না।
এদিকে অনেক কিছু ঘটছিল দেশে। জানুয়ারি মাসে যখন আওয়ামী লীগের কাউনসিল-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, তখন বঙ্গবন্ধু জানিয়েছিলেন, তিনি দলীয় প্রধানের দায়িত্বে আর থাকবেন না। সেই সিদ্ধান্ত-অনুযায়ী এ এইচ এম কামারুজ্জামান দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার ফলে তিনি আবার মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এটাও ঘটে সাহিত্য-সম্মেলন চলাকালে। আমরা অনেকেই এতে খুশি হই, দল আর সরকারের মধ্যে একটা সীমারেখা টানা হচ্ছে বলে। তবে এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সর্বব্যাপী ভূমিকায় পার্থক্য ঘটে না। দল ও সরকারের ভেদ কিছুটা তাত্ত্বিক হয়ে পড়ে।
সাহিত্য-সম্মেলন শেষ হলো একুশে ফেব্রুয়ারিতে। তার পরদিনই পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলো বাংলাদেশকে। আর ২৩ তারিখেই ইসলামি রাষ্ট্র-সংস্থার সম্মেলনে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধু উড়ে গেলেন। লাহোরে। আমরা তো ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে ইসলামি দেশ হিসেবে দেখিনি, দেখার পক্ষপাতীও নই। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই শুনছিলাম, অনেক বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক চাইছিলেন বাংলাদেশ এই সম্মেলনে যোগ দিক। সরকারের পক্ষ থেকে নাকি বলা হয়েছিল যে, তার আগে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি পেতে হবে। ও আই সির প্রভাবশালী সদস্যদের চাপে পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে। লাহোর বিমানবন্দরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাদকেরা আমার সোনার বাংলা বাজিয়ে অভ্যর্থনা জানায় শেখ মুজিবকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল টিক্কা খান তাঁকে অভিবাদন জানান। এইসব দরকষাকষির বিষয়ে ভারতকে কিছুটা অন্ধকারে রাখে বাংলাদেশ, যদিও আমার সন্দেহ, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাদের সরকারকে পরিস্থিতি অবহিত করতে কার্পণ্য করেনি। ভারতের প্রভাববলয় থেকে আমরা যে স্বাধীন, তা প্রমাণ করতে যথাসাধ্য করছিলেন আমাদের কূটনীতিকেরা–হয়তো রাষ্ট্রের কর্ণধারেরাও। আমাদের মনে হলো, তারই ফলে, পাকিস্তানের স্বীকৃতির বিনিময়ে ও আই সির সদস্যপদ নিলো ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। তবে যখন ভাবি, ভারতও এক সময়ে। ও আই সির সদস্যপদপ্রার্থী ছিল যদিও তাকে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়, তখন আমাদের সরকারের কাজ আর বিস্ময়কর মনে হয় না। কূটনীতিতে বোধহয় সবই চলে।
