সহকর্মীদের কেউ ফোনে খবর দিয়ে, কেউ কিছু না জানিয়েই, মান্যবর অতিথির সঙ্গে সৌজন্য-সাক্ষাৎ করতে এলেন এবং কিছু আবশ্যক রাজনৈতিক প্রশ্ন ও কিছু অনাবশ্যক ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে তাঁকে বিব্রত করে তুললেন। যাঁরা দর্শন দিতে এলেন, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিথির কথা বলার সুযোগ সীমিত হয়ে এলো। কেউ তাঁকে প্রশ্ন করলে আরেকজন তার উত্তর দেন; কেউ প্রশ্ন করতে গেলে তাঁকে থামিয়ে আরেকজন নিজের মতামত শোনাবার তাগিদ অনুভব করেন। তারপর এক সময়ে কারো খেয়াল হয়, অতিথির খাওয়া দাওয়ার পালা তো এখনো বাকি। উঠতে উঠতে আরো কিছুক্ষণ যায়।
কামাল যতই বলুন না কেন ব্যক্তিগত সফর, রাজনীতি কি পেছন ছাড়ে রাজনীতিবিদের? পরদিন জনসভায় তাঁকে বক্তৃতা করতে হলে চট্টগ্রাম শহরে। তার পরদিন সকালবেলায় আমরা কাপ্তাই রওনা হলাম। ব্যবসায়ী ইসলাম খার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটা ঢাউস গাড়ি প্রশাসন চেয়ে নিয়েছিল–তাতে আমরা সপরিবারে। আর ডি সি-পুলের পতাকাশোভিত সংকীর্ণপরিসর ও কান্তিহীন গাড়িতে মন্ত্রীর পরিবার। কাপ্তাইতে ওয়াপদার রেস্ট হাউজে থাকার ব্যবস্থা উত্তম, খাওয়ার ব্যবস্থা তার চেয়েও ভালো। কামাল একবার সখেদে বললেন হামিদাকে, ‘আমি অল্প খেয়েও মোটা হয়ে যাই, আর আনিসকে দেখো, এত খেয়েও তার গায়ে কিছু লাগে না। কাপ্তাই-অবস্থান খুব উপভোগ করেছিলাম আমরা। কামালের বড়ো মেয়ে সারা রুচির চেয়ে বয়সে কিছু ছোটো; দীনা আর শুচি একেবারেই সমবয়সী-কামালের ভাষায়, সিক্সটিনাইন মডেল। ওরা খুব মিলেমিশে খেলাধুলা করে কাটালো। এখানে অতিথি-অভ্যাগতের ভিড় ছিল না। আমরা দেশের হাল-হকিকত আর বন্ধু-বান্ধবদের বিষয়ে আলাপ করে দিনাতিপাত করলাম।
হঠাৎ করে বেতারের খবরে শুনলাম, রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার মোহাম্মদউল্লাহ্ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। কামালের সঙ্গে কথা বলে ধারণা হলো, আবু সাঈদ চৌধুরী যে পদত্যাগ করবেন কিংবা তাকে যে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে, তা তিনি জানতেন; তবে কে যে তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন, তা তখনো তার অজানা। আবু সাঈদ চৌধুরী সম্পর্কে আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ ছিল–বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যে-ভূমিকা তিনি পালন করেছিলেন, তা শ্লাঘার যোগ্য। তাই তাঁর বিদায়ে খুব খারাপ লাগলো। স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন তা সাংবিধানিক বিধানের কারণে। তাও বললাম, লোকটার বরাত বটে! আওয়ামী লীগের দপ্তর-সম্পাদক থেকে ডেপুটি স্পিকার হলেন। কেউ ভাবেনি, উনি স্পিকার হবেন; হঠাৎ করে শাহ আবদুল হামিদের মৃত্যুতে সেই পদ লাভ করলেন। এখন আবার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। ভাগ্যবিধাতা নিশ্চয় আমার কথা শুনে হেসেছিলেন। কেননা মাসখানেক পরে তিনি রাষ্ট্রপতির স্থায়ী আসনে অভিষিক্ত হন।
তবে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীও আমাকে হতাশ করলেন। অল্পকাল ব্যবধানে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হয়ে তিনি জেনেভায় গেলেন। তারপর ইউরোপ ও আফ্রিকার নানা দেশে দৌত্যকর্ম করলেন। যিনি রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেছেন, তিনি আবার অন্য পদে নিয়োগগ্রহণ করবেন কেন? তখন কি আর জানতাম যে, তিনি এবং তাঁর সাক্ষাৎ উত্তরাধিকারী পরে মন্ত্রিত্ব নেবেন?
যাহোক, কাপ্তাইয়ের আনন্দিত দিনগুলির শেষে ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম। পরদিন রাতে–এবারে ট্রেনে করে–অতিথিরা ঢাকায় ফিরে গেলেন। রেলের সেলুন দেখে তো রুচি-শুচি বেজায় খুশি, প্রলুব্ধও বটে। বলে, এমন গাড়ি করে আমরা ঢাকায় যেতে পারি না? যতক্ষণ পারলো, তারা সারা-দীনার সঙ্গে একবার বিছানায়, একবার চেয়ারে বসে নিলো।
৩০.
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সাহিত্য-সম্মেলন আয়োজন করলো বাংলা একাডেমি ১৯৭৪ সালের ১৪ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আটদিন ধরে। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী, ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুবার্ষিকী। মনে হয়, এ দিনগুলো এড়িয়ে ২১ থেকে ২৮ পর্যন্ত সম্মেলন করলে ভালো হতো। আয়োজনটা অবশ্য হয়েছিল বিশাল। অভ্যর্থনা পরিষদের। সভাপতি মযহারুল ইসলাম এবং সম্পাদক রাহাত খান ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি রাখেননি। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মানি, রুমানিয়া, মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনাম–এসব দেশের প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। অন্নদাশঙ্কর রায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধিদলের। তাঁর সঙ্গে ছিলেন। অজিতকুমার ঘোষ, আশুতোষ ভট্টাচার্য, গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, জগন্নাথ চক্রবর্তী, জীবেন্দ্র সিংহরায়, দুলাল চৌধুরী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, বাণী রায়, বিনয় সরকার, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ সেন, মনোজ বসু, মন্মথ রায়, রমা চৌধুরী, লীলা রায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সবিতাব্রত দত্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও হরপ্রসাদ মিত্র। আবৃত্তিকার প্রদীপ ঘোষও ছিলেন সেইসঙ্গে।
সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, মূল সভাপতি ছিলেন জসীমউদ্দীন, বিশেষ অতিথি শিক্ষা ও সংস্কৃতিমন্ত্রী মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। তিনটি প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল। মোহাম্মদ সাইদুরের সংগ্রহ নিয়ে লোকশিল্পের প্রদর্শনী, উদ্ববাধন করেন জয়নুল আবেদিন। তাছাড়া, মুরাল প্রদর্শনী উদ্ববাধন করেন আবদুল মতিন চৌধুরী এবং গ্রন্থ প্রদর্শনী উদবোধন করেন আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ্। নৃত্যগীতবাদ্যনাট্যের কোনো-না-কোনো অনুষ্ঠান হয়েছিল প্রতি সন্ধ্যায়।
