অতিথিদের নিয়ে গিয়েছিলাম ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবদুল করিমের বাড়িতে। চা খেতে খেতে তাঁদের সাম্প্রতিক গবেষণা নিয়ে আলাপ করলেন–অনেকটাই আনুষ্ঠানিক, তবে সৌজন্যপূর্ণ। মুশকিলে ফেললেন ওই বিভাগেরই এক শিক্ষিকা–তিনি একবেলা রমিলাকে খাওয়াবেনই, অথচ রমিলা একেবারেই রাজি নয় খেতে। শেষ পর্যন্ত রফা হলো, শহরে তাঁর বাড়িতে চা খাব। অতি সুসজ্জিত ভবন, চায়ের আয়োজন রাজসিক, ভদ্রমহিলার আন্তরিকতাও অকৃপণ, তবে সেখানে দেখা দিল এক বিব্রতকর পরিস্থিতি। নিমন্ত্রণকত্রী দাবি করছেন, তিনি রমিলার বই পড়েছেন, অথচ সে বইয়ের নাম মনে করতে পারছেন না। রমিলার লেখা যে-বইটা সহজে পড়া সম্ভবপর–পেলিক্যান পেপারব্যাক বলে–আমি তার নাম মনে করিয়ে দিই, কিন্তু বাংলার ছাত্রের কাছ থেকে ইতিহাসের বইয়ের নাম নিতে তিনি রাজি হন না। ‘না, না’ বলে তিনি অন্য নাম ভাবতে থাকেন, বলেও ফেলেন বোধহয় এক-আধটা, তবে তা লাগসই হয় না। ফেরার পথে রমিলা ক্ষোভের সঙ্গে বলে, আমার নামটি ছাড়া তোমার সহকর্মীর কোনো ধারণাই নেই আমার। সম্পর্কে, তবু কেন যে খাওয়াবার জন্যে এত জোর করলেন–!’ সবটা লঘু করতে বললাম, ‘ওই নাম-মাহাত্ম্যের কারণেই, নইলে কি ডিনার না খেয়ে ফিরতে পারতে!’
২৮.
বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পদকে ভূষিত করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। স্থির হয়েছিল, পরবর্তী এশীয় শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ঢাকায় এবং পদকটা প্রদান করা হবে সেখানে। ১৯৭৩ সালের মে মাসে দুদিনব্যাপী এই সম্মেলন আয়োজিত হলো। ইতিহাস সম্মেলনের সময়ে মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক দাবিপূরণের লক্ষ্যে অনশন করেছিলেন, এবারে বিদেশি প্রতিনিধিরা যেদিন আসতে আরম্ভ করলেন, বাম রাজনৈতিক দলগুলো সেদিন ঢাকায় হরতাল আহ্বান করলো। হোটেল পূর্বাণীর সামনে ছোটো চত্বরটায় ভিয়েতনাম-মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছিল, কারা জানি সেটাও ভেঙে দিল। সবটা নিয়ে কিছুটা উত্তেজনাও দেখা দিয়েছিল। তবে শেরে বাংলা নগরে বেশ বড়ো করেই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। বাংলাদেশের বাইরে প্রতিনিধি এসেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, লাওস, কম্বোডিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, মঙ্গোলিয়া, জাপান, ইরাক, সিরিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন, ওমান, জর্দান, প্যালেস্টাইন, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, গায়েনা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। বিশিষ্টজনের মধ্যে ছিলেন ডিন রিড, মিসেস চেডি জাগান ও কৃষ্ণ মেনন, বিশ্বশান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র তো ছিলেনই। রমেশ চন্দ্রই বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি পদক পরিয়ে দেন। সকলেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে কথা বলেছিলেন। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের সভাপতি, তকালীন কৃষিমন্ত্রী, আবদুস সামাদ আজাদ। সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবে পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের দাবি জানানো হয়েছিল। সম্মেলনটি সত্যিই আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছিল এবং আমাদের মনে এর রেশ লেগে ছিল বেশ কিছুদিন ধরে।
২৯.
শহর থেকে দূরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অপেক্ষাকৃত নিস্তরঙ্গ জীবনে কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হতো অতিথির আগমনে। চাঞ্চল্যটা পারিবারিক পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ থাকতো যদি না অতিথি সামাজিকভাবে সুপরিচিত হতেন। ১৯৭৩ সালের শেষে আমার বাসায় সপরিবারে কামাল হোসেনের আগমনে তাই গোটা ক্যাম্পাসেই মৃদু তরঙ্গ বয়ে গিয়েছিল। কামাল তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কর্মজীবনের কোলাহলের বাইরে নিজের এবং বন্ধুর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোই ছিল তার একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু এত ব্যস্ত মানুষ যে কেবল বেড়াতে আসবেন এই পাড়াগাঁয়ে–তা অনেকের বিশ্বাস হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই, আমি কোন পদ অধিকার করতে যাচ্ছি, সে-সম্পর্কে জল্পনা ছিল সহকর্মীদের মধ্যে। এবারে তাঁরা নিশ্চিত ধারণা করলেন যে, আমি রাষ্ট্রদূত হতে যাচ্ছি। কেউ কেউ বোধহয়, কোন দেশে যাচ্ছি, তাও স্থির করে ফেলেছিলেন। আমি বলেছিলাম, কাউকে রাষ্ট্রদূত বানাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার বাড়ি যেতে হয় না। সে-কথায় বেশি কাজ হয়নি।
হামিদা বরাবরই অনাড়ম্বর জীবনযাপনের পক্ষপাতী। তিনি কামালকে বলেই নিয়েছিলেন যে, বেড়াতে যদি যেতে হয়, তাহলে মন্ত্রিত্বের আনুষঙ্গিক অলংকার অফিসে ফেলে রেখেই যেতে হবে। কামালও জেলা-প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন, এটা একেবারেই বেসরকারি সফর। কিন্তু প্রশাসনের তো একটা দায়িত্ব আছে মন্ত্রীকে নিরাপত্তা দেওয়ার। সুতরাং মন্ত্রী মহোদয় সন্ধ্যার পরে নিরাপত্তা রক্ষী পরিবেষ্টিত হয়েই পৌঁছালেন আমার বাড়িতে। আর সঙ্গে সঙ্গেই রক্ষাকর্তাকে বলে দিলেন, যান, আপনারা এখন ফিরে যান। রক্ষীপ্রধান মুখ খুলতে গিয়ে সামলে নিলেন। খানিক পরে আমার কাজের ছেলে এসে আমাকে খবর দিলো, কেউ একজন কথা বলতে চায় আমার সঙ্গে। বেরিয়ে দেখি, সেই পুলিশ কর্মকর্তা। কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘মিনিস্টার সাহেব আমাদের বিদায় দিলেন; কিন্তু সার, ওঁর সিকিউরিটির দায়িত্ব আমার–আমি কী করে চলে যাই! আপনার গ্যারাজের ওপরের ঘরটায় যদি রাতটা আমাদের থাকতে দেন, তাহলে সারও জানতে পারবেন না, আমাদেরও ডিউটি দেওয়া হবে। আমরা আপনাদের কোনোরকম বিরক্ত করবো না। সেই ব্যবস্থাই করা গেল।
