এহেন মালরো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ঘোষণা করেছিলেন, স্পেনের গৃহযুদ্ধকালের মতো আবার আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবীরূপে তিনি লড়তে চান আমাদের হয়ে। তখন তাঁর বয়স ৭০। তার এই ঘোষণা বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগিয়েছিল। সেই কথা মনে রেখেই বাংলাদেশ সরকার তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এই সফরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ-বিষয়ে উপাচার্য খান সারওয়ার মুরশিদের উদ্যোগ ছিল প্রধান। মালরো এ সম্মান স্বীকার করতে সম্মত হন। এবারের সফরের একটি উদ্দেশ্য ছিল তা গ্রহণ করা। বাংলাদেশে মালরোর অবস্থানকালে তার সার্বক্ষণিক সহচর ছিলেন মাহমুদ শাহ্ কোরেশী।
রাষ্ট্রীয় অতিথি-ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন তাকে নৈশভোজে আপ্যায়িত করেন। তাতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন লেখক-শিল্পী। জসীমউদ্দীন ছিলেন আমাদের নেতৃস্থানীয়। নৈশভোজের আগে মালরোর সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ হয়েছিল আমাদের। তখন মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠল, সেইসঙ্গে এ দেশের সাহিত্য-শিল্পের প্রসঙ্গ এবং অনিবার্যভাবে রবীন্দ্রনাথের বিষয়। উল্লেখযোগ্য যে, রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিক উদ্যাপনের জন্যে গঠিত ফরাসি জাতীয় সমিতির সভাপতি ছিলেন মালরো। ঢাকায় সে-সন্ধ্যায় মালরো বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির আঁদ্রে জিদকৃত ফরাসি অনুবাদ পড়ে তিনি চমৎকৃত হয়েছিলেন বটে, তবে রবীন্দ্রনাথের যে-রচনাটি তাকে সত্যি সত্যি নাড়া দিয়েছিল, তা ঘরে-বাইরে। মালরো ইংরেজিতে কথা বলছিলেন, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসটির নাম বলেন দি হোম অ্যান্ড দি ওয়ার্ল্ড। অনেকে সেটা ধরতে পারেননি, জসীমউদদীন আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চান, কোন উপন্যাসের কথা বলছেন মালরো। বলি, ঘরে-বাইরে। মালরোর প্রশংসায় আমি একটু বিস্মিত হই। এর আগে পৃথীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ফরাসীদের চোখে রবীন্দ্রনাথ (কলকাতা, ১৯৬৩) বইতে ঘরে-বাইরে সম্পর্কে লুই জিলের আলোচনা পড়েছিলাম। তাতে উপন্যাসটির প্রশংসা ছিল না, সৌজন্যস্বরূপ যতটা বলতে হয়, তার অবশ্য অভাব হয়নি। কিন্তু মালরো, দেখলাম, বলছেন, আধুনিক জীবন ও রাজনীতির যে-সংকটের কথা আছে ওই উপন্যাসে, যৌবনকালে তাঁর মনে হয়েছিল, তা সর্বজনীন এবং সে-ধারণা পালটাবার কোনো কারণ পরে তার ঘটেনি।
ঢাকায় এসে মালরো বলেছিলেন, স্বাধীনতার জন্যে বাংলাদেশে যত রক্তপাত হয়েছে, বিশ্বের আর কোথাও তা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন তিনি, ছাত্রদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, একইরকম নিষ্ঠার সঙ্গে তারা যেন দেশের পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করে। রাজশাহী ছাড়াও তিনি চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে আবুল ফজলের সভাপতিত্বে তাঁকে দেওয়া হয় নাগরিক-সংবর্ধনা। স্বদেশে ফিরে যাওয়ার আগে মালরো বলে গিয়েছিলেন, পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত। প্রতিহিংসার মনোভাব থেকে পাকিস্তান যদি সেখানে আটকে-পড়া বাঙালিদের বিচার করতে চায়, সেটা হবে তাদের পক্ষে নির্বুদ্ধিতার শামিল।
পাকিস্তান অবশ্য আটক বাঙালিদের বিচার করতে পারেনি। আর মাস ছয়েকের মধ্যেই তারা ফিরে আসতে আরম্ভ করেছিলেন। অবশ্য তার আগে অনেকেই পালিয়ে আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তবে আমরাও তখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে সমর্থ হইনি।
২৭.
ইতিহাস পরিষদের তৃতীয় বার্ষিক সম্মেলন হলো ঢাকায়, মে মাসে। এটাই বোধহয় ছিল পরিষদের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ সম্মেলন। রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সম্মেলন উদ্বোধন করেন, অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী, মূল সভাপতি মুহম্মদ এনামুল হক। সারা দেশ থেকে শ দুয়েক প্রতিনিধি এসেছিলেন, ভারত থেকে ২৮ জন, পূর্ব জার্মানি থেকে দুজন, অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন। ঢাকা জাদুঘরে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনী উদ্ববাধন করেন কামাল হোসেন। তিনদিনব্যাপী এই সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এ এল ব্যাশাম, দীনেশচন্দ্র সরকার, পরমাত্মা শরণ ও আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ। প্রবন্ধ পাঠ করেন দীনেশচন্দ্র সরকার, জিয়াউদ্দীন দেশাই, কমলাকান্ত গুপ্ত, অরুণ দাশগুপ্ত, অনিরুদ্ধ রায়, সৈয়দ মুর্তজা আলী, সৈয়দ ইমামুদ্দীন, অমলেন্দু দে, এম এল দাশ, ভূপেন কানুনগো, সালাউদ্দীন আহমদ, রজতানন্দ দাশগুপ্ত, হান্স পিয়াজা, নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ, বাদলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সনকুমার সাহা, আলী আনোয়ার ও যতীন সরকার (তিনি অবশ্য অনুপস্থিত ছিলেন)। বিশেষ ভাষণ দেন নীহাররঞ্জন রায়। অতিথিদের পক্ষ থেকে সমাপনী অধিবেশনে বক্তৃতা করেন এ এল ব্যাশাম, গুনটার সনটাইমার ও রমিলা থাপার।
সম্মেলনে যোগ দিতে পারিনি বলে আমার খুব আফসোস হয়েছিল। তবে আমার বন্ধু অনিরুদ্ধ রায় সম্মেলনশেষে রমিলা থাপার ও অধ্যাপক গ্রোভারকে নিয়ে চট্টগ্রামে আমার বাড়িতে বেড়াতে আসে। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ঘুরে বেড়ানো ও আড্ডা দেওয়া। অনিরুদ্ধ বলেই রেখেছিল, কোথাও যেন কোনো বক্তৃতার আয়োজন না করি, আমি সেই ইচ্ছে মেনে নিয়েছিলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকে বোধহয় তাতে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ আসছেন, অথচ ইতিহাস বিভাগে যাবেন না এবং থাকবেন বাংলার শিক্ষকের বাড়িতে, এটা তাদের পছন্দ হয়নি। অনিরুদ্ধ তো বন্ধুই, রমিলার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারাভিযান চালাতে দিল্লিতে যাই এবং জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা করি। গ্রোভার দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। তাঁর এক ভাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালে পূর্ব রণাঙ্গনে অংশ নিয়েছিলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাই তাঁর বিশেষ ঔৎসুক্য ছিল। ওঁদের নিয়ে আমার যুদ্ধফেরত ফোক্সওয়াগনে করে গেলাম কাপ্তাই ও রাঙামাটিতে। ওঁরা খুব উপভোগ করেছিলেন। ক্যাম্পাসের নিরিবিলি আবহাওয়া এবং আমার বাড়ির অনানুষ্ঠানিক পরিবেশ ওঁদের ভালো লেগেছিল। এক সন্ধ্যায় বাড়ির লনে বসে গল্প করছি। আমার প্রতিবেশী শিল্পী রশিদ চৌধুরী এসে পানীয়ের একটা বোতল আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনার অতিথিরা হয়তো এটা পছন্দ করবেন।’ রশিদ বসলেনও না, সকলের সঙ্গে সৌজন্য-বিনিময় করে চলে গেলেন। আমার অতিথিদের জন্যে তার এমন উদ্বেগ দেখে আপ্লুত না হয়ে পারিনি।
