আমি অধ্যাপকপদে নিযুক্তিলাভ করায় রিডারের পদটি শূন্য হলো। সে জায়গায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালকে আনবার কথা ভাবলাম। একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকনিয়োগ সংক্রান্ত কাজে গিয়ে দেখে এসেছিলাম, তিনি ভালো নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং রাজশাহী বেতারকেন্দ্র থেকে তাঁকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কথিকা নিয়মিত প্রচার করায়। আবু হেনার ক্ষুরধার জিহ্বাগ্র থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে-বাক্যধারা নির্গলিত হতো, তাতে অনেকের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ ঘটতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে আনলেন পাকিস্তানের হয়ে দালালির অভিযোগ। উপাচার্য খান সারওয়ার মুরশিদ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি, ফলে আবু হেনার প্রতিপক্ষ অন্যত্র অভিযোগ করে ফল পাওয়ার চেষ্টা করলেন। আবু হেনার জন্যে সমস্ত পরিবেশটি খুব অস্বস্তিকর হয়ে পড়েছিল। তার সঙ্গে কথা বলে আমি বুঝলাম যে, চট্টগ্রামে আসতে তাঁর বাধা নেই। আমি পদটি বিজ্ঞাপিত করার ব্যবস্থা করলাম। ঠিক এমনি সময়ে তিনি গ্রেপ্তার হলেন। রাজশাহীতে অধ্যাপক সারওয়ার মুরশিদের এবং ঢাকায় আবু হেনার ভগ্নিপতি, বঙ্গবন্ধুর অশেষ আস্থাভাজন, বিশিষ্ট সাংবাদিক কে জি মুস্তাফার চেষ্টায় আবু হেনা ছাড়া পেলেন। আমি তাঁকে আবেদনপত্র পাঠালাম, তিনি যথারীতি আবেদন করলেন। সাক্ষাৎকারের দিনে আমি নিজে বিমানবন্দর থেকে তাঁকে নিয়ে এলাম এবং সাক্ষাৎকার-শেষে আবার ওই পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দিলাম। আরো একজন প্রার্থী ছিলেন বটে, কিন্তু আবু হেনার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকৃতপক্ষে কেউ ছিলেন না। আবু হেনার আশঙ্কা ছিল, নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য ড. মুহম্মদ এনামুল হক কোনো কারণে হয়তো তার নিয়োগের বিরোধিতা। করবেন। এনামুল হক তা করেন নি–হয়তো উপাচার্য ও আমার আগ্রহের কথা জেনে। তবে নির্বাচকমণ্ডলীর সভায় আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আবু হেনার যোগ্যতার বিষয়ে তো সন্দেহ নেই, তবে কোথাও সে বেশিদিন থাকতে পারে না। তুমি তাকে আনতে চাও, আনো, কিন্তু কিছুদিন পরে সে হয়তো আবার এখান থেকে ঢাকায় যেতে ব্যগ্র হয়ে উঠবে। সর্বসম্মতিক্রমেই আবু হেনাকে নিয়োগদানের সুপারিশ করা হয়ে গেল। তবে আমার সহকর্মীদের মধ্যে যারা কর্মে জ্যেষ্ঠ, তাঁদের কেউ কেউ যে এতে খুশি হননি, সে কথা আমি পরে বুঝেছিলাম। আর ঢাকা ও রাজশাহীতে যারা আবু হেনার প্রতি বিরূপ ছিলেন, চট্টগ্রামে তাঁর নিয়োগে তারাও আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
আমি নিজের মতো করে বিভাগ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম। অধ্যক্ষ হয়েই আমি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যাতে কারো কারো পক্ষে অসুখী হওয়ার কারণ ঘটেছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরদিন আমাদের ছাত্রপ্রতিম একজন অ্যাডহক নিয়োগ নিয়ে লেকচারার পদে যোগ দেয়। তার চাকরি যাতে পাকা হয়, তা দেখতে আমাদের এক সহকর্মী। অনুরোধ করলো আমাকে। আমি বললাম, এমন যুদ্ধের মধ্যে যে-চাকরিতে যোগ দেয়, তার বিবেচনাশক্তির ওপরে আমার আস্থা নেই। পদ বিজ্ঞাপিত হবে, তাকে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আসতে হবে। আমি তার প্রার্থিতা সমর্থন করবো, এমন আশ্বাস না পেয়ে সে বিভাগে আসা বন্ধ করে দেয় এবং পরে ওই পদ বিজ্ঞাপিত হলে সে আবেদনও করেনি। ১৯৭০ সালের এম এ পরীক্ষায় ছ জন প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল–তার মধ্যে মাহবুবুল হক ছিল একজন। আমি তাকে আবেদন করতে বলেছিলাম। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে তখন আগ্রহী হয়নি। তার সঙ্গে প্রথম শ্রেণি পাওয়া। আরেকজন ছিল শিপ্রা রক্ষিত–সে গহিরা কলেজে শিক্ষকতা করছিল। সে আবেদন করে এবং নিয়োগলাভ করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিভাগের গবেষণা-সহায়ক মাহবুব তালুকদার বাংলাদেশ সরকারের কর্মে যোগ দিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সে আর চট্টগ্রামে ফিরে আসেনি–ঢাকায় সরকারি চাকরিতে স্থায়ী হয়েছিল। এতে আমাদের বিভাগের পিয়ন আলম মন্তব্য করেছিল যে, মাহবুব সার খুব চালাক–ঢাকায় সরকারি চাকরি পেয়েছে; আমাদের সার (অর্থাৎ আমি) চালাক নয়–আগের চাকরিতেই চট্টগ্রামে ফিরে এসেছে। মাহবুবের শূন্যপদে নিয়েছিলাম খায়রুল বশরকে-রশীদ আল ফারুকী ছদ্মনামে তার তখন দুটি বই বেরিয়েছে। পরে সে লেকচারার পদে উন্নীত হওয়ায় গবেষণা-সহায়ক পদে ভূঁইয়া ইকবাল যোগ দেয়।
১৯৭২ সালে ঢাকায় ঘন ঘন আসতে হওয়ায় এ এফ রহমান হলের প্রোভোস্ট হিসেবে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারিনি। আবহাওয়াজনিত কারণে ঢাকা-চট্টগ্রামের ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ফলে যেদিন হল ছাত্র-সংসদের অভিষেক-অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারলাম না, সেদিন আমার খুবই খারাপ লেগেছিল। যদিও আমি ওই পদ ত্যাগ করতে চেয়েছিলাম, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আমাকে ছাড়তে চাননি ইন্নাছ আলী। ১৯৭২ সালের শেষদিকে প্রোভোস্ট হিসেবে আমার দু-বছরের কার্যকাল শেষ হওয়ার আগে উপাচার্যকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছিলাম আমার নিয়োগের মেয়াদ বৃদ্ধি না করতে। উপাচার্য সে অনুরোধ রেখেছিলেন।
২৬.
এপ্রিলের শেষে বাংলাদেশের এক অকৃত্রিম বন্ধু আঁদ্রে মালরো ঢাকায় এলেন। মালরো বিশিষ্ট সাহিত্যিক, দু-দুবার মন্ত্রী হয়েছেন ফ্রান্সে। তিনি সংস্কৃতিমন্ত্রী থাকতে প্যারিসের সব ঘরবাড়ির বাহ্যরূপটা ঘষে-মেজে পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তা সত্যি বাহ্য। বিশের দশকে তিনি চীনের বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে জড়িত করেছিলেন, তিরিশের দশকে আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে যোগ দিয়ে স্পেনের গৃহযুদ্ধে প্রজাতন্ত্রীদের পক্ষে লড়াই করেছেন, চল্লিশের দশকে মাতৃভূমি রক্ষায় যুদ্ধ করেছেন হিটলারের জার্মানির বিরুদ্ধে। চীনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন, স্পেনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি, জার্মান কমিউনিস্টদের নাৎসি-প্রতিরোধ নিয়ে আরেকটি। তিনি এসব বিষয়কে বিশেষ বিশেষ দেশের রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে অতটা দেখেননি, যতটা দেখেছেন ভাগ্যের সঙ্গে মানুষের প্রতিনিয়ত সংগ্রামের অধ্যায়রূপে। শিল্প সম্পর্কে তাঁর লেখায়ও দেখা যায়, শিল্পকলাকে তিনি দেখছেন মহতের পথে মানুষের যাত্রা বলে। তাঁর স্মৃতিকথাও অসাধারণ রচনা বলে স্বীকৃত।
