এখানে অতি আধুনিক আরামদায়ক চায়কা গাড়ি চড়েন রাষ্ট্র ও পার্টির আমলারা। সেসব গাড়ি যখন পথ দিয়ে যায়, তখন যে-দৃষ্টিতে সাধারণ লোক সেদিকে তাকায়, শুনতে পাই, তাও প্রসন্নতার নয়।
মস্কোয় যা দর্শনীয়, তার কিছু কিছু দেখা হলো। ক্রেমলিন শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্থাপত্যকর্ম আকর্ষণীয়–ওই নকশার মোট চারটি ভবন আছে মস্কোয়। লেনিনের শব যেখানে রাখা রয়েছে, সেখানে বহু মানুষের সুশৃঙখল উপস্থিতি এবং নীরব শ্রদ্ধানিবেদন আপ্লুত করার মতো। লেনিনের মরদেহ যে এতদিন ধরে রেখে দেওয়া সম্ভবপর হয়েছে, তার কৃতিত্ব দাবি করেন সমাজতন্ত্রী বিজ্ঞানীরা। নাৎসি সৈন্যেরা মস্কোর উপকণ্ঠে পৌঁছে, যে-জায়গায় প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পর্যদস্ত হয়, সেখানে খুব সরল একটি স্মারক আছে–দুটি কাঠ কোনাকুনি করে রেখে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রতীক–সেখানে গিয়ে মাতৃভূমি-রক্ষার জন্যে অসংখ্য মানুষের আত্মাহুতির কথা আপনা থেকেই মনে জাগে।
দোকানপাটও কিছু ঘুরলাম। একটি বিশাল দোকান আছে–সেখানে বাচ্চাদের সবরকম জিনিস বিক্রি হয়। সেখান থেকে সেই বিখ্যাত রুশ পুতুল কিনলাম–একটার মধ্যে আরেকটা, এই করে মোট বারোটা। আরো একটি বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর–অনেক জিনিসেরই চাকচিক্য কম, তার পাশ্চাত্য রকমফেরের তুলনায়, কিন্তু দামও অবিশ্বাস্যরকম কম। মস্কোর রাস্তা দিয়ে বড়ো বড়ো ট্রাক-ভ্যানে বাড়িঘরের প্রি-ফ্যাবরিকেটেড অংশসব নিয়ে যেতে দেখলাম একাধিক দিন। শহরতলিতে কোথাও আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে–এসব জুড়ে অল্পসময়ে বাড়ি তৈরি হয়ে যাবে। মস্কোর মেট্টো চড়লাম–তখন লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড বা প্যারিসের মেট্রোর চেয়ে মস্কোর পাতালরেল ও তার। স্টেশনগুলো বেশি পরিষ্কার ও সুন্দর।
আমাদের বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হলো লেনিনগ্রাদে। মস্কো থেকে রাতের ট্রেন, ঘুমিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। দোভাষী যুবকটি আর ওই ট্রেনের টিকিট পেলো না। সে বললো, পরের ট্রেনে আসছি–আপনারা রেলগাড়ি থেমে নেমে প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে থাকবেন, আমি খুঁজে নেবো আপনাদের, পনেরো মিনিটের বেশি লাগবে না। সত্যি তাই হলো। মস্কো ও লেনিনগ্রাদের মধ্যে এত সহজে যাতায়াত করা যায়, এত ঘনঘন ট্রেন যায় দিনরাত্রি এবং তা খুবই সময়মতো পৌঁছোয়–তাতে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। আমার প্রশংসার কথা শুনে স্মিতহাসি হেসে আবদুল্লাহ আল-মুতী বলেছিলেন, তবে মস্কো থেকে লেনিনগ্রাদে চিঠি পৌঁছতে পাঁচ দিন লাগে। আমি আবারো বিস্মিত হই।
লেনিনগ্রাদে প্রথম দেখলাম আর্মিতাজ। এককালে সেটা ছিল রাজপ্রাসাদ, এখন চিত্রশালা। জার আমলের সংগ্রহ বেশি, পরে কিছু যোগ করা হয়েছে–তাতে সোভিয়েত শিল্পীদের কাজের প্রাধান্য। ইমপ্রেশনিস্টদের এত ছবি সেখানে সযত্নে রক্ষিত, আমার তা জানা ছিল না। সংগ্রহ দেখে শেষ করা যায় না, হাতে সময় কম, তাই সবটা দেখার আশা ছাড়তে হলো।
রাতে গেলাম নাটক দেখতে। ব্যঙ্গরসাত্মক কমেডি। দর্শকেরা বেশ উপভোগ করছে, বোঝা গেল। আমার কাছে তেমন ভালো লাগেনি। মনে হলো, কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে র্যাবলের কালে ফিরে গেছি। সেকালের রচনার পুনরভিনয় হলে ক্ষতি ছিল না, কিন্তু এটি প্রায় সমকালীন রচনা, তার মধ্যে নতুন কোনো উদ্ভাবন নেই।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নিহতদের সমাধিস্থল অতি যত্ন করে, সুন্দর করে রাখা। একদিকে লাল ফৌজের সদস্যদের কবর, অন্যদিকে বেসামরিক লোকজনের। যুদ্ধের অপূরণীয় ক্ষতির একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুসজ্জিত সেনাদল নিহতদের শ্রদ্ধা জানিয়ে যাচ্ছে সামরিক কায়দায়, বেসামরিক পোশাকেও আসছে অনেকে। একটি শিশু বা কিশোরের সমাধির ওপরে দুটো চকোলেট-বার আর একটি লাল গোলাপ রেখে এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে–দু-চোখ বয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কত বছর হলো যুদ্ধ শেষ হয়েছে, তার ক্ষত এখনো বহন করে চলেছেন তিনি। তা দেখে আমার অন্তর থেকে উচ্চকিত হলো একটি প্রার্থনা : আমার সন্তানের মাথায় যেন এমনি করে বোমা না পড়ে কখনো।
দেশে ফেরার সময়ে মস্কো থেকে তিবলিসির পথে এরোফ্লোতের বিমান পড়ল মহা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়। ক্রমাগত ডাইনে-বায়ে ওপর-নিচে করতে লাগলো, উলটে যায়-যায় অবস্থা। আমরা সবাই ভয় পেয়ে গেলাম। এমনকী, কেবিন-ত্রুদের মুখেও আশ্বাসের কোনো লেশ ছিল না। শুধু সারোয়ার আলী বললো, ভয় পাবেন না। এই ফ্লাইটে এদের জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা যাচ্ছে। পাইলট জানে, তাদের কিছু হলে ওকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠাবে কর্তৃপক্ষ। যেমন করেই হোক ও যাত্রীদের প্রাণ বাঁচাবে।’
মৃত্যুভয়ের মধ্যেও যে হাসা সম্ভবপর, তা সেদিনই প্রথম জানলাম।
২৫.
১৯৭২ সালেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামসুল হক এবং রসায়ন বিভাগের অধ্যক্ষ সৈয়দ জহির হায়দার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেলেন। তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হলেন যথাক্রমে ড. এখলাসউদ্দীন আহমদ ও ড. শামসুদ্দীন আহমদ। অর্থনীতি বিভাগের অধ্যক্ষ এস এম আতহার অন্যত্র চাকরি নিয়ে চলে গেলেন, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সদ্য প্রত্যাগত ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিছুকাল পরে উপাচার্য ইন্নাছ আলীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে নিজের পদে ফিরে গেলেন। চট্টগ্রামে তাঁর ভালো লাগছিল না, এখানকার দু-একটি ঘটনায় তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন–যদিও তাঁর সঙ্গে কেউ অসদাচরণ করেনি। উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্যে তাঁকে রীতিমতো চেষ্টা করতে হয়েছিল। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন অধ্যাপক আবুল ফজল।
