প্যাট্রিস লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে পুলিশ আমাদের ট্যাকসি থামালো। ড্রাইভার চললো পুলিশের পিছু পিছু–কোথায়, কে জানে! দোভাষী বললো, পুলিশ এক রুবল নেবে ওর কাছ থেকে। এবারে আমার চমকাবার পালা। বললাম, বলো কী? তোমাদের দেশেও পুলিশ ঘুস খায়? আমার কথায় দোভাষী যে কতটা কৌতুকবোধ করেছে, তা তার হাসি থেকে বোঝা গেল। আমি কিন্তু বিষণ্ণ না হয়ে পারলাম না। সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে আমার ধারণা চিড় খেলো।
সম্মেলন আরম্ভ হতে হতে শুনলাম, সাখারভ একটি আবেদন প্রচার করেছেন, তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নে মানবাধিকার-প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে। সাখারভ কৃতী বিজ্ঞানী, পরমাণুর শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্যে অনেক দিন ধরে অভিযান চালাচ্ছেন, কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণের জন্যে দেশের ভেতরে থেকেই আন্দোলন করছেন। তখনই শোনা যাচ্ছিল, তিনি নোবেল পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন–তবে তা বোধহয় পদার্থবিজ্ঞানে নয়, শান্তির ক্ষেত্রে। তাঁর এই আবেদনজ্ঞাপনের আশু লক্ষ ছিল যে আমাদের বিশ্ব শান্তি তরঙ্গ, তাতে সন্দেহ নেই। এর ফলে আয়োজকদের মধ্যে, বিশেষ করে সোভিয়েত কর্মকর্তাদের মধ্যে, কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলা বিশারদ গ্লাতুক দানিলচুককে জিজ্ঞেস করে কিছু জানতে পারলাম না–সাখারভ কিংবা সরকারি ভাবাদর্শের অন্য কোনো সমালোচকের প্রতি তার সহানুভূতি নেই। অন্যের কাছে শুনলাম, সাখারভ স্বগৃহেই আছেন, খানিকটা নজরবন্দির মতো, সেখান থেকেই বিবৃতিটা দিয়েছেন–মূলত বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে।
২৪.
বিশ্ব শান্তি তরঙ্গ-উপলক্ষে মস্কোতে আয়োজিত সম্মেলনে অনেকগুলো কমিশন গঠিত হয়েছিল এবং একাধিক কমিশন একসঙ্গে বসেছিল। আমি যে-কমিশনে ছিলাম, সেখানে সাখারভের উল্লেখ না করে তাঁর মূল বক্তব্যের প্রসঙ্গটা উঠেছিল পরোক্ষে। আমি বোধহয় বলেছিলাম, রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে আমরা অস্ত্র নিয়ে ও না নিয়ে সংগ্রাম করেছি। তবে আমরাও জানি, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কতটা জরুরি। আবার শুধু জীবনধারণের উপকরণগুলো পেলেও মানুষের চলে না, তার রাজনৈতিক অধিকারগুলোও পূরণ হওয়া চাই। এসবের মধ্যে একটা সমন্বয় ঘটা দরকার। আমার বক্তব্যে আমাদেরই কেউ কেউ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন–কেন আমি জোরালোভাবে সমাজতন্ত্র-বিরোধীদের আক্রমণ করলাম না। তবে, সৌজন্যের খাতিরে কি না জানি না, অন্তত দুই সোভিয়েত কর্মকর্তা আমার কাছে প্রশংসাসূচক কিছু বলেছিলেন আমাকে বিস্মিত করেই।
আমার সঙ্গে এই কমিশনে যাঁরা বসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মহাশূন্যে প্রথম মহিলা ভালেনতিনা তেরেশকোভা। আমি কখনো কারো স্বাক্ষর যাচনা করিনি, এবারে করলাম আমার ছেলেমেয়েদের জন্যে তাঁর স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে ইচ্ছে হলো। ভদ্রমহিলা ইংরেজি জানেন না, কিন্তু আমি কী চাই, তা সহজেই বুঝলেন এবং নির্দ্বিধায় দান করলেন।
এসব সম্মেলনে যেমন হয়, এক সময়ে উৎসাহে ভাটা পড়ে, ক্লান্তিবোধ হয়, এবং একাকী বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে হয়। ঠিক তখনই সারোয়ার আলী জানালো, যে-অধিবেশনটা আমি ফাঁকি দেবো ভেবেছিলাম, তাতে ব্রেজনেভের বক্তৃতা দেওয়ার সম্ভাবনা। সত্যিই সে-অধিবেশনে ব্রেজনেভ এলেন এবং বক্তৃতা দিলেন। তার বক্তৃতায় মনোমুগ্ধকর কিছু ছিল না, বরঞ্চ সেই তুলনায় বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্রের বক্তৃতা ছিল অনেক চিত্তাকর্ষক, তবু পৃথিবীর দুই মহাশক্তিধরের একজনের ভাষণ সামনাসামনি শোনার একটা রোমাঞ্চ ছিল বই কী!
সম্মেলনে ভারত ও পাকিস্তান থেকে কিছু পরিচিত মুখ এসেছিলেন–তাহেরা মাজহার ছাড়া এখন মনে করতে পারছি শুধু সুচিত্রা মিত্রের কথা। চিত্ত বিশ্বাসের সঙ্গে সেখানেই প্রথম আলাপ হয়েছিল।
মস্কোতে তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত খান শামসুর রহমান। তার সঙ্গে আলাপ হলেও গল্পসল্প হয়নি। আমাদের ইকনমিক মিনিস্টার গোলাম কিবরিয়া একদিন হোটেলে এলেন–আমার ঘরে এ জি স্টকের মেমোয়ার্স অফ ঢাকা ইউনিভার্সিটি বইটা দেখে তিনি আগ্রহান্বিত হওয়ায় সেটা তাঁকে উপহার দিলাম। মস্কোতে আমাদের এডুকেশন কাউনসেলর আবদুলাহ আল-মুতী এবং প্রেস কাউনসেলর হাসান হাফিজুর রহমান। দুজনে একই বাড়ির দুই ফ্ল্যাটে থাকেন। আলাদা করে দুজনের বাড়িই যেতে হলো। আমার আগ্রহাতিশয্যে সম্মেলনের উদ্যযাক্তাদের একজন আমার জন্যে বলশয় থিয়েটারের অতি দুষ্প্রাপ্য টিকিট। জোগাড় করেছিলেন। যে-সন্ধ্যায় বলশয়ে যাওয়ার কথা, সেই সন্ধ্যায় হাসান। তার ঘরে আমন্ত্রণ জানালেন। আমি যখন বললাম, বলশয় থিয়েটারে যাবো, হাসান জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে আমার চেয়ে বলশয় বড়ো হলো? এ প্রশ্নের পরে আর বলশয়ে যাওয়া যায় না।
হাসানের সঙ্গে বেরিয়ে মস্কোর এক শুল্কমুক্ত বিপণিতে গিয়েছিলাম। সেখানে তা ডলার শপ নামে পরিচিত–বিদেশিরাই সেখান থেকে জিনিসপত্র কিনতে পারে মার্কিন ডলার বা পাউন্ড স্টার্লিং দিয়ে। আমি একটা টাই কিনেছিলাম। দোকানের বাইরে দু-একজন কাঁচের দরজা দিয়ে ঔৎসুক্যভরে জিনিসপত্র দেখছে। হাসান বললেন, ‘ওরা লুব্ধদৃষ্টিতে জিনিস দেখছে, আর আমাদের দেখছে ঘৃণার চোখে। জানতে চাই, ঘৃণার দৃষ্টিতে কেন? জবাব পাই, ওদের দেশে যে-দোকানে ওদের প্রবেশের অধিকার নেই, শুধু ডলারের জোরে সেখানে ঢুকে আমরা কেনাকাটা করছি–ওরা ঘৃণা করবে না কেন?
