বিদায় নেওয়ার আগে আমাদের অভিভাবক, দোভাষী ও গাড়িচালককে আমরা সামান্য উপহার দিয়েছিলাম। অন্যেরা খুশি হয়ে তা নিয়েছিলেন, দোভাষী অস্বস্তির সঙ্গে। মনে হয়, কেবল অসৌজন্য হওয়ার ভয়ে সে তা নিতে অস্বীকার করতে পারেনি।
২৩.
বুদাপেস্ট থেকে মস্কোতে নির্বিঘ্নে ফেরা গেল। এবারে স্থান হলো হোটেল রসিয়ায়। হোটেলটি যেমন বিশাল, তেমনি মানসম্পন্ন। বিশ্ব শান্তি তরঙ্গের জন্যে ততদিনে নানা দেশ থেকে প্রতিনিধি এসে এখানে জড়ো হয়েছেন। আমাদের দেশ থেকে অনেকে গেছেন : আলী আকসাদ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, নীলিমা ইব্রাহিম, শেখ ফজলুল হক মনি, শামসুজ্জোহা, ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। আমরা হোটেলের যে-তলায় থাকি, তার দায়িত্বে যে-মহিলা, তিনি করিডোরের এক প্রান্তে চেয়ার ও ডেস্ক নিয়ে বসেন। আলী আকসাদ এক সকালবেলায় তাঁর কাছে গিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বলেন, মাসিমা, জুতোর বুরুশ হবে?’ হাত দিয়ে ব্রাশ করার ভঙ্গি দেখে মহিলা সম্মতিসূচক ধ্বনি করে আকসাদকে একটা শু-ব্রাশ দেন। আকসাদ এবারে একটা হাতে গোলাকার ভঙ্গি করে বাংলায় জিজ্ঞেস করেন, ‘কালি হবে না?’ মহিলা মাথা নেড়ে কালি বের করে দেন। আকসাদ বলেন, ইংরেজি আমার ভাষা নয়, এ-মহিলাও তা ঠিকমতো বোঝে কি না সন্দেহ। কষ্ট করে ইংরেজি বলতে যাব কেন? ইশারা বুঝতে পারলে আমার বাংলা আর ওর রুশিতেই কাজ চলবে।’ খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস একদিন খুশি হয়ে এসে খবর দেন : রুশরা তাঁর মুজিববাদ বইটির ৫০ কপি কিনতে যাচ্ছে। আমি বলি, ইলিয়াস ভাই, আপনি যদি মার্কসবাদ সম্পর্কে লিখতেন, এরা হয়তো এক কপিও কিনতো না। এক রাতে পানাহার সেরে ফেরার পথে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী লিস্ট থেকে বেরোতে গিয়ে পড়ে যান মেঝেতে, নীলিমা ইব্রাহিম তাঁর বিরক্তি চেপে রাখতে পারেন না–হ্যাঁলিম চৌধুরীর সঙ্গে তার ভাগ পান শামসুজ্জোহাও, কিছু না বলে তিনি কেবল চেয়ে থাকেন তিরস্কারকারীর দিকে। শেখ মণি আমার ছাত্র–তাই সরাসরি মশকরা করতে পারে না, অন্যকে ইশারা করে আমাকে একটু বেশি পানীয় ঢেলে দিতে, তবে রঙ্গ দেখার বাসনা তার পূরণ হয় না। আমরা টের পাই, আমাদের সবার মধ্যে শেখ মণিকেই বেশি খাতির করছে সোভিয়েত-কর্তৃপক্ষ। মস্কোর এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে বুঝি, তার ধারণা–এবং নিশ্চয় আরো অনেকের–যে, মণি আসলে কমিউনিস্ট এবং বাংলাদেশে যদি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তার নেতৃত্বেই হবে। ঢাকায় রুশ দূতাবাসের অতি সজ্জন কাউনসেলরকে দেখি মণির সেবায় সদাব্যস্ত। মস্কোর নানাজন আসেন মণির সঙ্গে দেখা করতে-কাউনসেলর দোভাষীর কাজ করেন, হাবেভাবে মনে হয়, দর্শনপ্রার্থীরা সকলেই কমিউনিস্ট পার্টির বিশিষ্ট জন।
যে-সুদর্শন যুবাটি আমাদের কয়েকজনের দোভাষীর কাজ করতো, সে বোধহয় ইয়ং কমিউনিস্ট লিগের সদস্য ছিল। ছেলেটি বুদ্ধিমান, সপ্রতিভ, রসিক এবং সেবায় অকুণ্ঠ। তার যত পরিহাস ছিল, তা গ্রামবাসী, চাষাভুষো আর কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের নিয়ে। ঠিক আদর্শ কমিউনিস্টসুলভ ব্যাপার নয়, তবে খুব উপভোগ্য। ব্রেজনেভ সম্পর্কে সেই গল্পটা তার কাছেই প্রথম শুনিঃ ব্রেজনেভ নিজের বক্তৃতা সম্পর্কে মতামত চেয়েছেন পার্টির হোমরা-চোমরাদের কাছে। সবাই একবাক্যে প্রশংসা করছেন। ব্রেজনেভ বলেন, না, আমি মন-রাখা কথা শুনতে চাই না, সত্যি কথা শুনতে চাই। সকলে মুশকিলে পড়েন, কী বলবেন এখন! শেষে একজন সাহসে ভর দিয়ে বলেন, কমরেড, বক্তৃতা তো আপনার খুব ভালো হয়, তবে কিনা– –তবে কী?–তবে কিনা একটু লম্বা হয়ে যায়। তাহলে বক্তৃতা কতক্ষণের হওয়া উচিত? ব্রেজনেভের প্রতিক্রিয়ায়। লোকটির সাহস বেড়ে যায়, বলেন, বড়োজোর পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ব্রেজনেভ তার বক্তৃতা-লেখককে বলে দিলেন, বক্তৃতা যেন পঁয়তাল্লিশ মিনিটের চেয়ে বেশিক্ষণের না হয়।’তথাস্তু। এরপরের বার বক্তৃতা দেওয়ার পরে তিনি আবার জানতে চাইলেন, কেমন হয়েছে? সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগলো। শুধু সেই সাহসী লোকটি বললো, একটু বেশি লম্বা লম্বা? কতক্ষণ হয়েছে?–পাক্কা দেড় ঘণ্টা!–ডাকো বক্তৃতা-লেখককে। সে ঢোঁক গিলতে গিলতে বললো, হুজুর, আমি তো পঁয়তাল্লিশ মিনিটের বক্তৃতাই লিখে দিয়েছিলাম, কিন্তু আপনি কার্বন-কপিসুদ্ধ পড়ে দিয়েছেন।
এক বিকেলে প্যাট্রিস লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশীয় ছাত্রদের সমাবেশ। রেক্টর স্ট্যানিস সভাপতিত্ব করবেন, ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ থেকে একজন করে বক্তৃতা দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার অপরাধে বাংলাদেশ থেকে বক্তা নির্বাচিত হলাম আমি। পাকিস্তান থেকে নির্ধারিত বক্তা তাহেরা মজহার আলি। তিনি অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি ছাত্রদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাদের ভূমিকা কী ছিল। বলেছিলেন, যারা পাকিস্তানে ছিল, তাদের অনেকের কাছেই বহির্বিশ্বের প্রচারমাধ্যম ছিল দুরধিগম্য, কিন্তু তোমরা যারা দেশের বাইরে ছিলে, তারা তো বাংলাদেশের বিভীষিকার খবর পেতে, তোমরা কি বিবেকের দংশন অনুভব করো নি? তোমরা কি যথেষ্ট প্রতিবাদ করেছিলে? নিজের নিজের পরিবারকে জানিয়েছিলে, কী হচ্ছে সেখানে? দেখো, আমি লাহোরে বিভিন্ন পার্টিতে সুশিক্ষিত সুসজ্জিত মহিলাদের বলতে শুনেছি, পূর্ব বাংলায় মেয়েদের ওপর যা হচ্ছে, তা ঠিকই হচ্ছে–ওতে বাঙালিদের রক্তশোধন হবে। এদেরকে শিক্ষিত বলতে, ভদ্রমহিলা বলতে, মানুষ বলতে আমার বাধে। তোমরা সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছে–আশা করি, খালি ডিগ্রি অর্জন করতে নয়, মানুষ হতে, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা নিতে। তা করতে কতটুকু সমর্থ হলে, সেটা বোঝা যাবে তোমাদের আচরণ থেকে।
