আমরা আপসোর নিমন্ত্রণে গেলেও প্রকৃতপক্ষে সরকারি অতিথি। যিনি আমাদের দেখাশোনার জন্যে নিযুক্ত, তিনি খুবই আন্তরিক। ইংরেজি অত ভালো বলেন না বলে একজন তরুণী দোভাষী রেখেছেন সঙ্গে। সে-মেয়েটি ইংরেজি ভালো জানে, প্রয়োজনের বাইরে একটি কথাও বলে না, হাসতেও চায় না। সে কর্তব্যবোধে চালিত, আত্মসম্মানরক্ষায় সদা-সতর্ক। দুপুরবেলায় আমরা একসঙ্গে খাই–আমাদের অভিভাবক, দোভাষী ও গাড়িচালকসহ। রাতে মেয়েটি কিছুতেই খাবে না আমাদের সঙ্গে, বাড়ি চলে যাবে। তার এহেন সংকল্পের কারণ জানতে আমি পীড়াপীড়ি করায় সে তিক্ততার সঙ্গে বলেছিল, তুমি কি ভাবো, এত ভালো খাবার সামর্থ্য আমার আছে? দিনের বেলায় নিরুপায় হয়ে তোমাদের সঙ্গে খাই, রাতে বরঞ্চ ঘরে গিয়ে যা থাকে, তা খেলেই ভালো লাগে। আমি বলি, মুখবদলের জন্যেও তো এক-আধদিন ভালো খাওয়া চলে। সে বলে, না, যা আমার সতত অপ্রাপনীয়, এক-আধদিনের জন্যে তা পেতে চাই না।
হোটেলে একটা রাজসিক খাওয়া খেয়েছিলাম–অন্য টেবিলে কাউকে তা খেতে দেখে জিনিসটার নাম জেনে নিয়ে পরদিন ফরমাশ করেছিলাম। এই খাবার পরিবেশনকারী অসিচালকের পোশাকে সজ্জিত হয়ে আসে। হাতে খোলা তলোয়ার–তাতে টুকরো টুকরো গোমাংস গাঁথা। টেবিলের কাছে এসে ফরমাশকারীর অনুমতি নিয়ে অল্প ওয়াইন ঢেলে দেয় ওপর থেকে। মাংসখণ্ডগুলো ভিজিয়ে দিয়ে ওয়াইন এসে জমা হয় তরবারির হাতলের কাছে একটা বাঁকানো জায়গায়। তারপর তার সহকারী দেশলাইয়ের একটা বড়ো কাঠি জ্বালিয়ে সেই বাঁকানো জায়গায় ধরে। মুহূর্তে ওই হাতল থেকে তরবারির অন্য প্রান্ত পর্যন্ত একটা অগ্নিশিখা জ্বলে উঠে মুহূর্তেই নিভে যায় খাবার ঘরের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর তলোয়ারটা উলটো করে ধরে পরিবেশনকারী। গোশতের টুকরোগুলো ঢেলে দেয় প্লেটে। খাবারটা খুব ভালো, ততোধিক ভালো তার পরিবেশনের কায়দা।
হাঙ্গেরি মদ-প্রস্তুতকারক দেশ। যেখানে ওয়াইন তৈরি হয়, সেখানে যাওয়া গেল। আঙুরভর্তি বড়ো বড়ো কাঠের গামলায় একেক দল সুসজ্জিত মেয়ে রবারের গাম-বুট পায়ে তালে-তালে আঙুর পিষছে। মনে হয়, তারা কাজ করছে না, নাচছে। এ-দৃশ্য বড়ো মনোহর। শেষ পর্যন্ত এই শ্রমের ফসল যা দাঁড়ায়, তাও সুস্বাদু।
বুদাপেস্টে যেখানেই কথাবার্তা বলতে যাই, সেখানেই টোস্টের+অর্থাৎ যার পারিভাষিক নাম আমরা দিয়েছি স্বাস্থ্যপান, তার ব্যবস্থা। যত অল্প পরিমাণই। হোক, সকাল দশটার সময়ে মদ্যপান পোষায় না। তবু সৌজন্যের খাতিরে পানপাত্র ঠোঁটে ছোঁয়াতে হয়। এরকম এক আলোচনার সময়ে আমাদের নিমন্ত্রণকর্তা বললেন, হাঙ্গেরির এক নম্বর সমস্যা জনসংখ্যার হ্রাস। বিবাহবিচ্ছেদের হারে আমাদের জায়গা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। বিকেলে বিয়ে। হয়েছে, পরদিন সকালে ছাড়াছাড়ি, এমন আকছার ঘটে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি না পেয়ে নিশ্চল থাকলেও হতো, কমে যাওয়াতেই সমস্যা।
আমি বলি, জনসংখ্যার এই সমস্যার সমাধানে আমরা সাহায্য করতে পারি–বলো তো বাংলাদেশ থেকে তোক পাঠিয়ে দিই।
এক অ্যানিম্যাল-ফার্মে গেলাম। খামারে ঢুকে ওভারশু পরতে হলো। হাত ধুতে হলো ওষুধ দিয়ে, তারপর পরতে হলো গ্লাভস। মাথায় টুপি, নাকে মাস্ক বাঁধতে হলো। তবে শুয়োরশাবকদের সঙ্গে দেখা। বললাম, মানুষের বাচ্চা দেখতেও আমরা এত কষ্ট করি না।
আমাদের অভিভাবক জানতে চেয়েছিলেন, আমরা বিশেষ কিছু দেখতে চাই কি না। আমি বললাম, লেক বালাতন দেখতে চাই–তার তীরে এক স্বাস্থ্যনিবাসে আমাদের কবি একটি কাব্যের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন। শুনে তিনি অবাক হন। খোঁজখবর নিয়ে বলেন, ওখানে এক ভারতীয় কবির স্মারক আছে–বাংলাদেশের কবির কথা তো কেউ জানে না। বলি, তিনি রবীন্দ্রনাথ, ভারতের কবি, আমাদেরও কবি, এই দুই দেশের জাতীয় সংগীতই তাঁর রচনা। শুনে তিনি আরো অবাক হন।
বালাতন হ্রদের তীরে যাই। রবীন্দ্রনাথ যে-বাড়িতে বসে লেখন কাব্যের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন–তার হাতের লেখা দিয়েই বইটি বেরিয়েছিল–সে বাড়ি দেখি। বাড়ির সামনে তিনি একটি গাছ লাগিয়েছিলেন–সেটি তখন বেশ বড়ো। সেখানে তাঁর একটি স্মারক আছে।
কবির কথায় আমাদের অভিভাবক বলেন হাঙ্গেরির জাতীয় কবি সান্দর পেতোফির (হাঙ্গেরীয়রা বলে পেতোফি সান্দর) কথা। তিনি শুধু কবি নন, ওদের জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্গাতা। ১৮৪৮ সালে হাঙ্গেরির বিপ্লবে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সান্দর তাঁদের একজন। কবি হিসেবে তিনি খুব উঁচুদরের–বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্ভারের মধ্যে গণ্য হয় তাঁর কাব্য। অথচ তাঁর কবিতা ও গান ওদেশে খুবই জনপ্রিয়। আশ্চর্য নয় যে, সান্দর বলতে পেরেছিলেন, জনপ্রিয় কবিতাই হলো আসল কবিতা। হাঙ্গেরির কাগুঁজে মুদ্রায় তার প্রতিকৃতি আছে। আমাদের অভিভাবক তাঁর মূর্তির কাছে নিয়ে যান আমাদের, তাঁর সুমুদ্রিত কাব্যগ্রন্থ উপহার দেন, প্লাস্টার অফ প্যারিসে তৈরি তাঁর মুখাবয়ব দান করেন।
বালাতন হ্রদ থেকে ফেরার পথে আমি লেখন থেকে দু-চরণের একটি কবিতা উদ্ধৃত করেছিলাম :
বিদেশে অচেনা ফুল পথিক কবিরে ডেকে কহে–
‘যে-দেশ আমার, কবি, সেই দেশ তোমারো কি নহে?’
এর একটা অক্ষম অনুবাদ করেছিলাম ইংরেজিতে। তা শুনেই ওঁরা বলেন, ভারি চমৎকার, এই উপলক্ষে খুবই মানানসই।
