বিষয়টা নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই আমাদের ডাক এসে গেল। হেথ ইমিগ্রেশন পেরিয়ে আমরা পথপ্রদর্শকের সাহায্যে হোটেলে এসে উঠলাম। সেখানেই চারটি খেয়ে ঘুম–কোথাও আর বের হইনি। মস্কোতে প্রচণ্ড ঠান্ডা।
পরদিন সাতসকালে দরজায় আঘাত। এক তরুণী কঠোর মূর্তি ধারণ করে আদেশ দিচ্ছে–এয়ারপোর্ট, এয়ারপোর্ট। বললাম, আমাদের প্লেন তো দুপুরবেলায়, এখন কেন বিমানবন্দরে যেতে হবে? তরুণী বিরক্তমুখে ‘নো ইংলিশ–এয়ারপোর্ট’ বলে আর কাউকে সাহায্য করতে অন্তর্হিত হয়ে গেল।
আমাদের সকলের টিকিটেই বুদাপেস্টের ফ্লাইটের সময় দেওয়া আছে দুপুরের। হয় এরোফ্লোতের ঢাকা অফিস ভুল সময় দিয়েছে, নয় আমাদের অভিভাবিকারা নিস্তার পেতে চাইছে আমাদের থেকে। যতদ্রুতসম্ভব তৈরি হয়ে লাউজে এসে বসলাম এবং তখনই আবিষ্কার করলাম যে, আমার হেল্থ সার্টিফিকেটটা পাওয়া যাচ্ছে না। রিসেপশন থেকে চাবি নিয়ে আরেকবার ঘরে খুঁজলাম, কোনো লাভ হলো না। নিচে নামতেই দেখি, এয়ারপোর্টের বাস রওনা দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি তাতে উঠে পড়লাম। খানিক যাওয়ার পরে বোধোদয় হলো যে, ঘরে হেল্থ সার্টিফিকেট খুঁজতে গিয়ে এবারে ওভারকোটটাও ফেলে এসেছি–হয় ঘরে, নয়তো লাউজে। বাসের নিয়ন্ত্রককে বলে কিছু বোঝাতে পারলাম না।
মস্কো থেকে বুদাপেস্টে এলাম হাঙ্গেরির মালিভ এয়ারলাইনসে। আমাদের অঞ্চলে চলাচলকারী এরোফ্লোতের চেয়ে তা অনেকগুণে উন্নত। খাওয়া দাওয়া ও যাত্রীসেবাও ভালো। তবে হেল্থ কার্ড হারিয়ে আমার কিছুই ভালো লাগছিল না।
বুদাপেস্ট বিমানবন্দরে আমি একটাই যুক্তি দেখাই, গতকাল হেলথ সার্টিফিকেট দেখিয়েই তো মস্কোতে ঢুকেছিলাম–তোমরা মস্কো বিমানবন্দরে খোঁজ করলেই তার প্রমাণ পাবে। কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। যারা আমাদের নিতে এসেছিলেন, তারাও বললেন, ও-কথায় কাজ হবে না। আর অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, মস্কোর শীতে তুমি কোট ছাড়া বাইরে পা দিলে কী করে!
কয়েক মিনিটের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স এসে গেল এবং আমি তাতে বসে কোয়ারান্টাইনে চললাম।
২২.
কোয়ারান্টাইনে যেখানে আমাকে রাখা হলো, সেটি একটা লম্বামতো দালান। সেখানে একপ্রান্তের একটা ঘরে আমাকে ঢুকিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে দেওয়া। হলো। ঘরের একপাশে কাঁচের জানলার মতো–খোলা যায় না, কিন্তু তা দিয়ে হাসপাতালের অপর প্রান্তের ঘরগুলো দেখা যায়। দরজার উলটো দিকের দেওয়ালে একটা ছোটো কাঠ লাগানো-বাইরে থেকে সেটা খুলে খাবারের ট্রে। তার মধ্য দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ছেলেবেলায় পশু-হাসপাতাল দেখেছিলাম–সেখানে কুকুরদের এমনি করে খাবার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।
খানিক পরে ডাক্তার এলেন–ভিয়েতনামি, পরিষ্কার ইংরেজি বলেন। বললেন, তোমার বিষয়টা জেনেছি। কী করব বলো, তোমাকে আবার ইনজেকশন নিতে হবে, তাতে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। দুদিন পরে তুমি ছাড়া পাবে। কিছু মনে কোরো না, একটা কথা জানতে চাই–হোটেলের বাইরে পা দিয়ে মস্কোর ঠাণ্ডায় তুমি কোটের অভাব অনুভব করোনি?
সন্ধে নাগাদ আমি অস্থির হয়ে উঠি। না আছে কিছু পড়ার, না আছে কিছু দেখার, না আছে কিছু শোনার, না আছে কথা বলার সুযোগ। সারোয়ার আলীকে চিরকুট পাঠাই, আমার আর কিছুই দেখার সাধ নেই–আমাকে ঢাকায় ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করো। সে আমার এমন অস্থিরতা বা ব্যাকুলতা আশা করেনি।
পরের দিন সকালে কাঁচের জানলায় টোকা। পাশের ঘরের বন্দি ইশারা দিচ্ছে, দাড়ি কামাবে, আমার কাছে আয়না আছে কি না?
আমি আয়না ধরলাম এ পাশে, ওপাশে সে দাড়ি কামাতে লাগলো। বললো, সে পেশায় অ্যাডভোকেট, রোমে থাকে। ইতালির দক্ষিণে কী মহামারী হচ্ছে, আর সেজন্যে তার মতো রোমবাসীকে ধরে এরা কোয়ারান্টাইনে পাঠিয়েছে। এদের ভূগোলজ্ঞান নেই, তারও বুদাপেস্টে পেশাগত দায়িত্বপালনের আর ইচ্ছে নেই। সে এখন রোমে ফিরে যেতে চায়। এই বলে সে জানতে চাইলো, আমি ইতালি গেছি কি না।
আমি যাইনি শুনে সে বললো, তাহলে আমার অতিথি হয়ে রোমে চলো। ইতালি ধ্বংস হওয়ার আগে দেশটা একবার দেখা উচিত।
জানতে চাইলাম, ইতালি ধ্বংস হবে কেন?
বললো, আমরা সবাই মিলে দেশটা ধ্বংস করতে খুব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
খানিক পরে ডাক্তার এলেন। বললেন, মস্কোর হোটেলের লাউজে তোমার কোট পাওয়া গেছে। আর তার পকেটে পাওয়া গেছে তোমার হেল্থ সার্টিফিকেট। সন্ধে নাগাদ ওগুলো বুদাপেস্টে পৌঁছে যাবে। এখন তুমি দুটো হেল্থ সার্টিফিকেটের মালিক–কাল সকালে আমাদেরটাও তৈরি হয়ে যাবে।
বুঝলাম, মস্কো বিমানবন্দরে জ্যাকেটের পকেট থেকে হেলথ কার্ড বের করে দেখিয়ে ভুলে সেটা ভরে ফেলেছিলাম ওভারকোটের পকেটে। সেখানে কিছু রাখি না বলে আর খোঁজ করিনি। নিজেকে ধিক্কার দিলাম।
এবারে বুদাপেস্টের আরামদায়ক হোটেলে।
বুদাপেস্ট শহরটি অতি মনোরম। দানিউব নদীর একধারে বুদা, অন্যতীরে পেস্ট। নদীর ওপরে বড়ো একটা সেতু দুটি অংশকে যুক্ত করে বুদাপেস্ট বানিয়েছে। একটা দিক পাহাড়ি, বিভিন্ন উচ্চতায় ঘরবাড়ির অবস্থান, আলোকিত হলে তা দেখতে খুব ভালো লাগে। অন্যদিকটা সমতল, তবু সেখানেও রয়েছে। অনেক দর্শনীয় বস্তু। এদের ইতিহাস পুরোনো–তারই ছাপ রয়েছে মধ্যযুগীয় দুর্গ ও গির্জা থেকে আধুনিককালের পার্লামেন্ট ভবনের নির্মাণে।
