অনিরুদ্ধের পরামর্শমতো নিজে নিজেই খানিক ঘুরে বেড়াই–লুভ দেখতে একাই গিয়েছিলাম। এসব জায়গায় দলেবলে গিয়ে লাভ নেই। সেখানে ভেনাস দ্য মিলো এবং মোনালিসাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা বহুদিন মনে সঞ্চিত ছিল। টুরিস্টের মতোই দেখতে যাই ইফেল টাওয়ার, আর্ক দ্য ব্রায়াম্ফ, নেপোলিয়নের সমাধি। পিগেল এলাকাও ঘুরে আসি এক চক্কর। প্যারিস–বিশেষত রাতের আলোকিত প্যারিস-বড়ো সুন্দর লাগে। এক সকালে সদলে বেরিয়েছি–খবরের কাগজের হেডলাইন, আফগানিস্তানে বাদশাহ জহির শাহ ক্ষমতাচ্যুত। বরুণ বললেন, আশা করি, কাজটা আমাদের (অর্থাৎ ভারত সরকারের) নয়। তার খানিক পরই ফুটপাথে বসে কফিপানরত এক ভদ্রলোককে দেখে বরুণ তাঁকে সম্ভাষণ করলেন, প্রায় একই সঙ্গে তিনিও দরাজগলায় বরুণ এবং তাঁর সঙ্গীদের স্বাগত জানালেন। আমরা কফি খেতে বসে গেলাম। বরুণ পরিচয় করিয়ে দিলেন, ভদ্রলোকের নাম আনোয়ার আবদেল-মালেক, জাতে মিশরীয়, তখন তার বয়স পঞ্চাশ হবে। মিশরের জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। জামাল আবদেল নাসের যখন বামপন্থীদের দমন করতে শুরু করেন, তখন তিনি পালিয়ে চলে আসেন প্যারিসে। সেখানে সি এন আর এস নামে পরিচিত প্যারিসের একটি বড় প্রতিষ্ঠানে তিনি গবেষণা-অধ্যাপক। পরে আনোয়ারের প্যারিসের অ্যার্টমেন্টে নাসেরের বাধানো ছবি দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি না নাসেরের দ্বারা নির্যাতিত? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, আমার প্রতি তিনি অন্যায় করেছেন, কিন্তু মিশরের জন্যে যা করেছেন, তার জন্যে তাঁর প্রতি সকল মিশরীয়ের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আনোয়ার আবদেল-মালেকের সঙ্গে প্যারিসের ফুটপাথের কাফেতে সেদিন আমার বেশ ভাব হয়ে গেল এবং গত তিরিশ বছরে আমাদের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
আমরা দল বেঁধে চলি, প্রয়োজন হলে একটু আলাদা হই। যেমন, নবনীতা সাহায্য করেছিল একটা মুলিনেকস ফুড প্রসেসর এবং একটা সনি টেপরেকর্ডার কিনতে। টেপরেকর্ডারে তার কণ্ঠস্বরই প্রথমে ধারণ করা হয়েছিল। আবার, রাতে খাওয়ার জায়গা সাধারণত অনিরুদ্ধই বেছে দিত। প্যারিস ছাড়ার আগের রাতে স মিশেল অঞ্চলে এক রেস্তোরাঁয় খেয়েদেয়ে বেরিয়ে কিছুদূর আসার পর টের পেলাম, আমার মানিব্যাগ ফেলে এসেছি সেখানে। কেউ আমার সঙ্গে ফিরে যেতে রাজি হলো না–অনিরুদ্ধও নয়। নিজে নিজে খুঁজতে গিয়ে কেবলই ঘুরলাম অনর্থক, হোটেলে ফিরে আসতেও ঝামেলা হলো। পরদিন ফেরার পথে বিমানবন্দরে এসে জিনিসপত্র কেনা বাবদ যে-কর দিয়েছিলাম, তা ফেরত পেলাম। পথে প্লেনে একটু ঝাঁকুনি খেতে হলো। হিতেশ বললেন, গাড়োয়ান বড় এবড়ো-খেবড়ো পথ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে।
ইলেকট্রনিক জিনিস নিয়ে আসছি বলে ভারতীয় কাস্টমসের ভয়ে ছিলাম। প্লেনে বসে মুনিস রাজা বললেন, কোনো অসুবিধে হবে না। জানতে চাইলাম, কেমন করে বলছেন একথা? তিনি বললেন, দেখো, পরীক্ষার হলে গেলে আমরা যেমন বুঝতে পারি কে নকল করছে, কাস্টমসের লোকও তেমনি বুঝতে পারে কে স্মাগল করছে। তাঁর কথা ঠিক হয়েছিল। দিল্লিতে কাস্টমসের জিম্মায় জিনিসগুলো রাখতেও আমি তৈরি ছিলাম। ওঁরাই রাজি হলেন না। বললেন, যাওয়ার সময়ে এগুলো সংগ্রহ করতে আপনার অসুবিধে হতে পারে। আপনি সঙ্গে নিয়ে যান, তবে এগুলো দেশে নিয়ে যাবেন নিশ্চিতভাবে, এই অনুরোধ।
দিল্লিতে আবার মল্লিক-দম্পতির সহৃদয় আতিথ্যগ্রহণ। তারপর ঘরে ফেরা।
২১.
হঠাৎ করে আমন্ত্রণ পেলাম ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে মস্কোতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বশান্তি-তরঙ্গে (ওয়র্লড পিস ওয়েভ) যোগ দেওয়ার আর তার আগে বাংলাদেশ আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের দলভুক্ত হয়ে হাঙ্গেরি যাওয়ার। আমার পাসপোর্টে ভ্রমণযোগ্য দেশের তালিকায় হাঙ্গেরির নাম ছিল না। সেটা–এবং সেই সঙ্গে আরো কয়েকটি দেশের নাম-যুক্ত করে এরোফ্লোতের বিমানে ঢাকা থেকে রওনা হলাম। সফরসঙ্গী বাংলাদেশ আপসোর সাধারণ সম্পাদক ডা. এ এইচ সাইদুর রহমান, ওই সংগঠনের ডা. সারোয়ার আলী, বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার বাদল রশীদ এম পি এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নিরোদ নাগ (তিনি এভাবেই নিজের নাম লিখতেন)-ছাত্রজীবনে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি। সারোয়ার আলীকে তার বাল্যকাল থেকে জানি, সাইদুর রহমান অনেকদিনের পরিচিত; বাদল রশীদের সঙ্গে নতুন পরিচয়–দেখলাম, অতি সজ্জন মানুষ, দোষের মধ্যে এই যে, তার উচ্চারণে হাঙ্গেরি হাংরি হয়ে যায়।
তাসখন্দে যাত্রাবিরতির পরে মস্কো পৌঁছোলাম। বিমানবন্দরে খুব ভিড়। ইমিগ্রেশনের লোকজনের সঙ্গে একদল যাত্রী ঝগড়া করছে। যাত্রীদের মধ্যে এক-আধজন ইংরেজি জানে। তাদের কাছ থেকে জানলাম, ওরা এসেছে চিলি থেকে। সেখানে প্রেসিডেন্ট আয়েন্দে সদ্য নিহত হয়েছেন সামরিক অভ্যুত্থানে। এরা কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। তাদের পাসপোর্ট আছে, ভিসা নেই। ভিসা ছাড়া ইমিগ্রেশন এদের ঢুকতে দেবে না সোভিয়েত ইউনিয়নে। এরা বলে, চিলিতে কী হচ্ছে, তা জানো না তোমরা? আমরা তো টুরিস্ট নই–রিফিউজি। ডাকো তোমাদের বড়ো কর্তাকে–সে কী বলে, শুনি। আমাদের ঢুকতে না দিলে চিলিতেই ফিরে যাবো মরতে, তার আগে সমাজতান্ত্রিক ভ্রাতৃত্ববোধের শেষটা দেখে যেতে চাই।
