ঢাকা বিমানবন্দরে এসে দেখলাম, অধ্যাপক আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালক ড. এম এ গফুর সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেসে যোগ দিতে যাচ্ছেন। বোম্বাইতে পেলাম ভারতীয় প্রতিনিধিদলের পশ্চিমবঙ্গীয় সদস্যদের ইতিহাসবিদ ড. বরুণ দে, ড. অনিরুদ্ধ রায়, ড. হিতেশরঞ্জন সান্যাল, ড. কল্যাণকুমার দাশগুপ্ত এবং সাহিত্যিক ও তুলনামূলক সাহিত্যবিশারদ ড. নবনীতা দেবসেনকে। বিমানভ্রমণ আনন্দে কাটল। প্যারিসে আমাদের কারো থাকবার জায়গা নির্দিষ্ট নেই। কংগ্রেস-উপলক্ষে সারা দুনিয়া। থেকে লোক এসেছে–থাকার জায়গা সুলভ নয়। নগরটা অনিরুদ্ধের নখদর্পণে–সুতরাং সে-ই ভরসা। দুই ট্যাকসি করে বঙ্গসন্তানেরা জায়গা খুঁজতে বেরোলাম। অনিরুদ্ধ প্রথমে হবিবুল্লাহ্ ও গফুরের ব্যবস্থা করলো, তারপর অদূরে আমাদের দুজনের। হোটেলে ওঠার পর টের পাওয়া গেল, জায়গা পাওয়ার আনন্দে ট্যাকসি থেকে মালপত্র নামানো হলেও ডিউটি ফ্রি থেকে কেনা পানীয় নামানো হয়নি। বরুণ দে খুব আশায় ভর করে এখানে-ওখানে ফোন করলেন, কিন্তু অনিরুদ্ধ বলতে লাগলো, প্যারিসের ট্যাকসি-চালকেরা বেকুব নয় যে, অমন জিনিস সেধে ঘরে পৌঁছে দেবে।
কংগ্রেস যেখানে পরদিন শুরু হবে, সেখানে ড্যানিয়েলের দেখা পাওয়া গেল। তার হাতে হাতখানেক লম্বা একটা তার। ওটা দিয়ে কী করছেন, জানতে চাওয়ায় বললেন, তাঁর ইচ্ছে, কংগ্রেসের সেক্রেটারির গলায় ওই তার পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা। আমি বললাম, কংগ্রেস হয়ে যাওয়ার পর আমরা যে-যার বাড়ি চলে গেলে কাজটা করলে ভালো হয়। ড্যানিয়েল বললেন, যাক, তুমি অন্তত কাজটা ভালো হয় বললে। আমি বললাম, ওটা একটা কথার কথা–ভদ্রলোককে আমি চিনিই না, তার ভালোমন্দের কী জানি! ড্যানিয়েল বললেন, লোকটা আমার সঙ্গে প্রথম থেকে শত্রুতা করছে। যা হোক, তুমি কিন্তু একটা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছ–প্রোগ্রাম দেখে নিও। আমি বললাম, সেকি! বাংলাদেশ থেকে সভাপতি চাইলে প্রফেসর হবিবুল্লাহকে করো–আমি নগণ্য লোক, আমাকে কেন? তিনি বললেন, ওই সেক্রেটারি ব্যাটার সঙ্গে ঝগড়া করে তোমাকে সভাপতি বানিয়েছি; এখন তুমি যদি দোনামনা করো, তাহলে এই তার তোমার গলায় পরাব।
এত বড় সম্মান তখন পর্যন্ত আমার ভাগ্যে জোটেনি। ওই অধিবেশনে অনিরুদ্ধ, হিতেশ আর কল্যাণ প্রবন্ধ পড়েছিলেন, অন্যান্য দেশ থেকে আরো তিনজন কৃতবিদ্য ব্যক্তি প্রবন্ধ পেশ করেছিলেন। প্রবন্ধপাঠের সময় বেঁধে দিয়েছিলাম কিন্তু পাবনা-বিদ্রোহ সম্বন্ধে লেখা পড়তে গিয়ে কল্যাণ সময় ঠিক রাখতে পারছিলেন না। আমি তাকে ইংরেজিতে বলি শেষ করতে, বাংলায় বলি পড়ে যেতে। কল্যাণ পরে বলেছিলেন, আমার সহৃদয়তায় তিনি কৃতার্থ হয়েছিলেন। আমার একেবারে সামনের বেঞ্চে ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব বসে ছিলেন। তিনি, মনে হয়, এই চালাকি ধরে ফেলে মৃদু মৃদু হাসছিলেন। প্রবন্ধপাঠে এত সময় চলে গেল যে, সভাপতির ভাষণ দেওয়ার সুযোগ আর রইল না। দু মিনিট ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে অধিবেশন শেষ করে দিলাম। যাদের খিদে পেয়েছিল, তারা আমার কাণ্ডজ্ঞানের প্রশংসা করলেন।
সম্মেলনের প্রথম দিনে এক সিঁড়ির মুখে দেখা হয়ে গিয়েছিল অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর সঙ্গে। তিনি তখন পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে এসেছেন সম্মেলনে যোগ দিতে। আমাকে দেখেই আমার নাম ধরে ডেকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর সানয়নে জানতে চাইলেন, মুনীরকে নাকি ওরা মেরে ফেলেছে? আমার জবাব শুনে অধোবদনে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের খোঁজখবর নিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছিলেন, সে-বন্ধন বুঝি কাটেনি। বাংলাদেশের তিনি যে অকৃত্রিম বন্ধু, তা তাঁর কথায় ও ভঙ্গিতে স্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছিল।
পরের দিন এসে পৌঁছোলেন নীহাররঞ্জন রায়–সোভিয়েত ইউনিয়নে কী একটা সভা ছিল, তা শেষ করে। বিমানবন্দর থেকে প্রায় সোজা এসেই তিনি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে বসলেন। তাঁর প্রিয় ছাত্রী অমিতা রায়চৌধুরী সেখানে প্রবন্ধ পড়েছিলেন। কী অপূর্ব ভাষণ দিয়েছিলেন নীহাররঞ্জন–সকলেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিলাম।
অধিবেশনে যোগ দিয়ে কূল পাইনে। একসঙ্গে সাত-আটটা অধিবেশন চলছে কয়েকটা বাড়ি মিলিয়ে। অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি এসেছেন, যাদের কথা শোনার ইচ্ছে, তাদের সকলের কথা শোনাও সম্ভব হয়নি। ড. ফিলিওজার বক্তৃতা শুনতে চেয়েছিলাম–তিনি মূলত চিকিৎসক, ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে কৌতূহল থেকে পরে ভারততত্ত্ববিদ হয়েছিলেন। তাঁর বক্তৃতা শোনা হয়নি, সে-দুঃখ তাঁকে জানাতে তিনি এমন সদাশয়তার সঙ্গে কথা বললেন যে, এবারে আমার কৃতার্থ হওয়ার পালা।
পশ্চিমবঙ্গীয়দের সঙ্গেই সময় কাটাই বেশি, তাই কেউ কেউ আমাকেও পশ্চিমবঙ্গীয় ঠাহর করলেন। আমাদের সঙ্গে প্রায়ই যোগ দেন কলকাতার প্রত্নতত্ত্ববিদ অমিতা রায়চৌধুরী, দিল্লির ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার আর ভূগোলবিদ ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভাইস-চান্সেলর মুনিস রাজা। মুনিস রাজার একটা ফুসফুস কেটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাই চড়াইয়ে উঠতে তার কষ্ট হয়, একটুতেই হাঁপিয়ে পড়েন। আমার হাঁটার অভ্যাস কম, আমি ধীরে ধীরে হেঁটে তাঁকে সঙ্গ দিই।
