তপন বোস খবর পেয়ে এলো। সে আদিলুর রহমানকে বললো, তুমি এই প্রতিনিধি (আফতাব আহমাদ) নিয়ে এসেছ, তার কারণে যে-পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা তুমিই সামলাও। আদিলুর রহমান আমাকে এসে বললো, আফতাব সাহেব আর কথা বলবেন না, এখন অবস্থা আপনি সামলে দিন। বিলম্বিত বিরতির পর অধিবেশন শুরু হলে আমি বললাম, নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের। আদিবাসী বলার বিষয়ে আমাদের দেশে মতভেদ আছে। কে কখন দেশের কোন খণ্ডে প্রবেশ করেছে, তা হিসাব করতে গেলে দেখা যাবে, আদম ও হাওয়া ছাড়া আমরা সকলেই কোথাও না কোথাও থেকে এসেছি। এমনকী, আদম-হাওয়াও পৃথিবীতে এসেছেন স্বর্গোদ্যান থেকে। আদিবাসী অর্থে কেবল বসতিস্থাপনের সনতারিখ বোঝায় না, তাদের কতকগুলি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে, জোর দেওয়া হয় তার ওপরে। আমরা যারা পাকিস্তান-আমলে বাঙালির স্বাধিকারের দাবি করেছি, তাদের পক্ষে দেশবাসীর যে-অংশ বাঙালি নয় তাদের নিজস্ব অধিকারের পক্ষাবলম্বন করা অবশ্যকর্তব্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে-রক্তপাত ঘটেছে, তা ঘটা উচিত ছিল না। আশা করি, আমরা এতদিনে বুঝতে পেরেছি। যে, রাজনৈতিক সমস্যার সামরিক সমাধান কোথাও হয়নি, হতেও পারে না। অতএব আমাদের যে-সমস্যা তার সমাধান খুঁজতে হবে সকলের সমান অধিকারের ভিত্তিতে, আলোচনার মাধ্যমে।
৪৭.
আমি যখন এসব কথা বলেছিলাম, তার কয়েকমাসের মধ্যে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে। রাঙামাটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শান্তি বাহিনীর সদস্যেরা অস্ত্র সমর্পণ করে। সমতলবাসী ও পাহাড়িদের অনেকে এ চুক্তি সমর্থন করেনি। এক পক্ষ ভেবেছে, পাহাড়িদের অনেক বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে; অন্যপক্ষ ভেবেছে, পাহাড়িরা ঠকে গেছে। অস্ত্রসমর্পণ-অনুষ্ঠানে বিক্ষোভ হতে পারে ভেবে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট সজাগ ছিল। কিন্তু কালো ওড়না পরে পাহাড়ি মেয়েদের আসা বন্ধ করা যায়নি। তাদের। অনেকে সেই ওড়নাকে কালো পতাকার মতো ব্যবহার করেছিল। বিএনপি ও জামায়াত শান্তিচুক্তির প্রবল বিরোধিতা করে। চুক্তিকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে তারা ক্ষান্ত ছিলেন না, জুন মাসে এই চুক্তির বিরুদ্ধে ঢাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত তারা লং মার্চ করেন। বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই চুক্তির ফলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের সীমানাভুক্ত হয়ে যাবে। তবে তাঁরা যখন লং মার্চ করেছিলেন, তখন ফেনীর ওপর দিয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে তাদের পাসপোর্ট-ভিসা লাগেনি। লং মার্চে অংশগ্রহণকারীদের স্ব-উদ্যোগে। পানি খাইয়েছিলেন চট্টগ্রামের মেয়র। বেশ কিছুসংখ্যক বিশিষ্ট নাগরিক রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছিলেন এই চুক্তির কার্যকরতা বন্ধ করতে তাঁর ভূমিকাঁপালনের দাবিতে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁদের বলেছিলেন, জাতীয় স্বার্থে এমন একটি চুক্তির প্রয়োজন ছিল। এই চুক্তি সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি একটি আলোচনা-সভার আয়োজন করেন। তাতে যোগ দিতে ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা, আমিও গিয়েছিলাম। মনিরুজ্জামান মিঞা চুক্তিটি সংবিধানসম্মত নয় বলে মতপ্রকাশ করেন। তারপর তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, তার জন্যে সংবিধান সংশোধিত হবে, কিন্তু চুক্তিটি অপরিবর্তিত থাকবে। তার উত্তরে আমি বলেছিলাম, সংবিধান সংশোধন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারি দলের নেই। তবে কি সংবিধান সংশোধন করতে বিএনপি-দলীয় সদস্যেরা সরকারকে সাহায্য করবেন বলে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞার কাছে খবর আছে?
সরকার উদযোগী হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক শিক্ষককে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখতে নিয়ে যান দুভাগে। একভাগে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক পারভীন হাসান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শওকত আরা হোসেন, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ ও আমি ছিলাম। আমাদের ভ্রমণে তত্ত্বাবধান করেন ঢাকায় কর্নেল ফজলে এলাহী (মেজর জেনারেল পদ থেকে অবসরপ্রাপ্ত, পরে বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত)। চট্টগ্রামের জিওসি তখন মেজর জেনারেল আবদুল মতিন (পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা)। আমরা বিমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাই। চট্টগ্রামে জিওসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে আমরা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি যাই এবং রামগড়, থানচি, সাজিক প্রভৃতি জায়গায় অল্পসময়ে অবস্থান করি। তিন জেলা শহরেই আমরা স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে আলোচনা করতে বসি।
আমরা লক্ষ করি, ১৯৭০ সাল পর্যন্ত যেসব বাঙালি পার্বত্য অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে, তাদের সঙ্গে পাহাড়িদের কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু বাংলাদেশ আমলে–পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক অভিযানের কালে–যেসব সমতলবাসীকে সেখানে সরকারি উদ্যোগে বসানো হয়েছে, তাদের সঙ্গে পাহাড়িদের দ্বন্দ্ব প্রবল। খাগড়াছড়িতে আলোচনা-সভায় উপস্থিত ছিলেন হংসধ্বজ চাকমা। শান্তি-আলোচনায় তিনি একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার দৌত্যেই পাহাড়ি নেতারা অজ্ঞাতস্থান থেকে আলোচনাস্থলে আসা-যাওয়া করেছিলেন। হালে বসতিস্থাপনকারী একজন বেশ চীৎকার করে বাঙালিদের ওপর পাহাড়িদের অত্যাচারের বিবরণ দিচ্ছিলেন। হংসধ্বজ তাঁকে থামাবার চেষ্টা করতে গিয়ে বললেন, ‘থামেন, থামেন। আপনি যে আমার ঘরে আগুন দিয়েছিলেন, সেকথা কি আমি কাউকে বলেছি?’ অভিযোগকারী একথা শুনে সত্যিই থেমে গেলেন।
