খাগড়াছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমাকে পৃথকভাবে বললেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-পদ যদি পাহাড়িদের জন্যে উন্মুক্ত থাকে, তাহলে বাঙালিরা তা মেনে নেবে না। আমি বললাম, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যদি ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হয়, তাহলে কি চেয়ারম্যান-পদ কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্যে সংরক্ষিত রাখা সম্ভবপর?
ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনকারী পাহাড়িদের প্রধান অভিযোগ ছিল এই যে, তারা নিজেদের বাড়িঘরে ফিরতে পারেনি–সেসবই দখল হয়ে গেছে এবং তাদের জমি বা পাহাড়ও তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। প্রশাসন তাদের ভূমিস্বত্বের কাগজ দেখতে চায়, কিন্তু তাদের কাছে তো কোনোকালে কোনো কাগজ ছিল না। কারবারিরা (মোড়ল) জানে, কোন জমি কার, কোন পাহাড়ে চাষ করার অধিকার কার। কিন্তু প্রশাসন বলে, কারবারির মুখের কথায় হবে না, দলিল চাই। দলিল কোথায় পাবে তারা?
বান্দরবনে মারমা সম্প্রদায়ের এক প্রতিনিধি নিম্নকণ্ঠে বললেন, স্বায়ত্তশাসন পেলে চাকমাদের লাভ হবে–তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসর, রাজনৈতিকভাবে সচেতন। কিন্তু পাহাড়িদের অন্য সম্প্রদায়ের তেমন লাভ হবে না। এখন তারা বাঙালিদের অধীন, তখন তারা চাকমাদের অধীন হবে।
রাঙামাটিতে স্থানীয় অধিবাসীদের সভায় নব্য বসতিস্থাপনকারীরাই উচ্চকণ্ঠে কথা বললেন। একজন বললেন, পাহাড়িরা অস্ত্র ধরেছে বলে সরকার তাদের সুবিধা দিচ্ছে। আমরাও অস্ত্র ধরতে জানি। এই অবস্থা চললে আমরাও অস্ত্র ধরবো।
রাঙামাটিতে আমি সামরিক বাহিনীর জিপে করে চলেছি, দেখি, উলটো দিক থেকে রিকশায় আসছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নৃতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক, আমার বিশেষ স্নেহভাজন প্রশান্ত ত্রিপুরা। আমি জিপ থামিয়ে দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরলাম। একরাশ বিস্ময় নিয়ে সে বললো, ‘আপনি, সার্!’ আমার মনে হলো, জুলিয়াস সিজার নাটকে ব্রুটাসের ছুরিকাঘাতে আহত সিজারের উক্তি, তুমিও ব্রুটাস, যেন আবার ধ্বনিত হলো। প্রশান্তকে বললাম, সার্কিট হাউজে আছি। সন্ধ্যার পর এসো। অনেক কথা আছে। প্রশান্ত আসেনি। সামরিক বাহিনীর জিপে আমাকে দেখার পর হয়তো তার আর আমার কাছে আসতে ইচ্ছে হয়নি।
আমার এক প্রশ্নের উত্তরে সাজিকে এক সামরিক কর্মকর্তা বলেছিলেন, এরা আমাদের প্রচণ্ড ঘৃণা করতো। একবার এক অসুস্থ বুড়িকে রক্ত দেওয়ার। প্রয়োজন হয়। আমাদের নিয়মানুযায়ী ওই গ্রুপের রক্ত যাদের, সেসব সৈন্য রক্ত দিতে দাঁড়িয়ে যায় লাইন করে। এক বৃদ্ধা পাহাড়িকে বাঁচাতে বাঙালি সৈন্যেরা রক্ত দিচ্ছে–এটা এরা ভাবতে পারেনি। রক্ত-দেওয়া দেখতে পাহাড়িদের লাইন লেগে গেল। ওই একটিমাত্র ঘটনা এদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বদলে দেয় সম্পূর্ণভাবে।’
আমরা যখন হেলিকপ্টারে চট্টগ্রামে ফিরে আসি, তখন সেরিব্রাল ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত বেশ কয়েকজন জওয়ানকে আমাদের সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হলো। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে তাদের চিকিৎসা হবে। এমন অনেক আছে। হেলিকপ্টার যদি আসে, তবেই তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্যে চট্টগ্রামে পাঠানো যায়। নচেৎ যে যেখানে, সেখানেই পড়ে থাকে।
চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফিরে এলাম। জেনারেল মতিন আবার অভ্যর্থনা জানালেন। আমি তার কাছে কল্পনা চাকমার খোঁজ করলাম। তিনি বললেন, ‘আমরা তার খোঁজ পাইনি। ওই নামে সত্যিই কেউ ছিল কি না, সে-বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।
ঢাকায় ফিরে আসার পরে একদিন আমরা দল বেঁধে সেনাপ্রধান জেনারেল মাহবুবুর রহমানের কাছে আমাদের অভিজ্ঞতার সার জানিয়ে এলাম। তিনি খুব সৌজন্য প্রকাশ করলেন।
দূরে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরো অনেক কিছুর মতো পারস্পরিক সৌজন্যপ্রকাশের বড়ো অভাব।
৪৮.
১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার আমাকে নজরুল-ইন্সটিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত করে। বোধহয় এটি ছিল আমাকে দেওয়া শেখ হাসিনার গুরুদক্ষিণা।
নজরুল ইন্সটিটিউটের সঙ্গে আমার প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ ঘটে ১৯৯১ সালে। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা-উপদেষ্টা ছিলেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সংস্কৃতির বিষয়টা ছিল তাঁরই মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তিনি আমাকে ইন্সটিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মনোনীত করেন। বিএনপি সরকারের আমলে সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন জাহানারা বেগম। তিনি আমার সদস্যপদের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছিলেন। তাঁর পিতামাতাকে চিনতাম, বোধহয় সে জন্যে কেবল নয়, মানুষ হিসেবেই তিনি শিষ্টাচারে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি পূর্বাপর আমার সঙ্গে খুব সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করেন। সরকারের গ্রন্থনীতি-প্রণয়ন কমিটিতে সদস্য হিসেবে তিনি আমাকে অন্তর্ভুক্ত করেন; তাছাড়া, আগেই লিখেছি, আমার নেতৃত্বে কলকাতায় একটি লেখক-প্রতিনিধি দলও পাঠান।
ইন্সটিটিউটের সদস্য হয়ে আমি যখন যোগ দিই, তখন তার সদ্য নির্বাহী পরিচালক হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান এবং সভাপতিরূপে সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করেছেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। শারীরিক সামর্থ্যের অভাব না ঘটলে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ট্রাস্টি বোর্ডের সভায় অবশ্যই আসতেন এবং ইন্সটিটিউটের অন্যান্য অনুষ্ঠানেও যোগ দিতেন। ট্রাস্টি বোর্ডের সভায় এলে তিনি চাইতেন আমি যেন তাঁর পাশে বসি এবং প্রয়োজনমতো আলোচনার বিষয়বস্তু তাকে বুঝিয়ে বলি, কেননা তখন তিনি কানে কম শুনতেন। সভায় আসতে না পারলে তিনি বলে পাঠাতেন আমি যেন সেখানে সভাপতিত্ব করি। সেটা সবসময়ে ভালো শোনাতো না। সদস্য হিসেবে আমাকে পেয়ে মনিরুজ্জামানও খুশি হয়েছিল।
