শেষ পর্যন্ত ২৫ মার্চ তারিখে জেনারেল অরোরা দিল্লি ফিরে গেলেন। আরেকবার দিল্লিতে গেলাম খুশী কবিরের ব্যবস্থাপনায়–সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী একটি সম্মেলনে। রথ দেখা কলা বেচার মতো তখন নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করালাম। সেবারেও জেনারেল অরোরার বাড়িতে যাই, তিনি বলেন, যদি ডা. ত্রিহানকে দেখাই তবে আমি যেন তাঁর উল্লেখ করি।
এর পরে আবার যখন দিল্লি যাই, তখন তার স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতি হয়েছে। টেলিফোনে কথা শুনতে পাচ্ছেন না বললেন; আমার মনে হলো, তিনি। আমাকে চিনতে পারছেন না। তার সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি।
৪৬.
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মৃত্যুর পরে–১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে–তার স্মরণে কলকাতায় একটি সভা হয়। প্রকৃতপক্ষে সেই সভার আয়োজন করেছিল শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত। তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন পবিত্র সরকার। সেই সময়ে আমি কলকাতায় থাকায় সভায় কিছু বলতে আমাকে আমন্ত্রণ করা হয়। সভায় জনসমাগম ভালো হয়েছিল। শ্রোতাদের অধিকাংশই যে ইলিয়াসের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, তাতে সন্দেহ ছিল না। আলোচনাও বেশ হৃদ্য হয়েছিল।
সেই সভার পরে রণবীর সমাদ্দার আমাকে নিয়ে যায় ঢাকুরিয়ার কাছে এক বাড়িতে। সেখানে পরিচয় হয় তপন বোস আর দেবযানী দত্তের সঙ্গে। তপন একসময়ে চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে জড়িত ছিল। এখন কাঠমান্ডু-ভিত্তিক সাউথ এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটসের (সাফর) অধিকর্তা। কাশ্মিরের। আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে সে অনেক বলেছে এবং সভা-সমিতি-জনমত গঠনের প্রয়াস চালিয়েছে। দেবযানী একসময়ে বামপন্থী ছাত্র-আন্দোলনে নিবেদিত ছিল, এখন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে কিছু সামাজিক কাজ করছে এবং ঘর সংসার করছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বারীন দত্ত এবং শিক্ষক ও মহিলা আন্দোলনের নেতা হেনা দাস তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আমার বিষয়ে তপনের সঙ্গে রণবীরের আগেই কথা হয়ে থাকবে–তারা অনেককালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তপন সেই রাতেই আমাকে আমন্ত্রণ জানালো সাফরের উদ্যোগে পরের মাসে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় সভায় যোগ দিতে। জানলাম, ঢাকায় বেসরকারি সংগঠন অধিকারের সঙ্গে সাফরের একটি যোগসূত্র আছে এবং সেই সুবাদে অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান তাদের খানিক দৌত্য করে।
ঢাকায় ফিরে আসার পরে জানতে পারলাম, আদিলুর রহমান যাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তার মধ্যে আমার শালাজ ফাহমিদা রহমান ওয়াহাব ওরফে ঝিনুকও আছে। সে তখন সিরডাপে কর্মরত। আমি আনন্দিত হলাম। এপ্রিলের ২১ তারিখে আমরা ঢাকা থেকে ব্যাংককে পৌঁছোলাম। সেখানে তখন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ কর্মরত। এর আগে একবার তাকে কথা দিয়েছিলাম, ব্যাংকক যাওয়া হলে তাঁর বাড়ি যাবো। ঝিনুককেও রাজি করালাম বিমানবন্দরের বাইরে যেতে। আমাদের সহযাত্রী এনায়েতউল্লাহ খান ওরফে মিন্টু আর ভাইয়ের কাছে যাওয়ার তাড়না অনুভব করলেন না। সেন্টু ভাইকে ফোন করে একটা ট্যাসি নিয়ে ঝিনুক আর আমি রওনা হলাম। পৌঁছোতে একটু বেশি সময়ই লাগল।
মণি ভাবি ঝিনুককে নিয়ে বাজারে বের হলেন। সেন্টু ভাই আর আমি বসে গল্প। করতে থাকলাম। পুরোনো দিন ও বন্ধুদের কথা উঠলো, বর্তমান সময়ের কথা হলো। তবে তিনি বৃহত্তর পারিবারিক পরিস্থিতি নিয়ে সেদিন অনেক কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে বিশেষভাবে শহীদুল্লাহ খান বাদলের প্রশংসা ছিল। বলেছিলেন, বাদল ছোটো ভাই হয়েও বড়োর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
ব্যাংকক থেকে রাতে রওনা দিয়ে মাঝরাতে কলম্বো পৌঁছোলাম। সেখানে এক হোটেলে রাত্রিযাপন করা গেল। ব্রেকফাস্টের পর হোটেল ছেড়ে শহরের উপকণ্ঠে অন্য একটি হোটেলে আশ্রয় নিতে হলো। সেখানেই আমাদের আলোচনা-সভা অনুষ্ঠিত হবে। সবই ভালো, কেবল হোটেলকক্ষ ভাগ করে নিতে হবে আরেকজনের সঙ্গে। আমি রণবীরের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। দেশীয় সুসন্তানদের সংসর্গ পরিহার করে কেন আমি এক ভারতীয়ের সঙ্গে থাকতে চাইলাম, তা নিয়ে আমাদের বন্ধুবান্ধবেরা কিঞ্চিৎ গবেষণা করলেন। ঝিনুক ঘর ভাগ করেছিল কলকাতার পলা ব্যানার্জীর সঙ্গে। সেক্ষেত্রে অবশ্য ভ্রু কুঞ্চিত হয়নি। কেননা অতিথিদের মধ্যে তৃতীয় কোনো মহিলা ছিলেন না।
প্রারম্ভিক একটি অধিবেশনে রণবীরের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার এক তরুণীর বেজায় তর্ক লেগে গেল। মেয়েটি ছদ্ম-বিনয়ের সঙ্গে বললো, উনি কী বললেন, তা আমি বুঝতে পারিনি, বস্তুত ওঁর ভাষাই আমার পক্ষে দুর্বোধ্য। তিনি যদি একটু সহজ করে বলেন, তাহলে আমার মতো অল্পশিক্ষিতের পক্ষে সুবিধা হয়। উত্তর-আধুনিকতার প্রতি এই শ্লেষ নিক্ষিপ্ত হওয়ায় রণবীর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের মতো বলে গেল, তাহলে তাঁকে এই ভাষা শিখে নিতে হবে। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে উনবিংশ শতাব্দীর ভাষায় সমাজ-বিশ্লেষণ করা সংগত হয় না। তরুণীর অগ্রজও ওই আলোচনা-সভায় উপস্থিত ছিলেন। আমার মনে হলো, ভাইবোনদুটি এলটিটিইর সমর্থক। পরে অন্য এক শ্রীলঙ্কান বলেছিলেন, আমার অনুমান যথার্থ, তবে আমি কী করে তা বুঝলাম, তা ভেবে তিনি অবাক হচ্ছেন।
আমি যে-অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলাম, তাতে বোমা ফাটালেন। আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আফতাব আহমাদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রসঙ্গে তিনি সেখানকার অধিবাসীদের আদিবাসী বলতে অস্বীকার করলেন এই যুক্তিতে যে, আমাদের অঞ্চলে তাদের প্রবেশ ঘটেছে বহু জাতির পরে। নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু হিসেবে যে তাদের স্বাতন্ত্র্য আছে এবং সে-স্বাতন্ত্র্য রক্ষার অধিকার যে তাদের আছে, সেটাও তিনি ঠিক স্বীকার করতে চাইলেন না। পেশোয়ার থেকে আগত এক পাকিস্তানি প্রতিনিধি এতে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি উচ্চৈঃস্বরে জানতে চান, বাংলাদেশের বন্ধুরা পার্বত্য অধিবাসীদের আদিবাসী বলে স্বীকার করেন কি না এবং তাদের স্বতন্ত্র অধিকাররক্ষার পক্ষপাতী কি না। আরো দু-একজন একইসঙ্গে কিছু বলার চেষ্টা করলেন। রণবীরের সঙ্গে পরামর্শ। করে আমি চা-বিরতি ঘোষণা করলাম।
