সেবারের অনুষ্ঠানে জগজিৎ সিং অরোরার সঙ্গে আমার খুব সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেল। অনুষ্ঠানের সকল অংশগ্রহণকারীকে শিশির বসু ক্যালকাটা ক্লাবে নৈশভোজে আপ্যায়িত করেছিলেন। পুরো সময়টা জেনারেল অরোরা এবং আমি এক সোফায় বসে গল্প করে কাটিয়েছিলাম। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ১৯৭১ সম্পর্কে তিনি কিছু লিখলেন না কেন? তিনি মৃদু হেসে বললেন, যুদ্ধে জয়লাভ করলে সে-সাফল্য অনেকে দাবি করে, কিন্তু পরাজিত হলে তার দায় কেউ নিতে চায় না। ১৯৭১ সম্পর্কে অনেকেই তো লিখেছে, আমি আর ভিড় বাড়াই কেন? আমার আমার একাত্তর বইটি তখন প্রকাশের পথে। ১৫-১৬ ডিসেম্বরের কিছু ঘটনা সম্পর্কে আমি তাঁর কাছে জানতে চাই, তিনিও অকপটে উত্তর দেন। কিছুকাল আগে ফুয়াদ চৌধুরীকে জেনারেল অরোরা ক্যামেরায় যে-সাক্ষাৎকার দেন, ফুয়াদ তা আমাকে দেখিয়েছিল। সেখানে তিনি তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। আমি সে-প্রসঙ্গ উত্থাপন করি। জেনারেল অরোরা আবার তাজউদ্দীনের নানা গুণের কথা বললেন এবং তাঁর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে শোকপ্রকাশ করলেন। তিনি যে লোকসভার নির্বাচনে একবার প্রার্থী হয়েছিলেন, সে-বিষয়ে প্রশ্ন করায় জেনারেল বললেন, আমার কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল না। তবে ইন্দিরা গান্ধির দুর্ভাগ্যজনক হত্যাকাণ্ডের পরে শিখেরা যেভাবে সর্বত্র নিগৃহীত হয়, তার প্রতিবাদে ওই সম্প্রদায়ের একজন হিসেবে একটা ভূমিকা নিতে চেয়েছিলাম। ওই মুহূর্তে নির্বাচনপ্রার্থী হওয়াই তার একটা উপায় বলে মনে হয়েছিল। বিদায় নেওয়ার সময়ে তিনি বেশ আবেগের সঙ্গে আমাকে তার দিল্লির বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন।
সুতরাং এর কয়েক মাস পর যখন দিল্লি যাই, তখন জেনারেল অরোরাকে ফোন করি। নাম বলতেই তিনি চিনতে পারলেন এবং তাঁর বাড়িতে যেতে বললেন। তিনি থাকতেন দিল্লির ফ্রেন্ডস কলোনি ইস্টে। নির্ধারিত সময়ে তাঁর ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে দেখি, তিনি পানীয় সাজিয়ে বসে আছেন। তাঁর স্ত্রী অল্পকাল আগে মারা গেছেন, একটিমাত্র মেয়ে নিজের সংসারে থাকে। এসব। বিষয়ে অনেকক্ষণ ধরে কথা হলো। ১৯৭১-এর পর তিনি আর বাংলাদেশে যাননি। ১৯৯৬ সালের বিজয় দিবস বেশ জমকালো করে পালিত হয়েছে, অনেক বিদেশি অতিথি তাতে যোগ দিয়েছিলেন–এসব কথা তিনি শুনেছেন। বাংলাদেশে যে তিনি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিমন্ত্রিত হননি, তার জন্যে একটু দুঃখবোধ হয়তো তার মধ্যে ছিল, কিন্তু আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি যেমন এ ধরনের বোধ নিজের মধ্যেই রেখে দেন, তিনিও সম্ভবত তাই করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জেনারেল অরোরাকে বক্তৃতাদানের আমন্ত্রণ জানাবার কথা ভাবছিলেন এর ট্রাস্টিরা। তাঁদের কথায় আমি ঢাকা থেকে তাঁকে ফোন করি। আমার অনুরোধ তিনি সঙ্গে সঙ্গেই গ্রহণ করলেন। ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসের সম্ভবত ১৯ তারিখে তিনি ঢাকায় এলেন। অন্যদের সঙ্গে আমিও বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানালাম। তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয় হোটেল শেরাটনে। রাতে সেখানে আমরা একত্রে খেলাম। ২১ তারিখে জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিক বক্তৃতা। সেখানে লোকে লোকারণ্য। রেহমান সোবহান সভাপতি, আমি স্বাগত ভাষক, জেনারেল অরোরা মূল বক্তা। তিনি বলেছিলেন, ভারতের সাহায্য ছাড়াও বাংলাদেশ স্বাধীন হতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচেষ্টায়, তবে তাতে সময় লাগত, অনেক বেশি রক্তক্ষয় হতো। জেনারেল অরোরার সঙ্গে আমি গেলাম সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেখানে তার কাছে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছিল, সেখানে। তিনি সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানালেন, সাভারে রক্ষিত দর্শক বইতে মন্তব্য লিপিবদ্ধ করলেন।
জেনারেল অরোরা একটি সরকারি আমন্ত্রণের প্রত্যাশা করছিলেন। তিনি আমাকে খোলাখুলিই বলেন যে, কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়মে তার একটা নিমন্ত্রণ আছে। তবে ২৬ মার্চ যদি ঢাকায় সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি আমন্ত্রিত হন, তাহলে তিনি আর সেখানে যাবেন না। আমার মনে হলো, আমাদের স্বাধীনতা দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে নিমন্ত্রণ করা হবে না। আমি বললাম, আপনার কর্মসূচি আপনি ঠিক রাখুন, এখানে কিছু হলে পরে দেখা যাবে।
অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ তাঁকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ করেছিলেন রাষ্ট্রীয় অতিথি-ভবনে। সেখানে অনেকে এসেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসতে দেরি হয়েছিল, তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী যথাসময়ে উপস্থিত ছিলেন। পৌঁছোবার পরও মধ্যাহ্নভোেজ শুরু করতে মন্ত্রী দেরি করছিলেন–কারণ তিনি অপেক্ষা করছিলেন শেরে খাজার কন্যার জন্যে। মেয়েটি কমবয়সী ও চঞ্চল, ওই অনুষ্ঠানের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিল বলে মনে হয় না। মন্ত্রীকে অপেক্ষা করতে দেখে প্রতিমন্ত্রীও বিরক্ত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মেয়েটি উপস্থিত হওয়ার আগেই ভোজ শুরু হয়েছিল।
একটি নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। দলমতনির্বিশেষে তারা এসেছিলেন। ঢাকায় উপস্থিত সকল সেক্টর কমান্ডার হাজির ছিলেন। রাষ্ট্রদূত আশরাফ-উদ্-দৌলার মতো আহত মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। এই সন্ধ্যার স্বতঃস্ফূর্ততা জেনারেল অরোরার হৃদয় স্পর্শ করেছিল, তা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল।
