সিয়াটল থেকে পরদিন নিউ ইয়র্কে ফিরলাম। জে এফ কে থেকেই টার্মিনাল ভবন বদলে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ধরে স্বদেশযাত্রা। লাউঞ্জে অপেক্ষা করছি, দেখা হয়ে গেল মাহফুজ আনামের সঙ্গে। কলাম্বিয়ার সেমিনারে যোগ দিতে মাহফুজ নিউ ইয়র্কে এসেছিল আমাদের পরে–এখন ফিরে যাচ্ছে। আমরা একই বিমানের যাত্রী।
ঢাকায় ক্লাস নেওয়ার তাগাদা থাকায় এবারে লন্ডনে থামছি না। হিথরো বিমানবন্দরে অনেকক্ষণ বসে থাকতে তাই বেশি খারাপ লাগছিল। আরো একটা ফ্যাকড়া আছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ আমাদের ঢাকা পর্যন্ত নেবে না–ফেলে যাবে দুবাইতে। সেখান থেকে ঢাকায় ফিরতে হবে এমিরেট্সে, তবে দুবাই বিমানবন্দরে থাকতে হবে প্রায় সাত ঘণ্টা।
এতক্ষণ সময় কী করা যায়? আয়েশ করে মুখহাত ধোওয়া হলো, জানলা দিয়ে দোকানের জিনিসপত্র দেখা হলো, কিছু চকোলেটও কেনা হলো। তারপর? মাহফুজ বললো, ‘চলেন, কিছু খেয়ে নেওয়া যাক্।
বললাম, ‘প্লেনে উঠলেই তো খেতে দেবে।’
মাহফুজের যুক্তি, ‘তার তো অনেক দেরি।’
চীনা খাদ্য দিয়ে নৈশভোজ সারা হলো। খাবার যা আনা হয়েছিল, তার সবটা খাওয়া যায়নি।
খেয়েদেয়ে যথাসময়ে বোর্ডিং কার্ড সংগ্রহ করা হলো। তার অনেকক্ষণ পরে যখন উড়োজাহাজে উঠতে যাচ্ছি, এমিরেটসের এক কর্মী ‘একটু অপেক্ষা করো। বলে মাহফুজ আর আমার বোর্ডিং কার্ড নিয়ে কোথায় যেন চলে গেল। ফিরে এলো একজিকিউটিভ ক্লাসের দুটো বোর্ডিং কার্ড নিয়ে এবং মাথা ঝুঁকিয়ে তা আমাদের হাতে সমর্পণ করলো।
জানতে চাইলাম, আমাদের কোন সুকৃতির ফলে এই সমাদর? তরুণটি মাথা ঝুঁকিয়ে জবাব দিলো, এটা এমিরেটসের সেবার ধরন। তারপর বললো, দেখা যাচ্ছে, তোমরা নিউ ইয়র্ক থেকে আসছ অনেক পথ পাড়ি দিয়ে। বাকি পথটা একটু আরামে যেতে তোমাদের নিশ্চয় ভালো লাগবে।
আমি বললাম, তুমি তো জানো না আমি সিয়াল থেকে আসছি আরো বেশি পথ পেরিয়ে। জানলে বোধহয় আমাকে ফার্স্ট ক্লাসে বসাতে। তাই না?
৪৫.
নিউ ইয়র্কেই সুগত বসু বলে রেখেছিল, ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মশতবার্ষিক অনুষ্ঠানে আমাকে যোগ দিতে হবে–লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন আবশ্যিক নয়, মুখে বললেই চলবে। ঢাকায়। ফিরে আসার পরপরই নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাওয়া গেল সুগতর বাবা ডা. শিশিরকুমার বসুর স্বাক্ষরে।
শিশিরকুমার বসু খুব নামজাদা শিশুরোগ-বিশেষজ্ঞ। ১৯৪১ সালে যখন তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র, তখন সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধানের ঘটনাটি ঘটে। শিশির বসুই এলগিন রোডের বাড়ি থেকে গাড়ি চালিয়ে ছদ্মবেশী সুভাষ বসুকে বিহারের গোমো রেলস্টেশনে পৌঁছে দেন-সুভাষ চলে যান পেশোয়ারে এবং সেখান থেকে কাবুল হয়ে মস্কোয়। পুলিশ শিশির বসুকে গ্রেপ্তার করে দিল্লির লাল কেল্লা ও লাহোর দুর্গে দুবছর বন্দি করে রাখে। মুক্তিলাভের পর তিনি কলকাতায় পড়াশোনা শেষ করে ভিয়েনায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ২০ বছর ধরে কলকাতার ইনসটিটিউট অফ চাইল্ড হেলথের ডিরেক্টর ছিলেন এবং ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিসের একজন প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি অনেক কাজ করেছিলেন। আশির দশকে কংগ্রেসপ্রার্থীরূপে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। পিতা ও পিতৃব্য এবং তাঁদের কাল সম্পর্কে ইংরেজি ও বাংলায় তিনি কয়েকটি বই লিখেছেন, আরো কয়েকটি সম্পাদনা করেছেন। তাঁর স্ত্রী কৃষ্ণা বসুও সুভাষ সম্পর্কে অনেক লিখেছেন। তিনি প্রথমে কংগ্রেস দলের ও পরে তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়ন লাভ করে লোকসভার সদস্য হন।
সুগত নিজেও কলকাতায় এসেছিল সুভাষ-জন্মশতবার্ষিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তার সুবাদে ডা. বসু ও কৃষ্ণা বসু আমাকে যথেষ্ট সমাদর করেন। ১৯৭১ সালে শিশির বসুর সঙ্গে আমার সামান্য আলাপ হয়েছিল, সে কথা তাঁকে মনে করিয়ে দিই। তিনি যে তা মনে রাখেননি, তার জন্যে যথেষ্ট লজ্জিত হয়েছিলেন, যদিও অত সামান্য আলাপ মনে রাখার কোনো কারণ ছিল না।
সুভাষের জন্মশতবার্ষিক অনুষ্ঠানে আলোচনার বিষয় সুভাষ ও তার সময়ের রাজনীতিতেই কেবল সীমাবদ্ধ ছিল না, সমকালীন ভারতীয় পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। কাশ্মিরের হুররিয়াত কনফারেন্সের তিন প্রতিনিধি এসেছিলেন আবদুল গনি লোনের নেতৃত্বে–তাঁরা কাশ্মিরিদের আত্মনিয়ন্ত্ৰাধিকার দাবি করেছিলেন এবং সেখানে মানবাধিকার-পরিস্থিতির অবনতির কথা বলেছিলেন। অনেক নামিদামি ব্যক্তির মধ্যে ছিলেন জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা–তিনি ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সমস্যা সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আমাদের কালের পরিপ্রেক্ষিত থেকে আমি সুভাষ বসু সম্পর্কে দু চার কথা বলেছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছিলাম প্রেসিডেন্সি কলেজে সুভাষের সহপাঠী কাজী আবদুল ওদুদের সুভাষচন্দ্র’ কবিতাটির কথা। দেখলাম, কাজী আবদুল ওদুদের নাম জানলেও তিনি যে সুভাষের সহপাঠী ছিলেন, সে কথা উপস্থিত কেউ জানতেন না এবং তাঁর ওই কবিতাটিও কেউ পড়েননি। শিশির বসুর অনুরোধে পরে তাকে আমি কবিতাটি পাঠিয়ে দিই। তিনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র বসুর বক্তৃতা ও রচনার দুটি সংকলন।
