সেমিনারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছিলেন আমার দুই বন্ধু–আজিজুর রহমান খান (ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) ও শেলী ফেল্ডম্যান (কর্নেল) এবং হ্যারি ব্লেয়ার (বাকনেল) ও স্ট্যানলি কোচানেক (পেনসিলভ্যানিয়া); আমস্টারডাম থেকে ভিলেম ভ্যান শ্যান্ডেল এবং কোপেনহেগেন থেকে কানে ওয়েস্টারগার্ড। মওদুদ আহমদ ও মঈন খানও খবর পেয়ে এসেছিলেন–মঈন। যদিও শ্রোতাই ছিলেন, মওদুদ কথা না বলে পারেননি।
সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধগুলি পরে রওনক জাহানের সম্পাদনায় Bangladesh Promise and Performance (ঢাকা : ইউপিএল, ২০০০) নামে প্রকাশিত হয়েছিল।
সেমিনারের বাইরে আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল সুগত বসু (রাজনীতিবিদ শরৎচন্দ্র বসুর পৌত্র) এবং তার পাকিস্তানি বান্ধবী ও পণ্ডিত আয়েশা জালালের সঙ্গে। সুগত আমার পূর্বপরিচিত–তখন টাক্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছে। আয়েশা কলাম্বিয়া ছাড়তে যাচ্ছে। আয়েশার বাড়িতে এক সন্ধ্যায় খানাপিনা হলো। তার অনুরোধে পরে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু ও ফারসি পাণ্ডুলিপির তালিকা পাঠিয়েছিলাম। সে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল।
৪৪.
ড. ক্যারল সলোমান পেনসিলভিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ছেড়ে সিয়াটলে চলে এসেছে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে তার স্বামী রিচার্ড সলোমান ইতিহাসের অধ্যাপক। ক্যারল আপাতত পড়াচ্ছে না, নিজের লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত। আমি কলাম্বিয়াতে আসছি জেনে সে খবর পাঠালো, সিয়াটলে যেতে হবে এবং ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে বক্তৃতা দিতে হবে, নিউ ইয়র্ক থেকে সিয়াটলে আসা-যাওয়ার বিমানভাড়া তারাই দেবে। আমি জানালাম, কলাম্বিয়ার জন্যে প্রবন্ধ লিখতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি, আবার সিয়াটলের জন্যে লিখব কখন? ক্যারল লিখলো, ওই প্রবন্ধটাই সিয়াটলে পড়লে চলবে–এখানকার শ্রোতাদের কেউ তো আর কলাম্বিয়ার সেমিনারে উপস্থিত থাকছে না। সমাধান। এত সহজ যে দ্বিরুক্তির অবকাশ নেই।
সেইমতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্তে চলে এলাম। বিমানবন্দরে রিচার্ড এবং ক্যারল উভয়েই উপস্থিত। আমার ভারী সুটকেসটা টানাটানির ভার রিচার্ড নিয়েছেন দেখে লজ্জা পেলাম। টার্মিনাল ভবন থেকে শাটল ট্রেনে করে গাড়ি পার্কিংয়ের এলাকায় পৌঁছোনো গেল। রিচার্ডই গাড়ি চালিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। সেখানেই আমার থাকার ব্যবস্থা। ক্যারলদের দোতলা বাড়ি–আমার জন্যে বরাদ্দ কক্ষটা ওপরতলায়। রিচার্ড সেখানেই আমার সুটকেস পৌঁছে দিলেন।
পরদিন ক্যারল আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়-এলাকা ঘুরিয়ে দেখালো। শিক্ষকদের ক্লাবে দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা। সেখানে আমাদের শিকাগো-যুগের বন্ধু ফ্র্যাংকের সঙ্গে দেখা। সে আমার আসবার খবর জানতো, তাই আমাকে দেখে অবাক হয়নি। তবে তার ভালুকোচিত আলিঙ্গনের উষ্ণতায় আমি একটু অবাক হলাম বইকি! ফ্র্যাংক বললো ক্যারলকে, জানো, আনিস আমাকে ডোনার কাবাব খাওয়া শিখিয়েছে! আমি একটু বিস্মিত হয়েই প্রশ্ন করি, সে কবে? ফ্র্যাংক বলে, তোমার কিছু মনে নেই-লন্ডনে, ১৯৭৯ সালে।
খেতে খেতে কাঁচের দেওয়াল দিয়ে বাইরে তাকাই। ক্লাব-ভবনের গা ঘেঁষেই চমৎকার একটি লেক। লেকের অন্য প্রান্তে মনোরম একটি বাড়ি। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ফ্র্যাংক বলে, বাড়িটা কার জানো? বিল গেটসের। আমি বলি, তাহলে আমরা এখানে বসে মিছেমিছি সময় নষ্ট করছি কেন? ভিক্ষা দাও গো বলে ওই বাড়ির দরজায় করাঘাত করা যাক।
ফ্র্যাংক বললো, লোকটা আসলে মন্দ নয়। যদি সত্যি সত্যি ওর সামনে গিয়ে হাত পাততে পারো, তাহলে হয়তো খালি হাতে ফিরতে হবে না। তবে তার সামনে যাওয়াটাই সমস্যা। সেজন্যে শক্তিসঞ্চয় করতে হলে আরো এক পাত্র পান করতে হবে।
ক্যারল তার বাড়িতে রাতে খেতে ডেকেছে আরো কয়েকজনকে। তাদের মধ্যে আছে নন্দিনী এবং তার স্বামী ফাহাদ। নন্দিনী ঢাকা বেতারের এককালীন অধিকর্তা জায়নুল আবেদীন এবং আমাদের অনেককালের নূরু আপার কন্যা। ফাহাদ মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানের পুত্র। খাওয়া দাওয়ার পরে ওরা দুজন আমাকে নিয়ে বেড়াতে বের হলো। সিয়াটল পার্বত্য এলাকা। এদিক-ওদিকে বৈদ্যুতিক আলোগুলো জ্বলছে তারার মতো–তবে একই তলে নয়, উঁচুনিচুতে–তাই নক্ষত্রখচিত আকাশের চেয়ে চারপাশটা মনোরম দেখাচ্ছে।
পরদিন আমার প্রবন্ধপাঠ। প্রবন্ধের শিরোনাম বোধহয় ছিল Identity and Politics in Bangladesh-এই প্রবন্ধটাই কলাম্বিয়ায় পড়েছিলাম (রওনক জাহান-সম্পাদিত বইতে শিরোনাম খানিকটা বদলে দেওয়া হয়েছে, আমার নামের আগেও একটা অনাবশ্যক এম’ এসে জুটেছে)। কলাম্বিয়ার শ্রোতারা ছিলেন দক্ষিণ এশীয় বিদ্যার শিক্ষক ও ছাত্র–আমার বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে বেশ খানিকটা পরিচিত। সিয়াটলে নানা বিদ্যার লোক এসেছেন। ছাত্রদের কেউ কেউ অতি সরল প্রশ্ন করে বসলো, এক স্বনামধন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আমার সঙ্গে তর্ক জুড়ে বসলেন–আমার পক্ষপাত উদ্ঘাটন করাই তার লক্ষ্য বলে মনে হলো। ফেরার পথে রিচার্ডকে বললাম, আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীকে সন্তুষ্ট করতে পারিনি। রিচার্ড সারাক্ষণই চুপচাপ ছিলেন। এবারে মুখ খুললেন, তুমি কি এমন কাউকে জানো যে ওঁকে খুশি করতে পেরেছে?
