আমরা তড়িঘড়ি চা খেয়ে বিদায় নিলাম। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের চা খুব সুস্বাদু মনে হয়নি। ওঠার সময়ে আমরা সকলেই রিপোর্টের কপি টেবিলে রেখে চলে এসেছিলাম।
পরে তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সেসব কপি আমাদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন। আর আঞ্জু মনোয়ারা কয়েকদিনের মধ্যে বদলি হয়ে যান টাঙ্গাইলে।
রিপোর্টে আমরা একটি স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন-প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলাম। এর চেয়ারম্যান ও সদস্যেরা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। এই কমিশন জবাবদিহি করবে তথ্যসম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংসদের কাছে। মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্তৃত্ব এর ওপর থাকবে না। বেতার ও টেলিভিশন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানরূপে এর তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। সেখানেও মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ থাকবে না।
করদাতার টাকা যেখানে খরচ হবে, করদাতাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেখানে নাক গলাবেন না–এমন একটা পরিস্থিতি অনেকের পছন্দ হয়নি। তারা বেতার-টেলিভিশনকে স্বায়ত্তশাসন দিতে চেয়েছিলেন মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব বজায় রেখে।
ওই রিপোর্ট সম্পর্কে এবং বেতার-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে তারপর আমরা আর কিছু শুনিনি।
৪৩.
মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়লাভের পঁচিশ বছরপূর্তি উপলক্ষে ড. রওনক জাহান ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আন্তর্জাতিক আলোচনা-সভার আয়োজন করে। তাতে যোগ দিতে রেহমান সোবহান (সিপিডি), আবু আবদুল্লাহ ও বিনায়ক সেন (বিআইডিএস), জরিনা রহমান খান ও আমি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), মহিউদ্দীন আহমদ (ইউপিএল) ও সারা হোসেন (আইনজীবী) ২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের লন্ডনগামী ফ্লাইটে উঠে বসলাম। উড়োজাহাজের দরজা বন্ধ হলো, কিন্তু টার্মিনাল ভবনের গেট ছাড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। আমরা অস্থির। এয়ার হোস্টেসদের বললাম কিছু পানীয় সরবরাহ করতে। তারা বললেন, উড়োজাহাজ ওড়ামাত্র তারা খেতে দেবেন। তারপর টার্মিনাল ভবন ছেড়ে বিমানটি কিছুদূর এগোলো, কিন্তু কিছুদূরমাত্রই। অবশেষে ক্যাপ্টেনের কণ্ঠস্বর শোনা গেল : ছোটো একটি যন্ত্রাংশ পাল্টাতে হবে; সেটা আমাদের কাছে নেই, অন্য একটি এয়ারলাইনসের ভাঁড়ারে আছে। তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ডেকে পাঠিয়েছে। সে এলেই ওটা পাওয়া যাবে এবং আমরা উড়তে পারবো। একসময়ে জানানো হলো, যন্ত্রাংশটি পাওয়া গেছে। তারপর জানা গেল, যন্ত্রাংশটি লাগানো হয়েছে। তারপর : আমরা দুঃখিত। যে যন্ত্রাংশটি লাগানো হয়েছে, সেটি বোয়িংয়ের নয়, তাই আটলান্টার বোয়িং কর্তৃপক্ষ সেটা নিয়ে ওড়ার অনুমতি দিচ্ছে না। এদিকে এতক্ষণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র চালু থাকায় জ্বালানিও অনেক খরচ হয়ে গেছে। ক্রুদের কাজ করার যে-সময়সীমা, তারও অনেকখানি ব্যয় হয়ে গেছে। এ-অবস্থায় আজ আর এই ফ্লাইট ছাড়া সম্ভবপর নয়। আপনাদের রাতের খাবার এখন সরবরাহ করা। হচ্ছে। এরপর টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। সেখানে গিয়ে আপনারা নিজেদের মালপত্র সংগ্রহ করবেন। তারপর এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনায় আপনাদের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। আগামীকাল একই সময়ে আপনাদের নিয়ে আমরা উড়ে যাবো।
তখন আর খাওয়ার ইচ্ছেও থাকলো না। টার্মিনালে পৌঁছে দেখি একেবারেই বিশৃঙ্খল অবস্থা। মালপত্র খুঁজে নিয়ে নিজেদেরই টানাটানি করতে হচ্ছে। যে বাসে হোটেলে যাওয়ার কথা, তাতে সবার স্থানসংকুলান হবে না। সুতরাং তাতে ওঠার জন্যে ভয়ংকররকম প্রতিযোগিতা। কোনোমতে গন্তব্য জানা গেল : গুলশানের হোটেল মিডটাউন। আমরা কয়েকজন একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে সেখানে এলাম। আনন্দকে ফোন করে সেখানে গাড়ি নিয়ে আসতে বললাম। সেই গাড়িতে সারাকে বাড়ি পৌঁছে নিজের জায়গায় ফিরে এলাম।
পরদিন প্লেনে উঠে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের পক্ষ থেকে দুঃখপ্রকাশ করে লেখা চিঠি পাওয়া গেল। আর পাওয়া গেল নব্বই পাউন্ডের একটা ভাউচার-পরবর্তী কোনো যাত্রায় কাজে লাগবে।
হিথরোতে পৌঁছে আমাদের ইমিগ্রেশনের কাজ সারতে হবে। কেননা আমরা বিমানবন্দরেই একটি হোটেলে থাকবো এয়ারলাইনসের ব্যবস্থায়। অনেক যাত্রীর যুক্তরাজ্যের ভিসা নেই। তাদের জন্যে অনুমতি সংগ্রহ করতে অনেকক্ষণ লাগলো। আমাদের যাদের ভিসা আছে, তাদেরও অপেক্ষা করতে হলে সবার জন্যে। ফলে যখন আমরা টার্মিনাল ছাড়লাম, তখন মনে হলো, আর কিছুক্ষণ এখানে কাটিয়েই আমরা নিউ ইয়র্ক রওনা হতে পারতাম।
হোটেলটি ভালো, তবে ঘুমোবার সময় তেমন পাওয়া গেল না। প্রাতিক্কালে উঠেই রওনা দিতে হলো–কেউ ব্রেকফাস্ট করলো, কেউ করলো না। আমাদের সহযাত্রীদের কাউকে অকারণ হয়রানি করলো ইমিগ্রেশন। এতকিছুর পর আটলান্টিক পার হওয়া।
নিউ ইয়র্কে আমাদের থাকার ব্যবস্থা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি ভবনে। ঘরগুলো ছোটো, কিন্তু ব্যবস্থা অত্যাধুনিক। এতই অত্যাধুনিক যে ম্যানুয়াল হাতে করে বাথরুমে ঢুকে মুদ্রিত নির্দেশ অনুসরণ করে করে শাওয়ার খুলতে হলো। ব্রেকফাস্টের সময়ে জানতে পারলাম যে, মহিউদ্দীন আহমদ নির্দেশাবলির খেই হারিয়ে ফেলে গোসল সারতে পারেননি। টেলিফোন ব্যবহার করতেও প্রায় একইরকমের ঝামেলা।
