প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দপ্তরে কমিশনের আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হয় অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে। তার সঙ্গে কথা বলে আমাদের মনে হয়েছিল, সে বাস্তবিকই বেতার-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন চায়। হাসিনা বারবারই বলছিল যে, স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টা তার দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্তর্গত। সে প্রতিশ্রুতিপালনে সে আমাদের সহায়তা চায়। তবে কমিশনের বৈঠকে স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমরা যে-ধারণা করেছি, তার সঙ্গে তার ধারণার পার্থক্য আছে, একথাও আমাদের মনে হয়েছিল। অবশ্য সে-ব্যবধান দুরতিক্রম্য বলে মনে হয়নি।
কমিশনে একপর্যায়ে কথা উঠলো, অন্য কোথাও প্রচারমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন কীভাবে কার্যকর হয়েছে, সেটা একবার সরেজমিনে দেখতে পারলে ভালো হয়। এ-প্রসঙ্গে বিবিসির নাম যে উঠবে, তা খুব স্বাভাবিক। ভারত পাকিস্তানের কথা উঠলো এবং ফিলিপাইনসের কথাও উঠলো। এসব দেশে বেতার-টেলিভিশন কিছুকাল আগেও সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন তারা স্বাধীনতা ভোগ করছে। স্থির হলো, আমাদের এক দল যাবে ইংল্যান্ডে, এক দল ভারত-পাকিস্তানে এবং আরেক দল ফিলিপাইনসে।
ইংল্যান্ডে গেলেন আসাফউদ্দৌলাহ, কলিম শরাফী, এম আই চৌধুরী, নূরুন নবী ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আঞ্জু মনোয়ারা–কমিশনের কাজে সহায়তা করার দায়িত্ব তাঁকে অর্পণ করা হয়েছিল। ভারত ও পাকিস্তানে গেলেন আসাফউদ্দৌলাহ্, কে জি মুস্তাফা, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শাহরিয়ার জেড আর ইকবাল ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার নওয়াজেশ আলী খান। ফিলিপাইনসে গেলাম তথ্যসচিব কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, আরেফিন সিদ্দিক, সৈয়দ হাসান ইমাম, জামালউদ্দীন হোসেন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব এম এ কাদের, ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক টি এইচ শিকদার ও আমি।
আমাদের এই বিদেশ-সফর নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল, এখনো হয়। সমালোচনার যে কিছু ছিল না, তা নয়। তবে গরিব করদাতাদের পয়সায় আমরা বিলাস-ভ্রমণ করে এসেছি, এমন মন্তব্য তথ্যনিষ্ঠ নয়। ইউএনডিপি আমাদের খরচ জোগায়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আমাদের জন্যে কোনো ব্যয় হয়নি। আমাদের অনুদান দেওয়ায় ইউএনডিপি যে রাষ্ট্রকে কিছু কম দিয়েছে, তাও নয়।
১৯৯৭ সালের ১ জুন আমরা ঢাকা থেকে ব্যাংকক গেলাম। থাই এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনায় সেখানে রাতটা হোটেলে কাটিয়ে পরদিন ম্যানিলা পৌঁছলাম। ব্যাংককের হোটেলটি খারাপ ছিল না, তবে ঘর পেতে একটু দেরি হয়েছিল, এই যা।
ম্যানিলা বিমানবন্দরে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের দূতাবাসের দুজন কর্মকর্তা। তারা আমাদের নিয়ে গেলেন একটা মাঝারি ধরনের হোটেলে, মনে হলো শহরের একপ্রান্তে। হোটেলটা তারাই বাছাই করেছেন, সম্ভবত আমাদের দৈনিক ভাতার আনুপাতিক হিসেবে। ম্যানিলায় আমি আগেও এসেছি, সুতরাং নূতনত্বের কোনো আকর্ষণ ছিল না। তবে ফিলিপাইনস সরকারের অকৃপণ আতিথ্য আমরা সর্বক্ষণ উপভোগ করেছি। পথপ্রদর্শক ও দোভাষী, যানবাহন ও প্রহরার যে-আয়োজন তারা করেছিল, তাতে নিজেদের রাষ্ট্রীয় অতিথি বলেই মনে হয়েছিল। আমাদের সম্মানে ফিলিপাইনসের তথ্য মন্ত্রণালয় যে-ভোজ দিয়েছিল, তাতে প্রেসিডেন্ট রামোস যোগ দিয়েছিলেন। এই বিরল। সম্মানলাভের একটা কারণ বোধহয় এই ছিল যে, অল্পকাল আগে প্রেসিডেন্ট রামোস বাংলাদেশ সফর করে খুশি হয়ে ফিরেছিলেন।
চারদিনে ম্যানিলায় যা দেখার, তা দেখলাম। যা দেখার নয়, তাও দেখলাম। এক সরকারি দপ্তরের এক কক্ষে দেখি ফিল্মের ক্যাসেট বোঝাই করা। আমাদের কৌতূহলী দৃষ্টি লক্ষ করে এক সামরিক কর্মকর্তা বললেন, এগুলো বাজেয়াপ্ত করা পর্নো ছবি। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে আমাদের সেনারা যেখানে যুদ্ধ করছে সেখানে পাঠাই তাদের বিনোদনের জন্যে। তোমাদের চাই নাকি?
৭ তারিখে ম্যানিলা থেকে ব্যাংকক। হোটেলে এক রাত কাটিয়ে পরদিন ঢাকা।
তারপর কমিশনে বসে অভিজ্ঞতা-বিনিময়, নানারকম কথা, রিপোর্ট লেখা। রিপোর্ট মাজাঘষা করতে কয়েকজন এক সন্ধ্যায় আমার বাসায়ও বসলাম। রিপোর্ট ছাপা হলো। নির্ধারিত দিনে সেটা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিতে আমরা তার দপ্তরে গেলাম।
বসে আছি, বসে আছি। প্রধানমন্ত্রী আর আসে না। শুনতে পেলাম, তথ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক চলছে। অনেকক্ষণ পর প্রধানমন্ত্রী এলো, সঙ্গে তথ্য প্রতিমন্ত্রী। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ঢুকেই বললেন, এখানে আমি এসে কী করবো! আমার তো কিছু করার নেই এখানে!’ প্রধানমন্ত্রী তাকে থাকতে বললো। একপর্যায়ে আমিও বললাম, আপনি থাকুন। যদিও সেখানে তাঁকে থাকতে বলার কোনো অধিকার আমার ছিল না, কিছু একটা না বললে ভালো দেখাচ্ছে না বলেই বললাম।
সভার শুরুতে কমিশনের চেয়ারম্যান কথা বলতে উঠলেন। তিনি দু তিনজনের নাম করে বললেন, কমিশনের সৌভাগ্য যে, এর কাজে এমন সব ব্যক্তির সহায়তা পাওয়া গেছে। শেখ হাসিনা সঙ্গে সঙ্গে বললো, তাদেরও সৌভাগ্য যে এমন জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন কাজের দায়িত্ব তাদেরকে অর্পণ করা হয়েছে। আসাফউদ্দৌলাহর মতো বাকপটু মানুষও তাতে থমকে গেলেন।
বাকি কথাবার্তা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললো। প্রধানমন্ত্রীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট তুলে দেওয়ার পরে আমাদের সবাইকে রিপোর্টের কপি দেওয়া হলো। রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল আঞ্জু মনোয়ারার দায়িত্বে। কাজেই তিনিই সবাইকে রিপোর্টের কপি দিচ্ছিলেন। প্রতিমন্ত্রী তাকে ধমক দিয়ে বললেন, সবাইকে কপি দিচ্ছেন কেন? কত কপি ছাপা হয়েছে? ভদ্রমহিলা খুব অপ্রস্তুত হলেন। তারপরও নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘১০০ কপি, সার্।’ প্রতিমন্ত্রী জানতে চাইলেন, ‘১০০ কপি কেন? আমি তো ৫০ কপি ছাপতে বলেছিলাম। কমিশনের চেয়ারম্যানের দিকে ইঙ্গিত করে আঞ্জু মনোয়ারা বললেন, ‘সাক্ ১০০ কপি ছাপতে বলেছিলেন।
