পরদিন আমি বন থেকে ট্রেনে যাত্রা করলাম লন্ডনের পথে। খুবই আরামদায়ক ভ্রমণ। তার ওপর, ট্রেনটা যাবে ইংলিশ চ্যানেলের নিচ দিয়ে। সেটা চাঞ্চল্যকর। বস্তুত চ্যানেল-টানেল আসার আগে ট্রেনের পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে জানান দেওয়া হয়, কিছু কিছু পালনীয় নির্দেশ থাকে। যাত্রাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল।
সেই ভালো-লাগা কিছুটা ম্লান হয়ে গেল লন্ডনের ওয়াটারলু রেলওয়ে স্টেশনে শুল্ক-সংগ্রাহকদের বাড়াবাড়িতে। মনে হয়, র্যানডম স্যাম্পলিংয়ের শিকার হয়েছিলাম আমি। সুতরাং আমার স্যুটকেস খুলতে হলো। ওয়াকিলুর রহমান আর্ট গ্যালারি দেখাতে নিয়ে গিয়ে ছবির একটা প্রিন্ট কিনে আমাকে উপহার দিয়েছিল। সেটি ছিল একটা পিজবোর্ডের চোঙার মধ্যে, ফলে তা। সন্দেহের উদ্রেক করে। সন্দেহভঞ্জন হলো শেষ পর্যন্ত। কিন্তু কাস্টমসের তরুণী বেশ একটা উচ্চমন্যতার সঙ্গে যখন জিজ্ঞাসা করলো আগে কখনো লন্ডনে এসেছি কি না, তখন যথেষ্ট খারাপ বোধ করলাম। রূঢ়ভাবে বললাম, ‘বহুবার। এবারে প্রশ্ন, কবে?’ বললাম, ‘প্রথম এসেছিলাম তোমার জন্মের আগে–তারপর আরো অনেকবার এসেছি। দেখলাম, রূঢ়তায় ফল ফলে।
লন্ডনে সেবার কী করেছিলাম, তা আর এখন মনে পড়ে না। আমার সেই তালিকাগ্রন্থটি প্রকাশিত হবে কি না তার খোঁজ নিতে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম। গ্রাহাম শ এখন বিভাগীয় কর্তা। তিনি মুখে বলছেন হবে, কিন্তু তার শরীরের ভাষা সেটা সমর্থন করছে বলে মনে হলো না।
এরোফ্লোতের লন্ডন-মস্কো ফ্লাইট বেশ ভালো। আমার পাশে মস্কোযাত্রী যে রুশ তরুণী বসেছিল, সেও বেশ বন্ধুভাবাপন্ন। মস্কো-দিল্লি অংশের ফ্লাইট সহনীয়। দিল্লি-কলকাতা আবার বেশ খারাপ।
৪২.
সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি-পদে মনোনয়ন দিলো বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে। তাঁর মতো একজন নির্দলীয় ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার এ-সিদ্ধান্ত বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
তার আগেই, ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে সৃজনশীলতা, গতিময়তা, জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা আনয়ন এবং এ দুটি প্রতিষ্ঠানের অধিকতর স্বায়ত্তশাসন প্রদানের নীতিমালা সংক্রান্ত বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সরকার একটি কমিশন গঠন করে। অবসরপ্রাপ্ত সচিব, সংগীতশিল্পী ও ক্রীড়াবিদ মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌলাহ এই কমিশনের চেয়ারম্যান এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (জালালউদ্দিন আহামেদ) তার সদস্য-সচিব নিযুক্ত হন। এর সদস্য নিযুক্ত হন ড, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, ড. আ আ স ম আরেফিন সিদ্দিক, ড. আনিসুজ্জামান, আসাদুজ্জামান নূর, সৈয়দ হাসান ইমাম, জামালউদ্দীন হোসেন, কে জি মুস্তাফা, কলিম শরাফী, রামেন্দু মজুমদার এবং পদাধিকারবলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ম. নজরুল ইসলাম সিদ্দিকী, পরে শাহরিয়ার জেড আর ইকবাল), বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক (শাহরিয়ার জেড আর ইকবাল, পরে সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী), বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক (এম আই চৌধুরী), অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের যুগ্ম-সচিব (এম নূরুন নবী) ও সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (আবদুল মতিন খান)।
কমিশনের চেয়ারম্যান আসাফউদ্দৌলাহ্ আওয়ামী লীগের না হলেও শেখ হাসিনার কাছের মানুষ ছিলেন। তাঁদের দুই পরিবারের মধ্যে বিলক্ষণ সৌহার্দ্য ছিল। আসাউদ্দৌলার বোন মরিয়ম বেগম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভ করে সদ্য সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মহিলাদের সংরক্ষিত আসনে। তা সত্ত্বেও আসাউদ্দৌলাহ্ গোড়া থেকেই কমিশনকে সরকারি আওতার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তার ধারণা ছিল–এবং আমরাও তাঁর সঙ্গে একমত ছিলাম যে–স্বাধীনভাবে চলতে হলে কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা থাকতে হবে। তিনি এককভাবে ইউএনডিপির সঙ্গে কথা বলে কমিশনের কাজের জন্যে প্রায় ৮০ লাখ টাকার অনুদান সংগ্রহ করেন। অনুদানটি অবশ্য দেওয়া হয় তথ্য মন্ত্রণালয়কে, তবে স্পষ্টই নির্ধারণ করে দেওয়া হয় যে, এই অর্থ ব্যয়িত হবে বেতার-টেলিভিশন স্বায়ত্তশাসন কমিশনের কাজে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। কমিশন যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হয়ে রইল না, এতে বোধহয় তিনি খুশি হননি। শুরুতেই কমিশনের সঙ্গে–আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাঁর সংঘাত লেগে গেল। তিনি চেয়েছিলেন, বাংলাদেশ সচিবালয়ে, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে, কমিশনের উদৃবোধন হোক এবং সেই উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান বেতার টেলিভিশনে প্রচারিত হোক–তাতে হয়তো সরকারের সুনাম হবে। আমরা হোটেল পূর্বাণীর একটি কক্ষে আমাদের প্রথম অধিবেশনের আয়োজন করলাম এবং উদ্বোধনের কোনো আনুষ্ঠানিকতা রাখলাম না। পরবর্তী অধিবেশনগুলোও সেখানেই হলো। এর জন্যে অল্পস্বল্প যে-ব্যয় হয়, তা বহনের সামর্থ্য তো আমাদের হয়েই গিয়েছিল। মোটকথা, তথ্য মন্ত্রণালয়ের বলয়ের বাইরে থেকে আমরা কাজ করতে মনস্থ করলাম। প্রতিমন্ত্রী তা পছন্দ করেছিলেন বলে মনে হয়নি।
