শিল্পী ওয়াকিলুর রহমানের স্ত্রী উটাও জার্মান–তাদের দুটি সন্তান। ওয়াকিল স্বল্পভাষী, কিছুটা লাজুক প্রকৃতির, তবে খুবই সহৃদয় মানুষ।
আমাদের সফরসঙ্গীদের মধ্যে অম্লান দত্তের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘকালের। তিনি যেমন পণ্ডিত, তেমনি সজ্জন। নিমাইসাধন বসুর সঙ্গে আগে ঢাকায় পরিচয় হয়েছিল, দেখলাম তিনি তা ভোলেননি। দিলীপকুমার সিংহ গণিতের অধ্যাপক, কথা কম বলেন, রবীন্দ্রসংগীত গান বেশি। অবাক হয়ে লক্ষ করি শান্তিনিকেতনের সঙ্গে দীর্ঘকাল সংসবের পরেও অমিতাভ চৌধুরীর কথায় সিলেটি টান রয়ে গেছে। তিনি জানতে চান, আমি মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে চিনতাম কি না। বললাম, জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি তার ছাত্র ছিলাম, উপরন্তু তার বড়ো ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে আমার ছোটো মেয়ের। অমিতাভ চৌধুরী এক ঝটকায় আপনি থেকে তুমিতে চলে এলেন, তাহলে তো তুমি আমার বেয়াই। অনতিবিলম্ব দিলীপ সিংহকে আক্রমণ : ‘দিলীপ, তুমি আমার বেয়াইকে বিশ্বভারতীতে নিয়ে আসছ না কেন?’ দিলীপ সিংহ হতভম্ব, কে যে অমিতাভ চৌধুরীর বেয়াই, তা তিনি ঠাহর করে উঠতে পারেন না। পরদিন আবার দিলীপ সিংহের প্রতি অমিতাভ চৌধুরী : ‘এই যে দিলীপ, আমার বেয়াইকে বিশ্বভারতীতে আনছ কবে?’ নিরুপায় উপাচার্য আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয় আনবো। আপনি অনুগ্রহ করে আপনার একটা সিভি আমাকে পাঠিয়ে দেবেন?’ আমি বলি, ‘অবশ্যই’, যদিও জানি পাঠাবো না, কেননা এমন কথার ভিত্তিতে কোনো উপাচার্যকে জীবনবৃত্তান্ত পাঠানো তাঁকে বিব্রত করা এবং নিজে বিব্রত হওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
আলোচনা-সভা ভালোই হলো। আলোচনার মাধ্যম ইংরেজি। নারীপুরুষ মিলে আট-দশজন জার্মান বিদ্বান রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখে এনেছেন। নিমাইসাধন বসু, দিলীপ সিংহ, সজীদা খাতুন ও আমিও লিখিত বক্তব্য নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার প্রবন্ধটি সদ্য লেখা–’টেগোর অ্যান্ড দি ওয়েস্ট’। মনে হলো, একেবারে মন্দ হয়নি। কোনো এক জার্মান অংশগ্রহণকারীর বক্তব্যের খানিক বিরূপ সমালোচনা করেছিলাম আমি। আরেক জার্মান বিদ্বান পরে। আমাকে বললেন, আপনি ঠিক বলেছেন, তবে অতটা মোলায়েম করে না। বললেও পারতেন। জার্মানির একত্রীকরণের এই ফল হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য লোকও বিশ্ববিদ্যালয়ে উঁচু পদ পেয়ে যাচ্ছে যোগ্যকে বঞ্চিত করে। দুই জার্মানি এক হয়েছে বটে, তবে ক্ষমতাসীনরা লক্ষ রাখছেন যাতে পূর্ব জার্মানির লোকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল না করতে পারে। যিনি এ-কথা বললেন, তিনি পূর্ব জার্মানির এবং কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের, এটুকু নিঃসন্দেহে বোঝা গেল।
আমার ছাত্র এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মী আবদুল্লাহ আল ফারুক জার্মান বেতার ডয়েশভেলের বাংলা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। সে প্রথম থেকেই কোলনে যাওয়ার তাগাদা দিচ্ছে। যাবো বলে কথা দিলাম, কিন্তু তার আগে আমাদের একটা সমস্যাপূরণের প্রয়োজন ছিল।
আমরা যেভাবে এসেছি, ফিরতেও হবে ওভাবে। কিন্তু ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনে দু-পথের ট্রানজিট ভিসার আবেদন করেও পেয়েছি এক পথের ভিসা, অথচ এর আগে অনেকবার দু-পথের ট্রানজিট ভিসা লাভ করেছিলাম। ভারতীয় হাই কমিশনে যখন জিজ্ঞাসা করলাম, ভিসা নিয়ে বার্লিন পৌঁছাবো ঠিকই, কিন্তু ফিরব কেমন করে, তারা বললেন, বার্লিনে ভারতীয় দূতাবাসে আবেদন করলে ফিরতি ট্রানজিট ভিসা পাওয়া যাবে। সৰ্জীদা খাতুন ও আমি বার্লিনে ভারতীয় দূতাবাসের অফিসে গিয়ে আবেদন করলাম। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জাবেদ আশরাফ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব। তিনি বারবার জানতে চাইলেন, কেন আমাদের দু পথের ট্রানজিট ভিসা দেওয়া হলো না? সদুত্তর দিতে পারলাম না, তারপরও ভিসা পাওয়া গেল। তবে দুদিন দুবেলা সময় নষ্ট হলো তার পেছনে ছুটে। আমি পরিকল্পনা করলাম লন্ডন যাওয়ার। বার্লিনে এরোফ্লোত অফিসে গিয়ে সামান্য চেষ্টায় বার্লিন-কলকাতার টিকিটটা লন্ডন-কলকাতার টিকিটে রূপান্তর করা গেল। অতঃপর ট্রেনে করে কোলন-যাত্রা। এলিজাবেথ ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে ফারুককে ফোনে জানিয়ে দিলেন আমি কখন পৌঁছাবো। ফারুক স্টেশনে যথাসময়ে উপস্থিত থেকে আমাকে অভ্যর্থনা জানালো এবং তার বাড়ি নিয়ে গেল। তার স্ত্রী মালা হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা শিক্ষকতার কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত। বিনয়ী, স্বল্পভাষী, অতিথিপরায়ণ।
পরের দিন ডয়েশভেলে গিয়ে একটা সাক্ষাৎকার রেকর্ড করলাম। তারপর ফারুকের অফিসে বসে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময়ে নাজমুননেসা ওরফে পিয়ারী সে-ঘরে ঢুকতে গিয়ে আমাকে দেখে দোরগোড়াতেই চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে গেল। পিয়ারী এককালে আমার ভাগ্নে মামুনের বন্ধুবৃত্তে ছিল, তখন সে আমাকে মামা বলতো। শহীদ কাদরীর সঙ্গে বিয়ের পরে আমি ভাই হয়ে যাই এবং সেই সম্বোধন এখনো অটুট আছে। পিয়ারী আমার আসার খবর একেবারেই জানতো না, ফলে তার বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। ওদের অফিস থেকে বেরিয়ে পথে-পথে সে ও আমি অনেক হাঁটলাম, অনেক গল্প করলাম, হাতে যে আরো সময় নেই সেজন্য দুঃখ করলাম। তারপর যখন আর না-ফিরলেই-নয়, তখন ফিরে এলাম। বেতারভবনে।
