আপাতত আমি আছি হৃষ্টচিত্তে। সেই প্রফুল্লতা নিয়েই আগস্টের গোড়ার দিকে জার্মানি রওনা হলাম। বার্লিনে আয়োজিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে দুদিনের আলোচনা-সভা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাচ্ছেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য দিলীপকুমার সিংহ, বিশ্বভারতীর দুই প্রাক্তন উপাচার্য নিমাইসাধন বসু ও অম্লান দত্ত এবং বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্রদের শিরোমণি অমিতাভ চৌধুরী। ঢাকা থেকে নিমন্ত্রিত সজীদা খাতুন ও আমি। যাত্রাপথ সরল নয়। আমাদের দুজনকে যেতে হবে ঢাকা থেকে কলকাতা, তারপর বাকি চারজনের সঙ্গে সেখান থেকে এরোফ্লোতে দিল্লি ও মস্কো হয়ে বার্লিন। এরোফ্লোতের কলকাতা-দিল্লি ফ্লাইট। বেশ বাজে। উড়োজাহাজে কিছুই পাওয়া যায় না, সৌজন্যও নয়। দিল্লি বিমানবন্দরে নিজের পয়সায় তৃষ্ণা নিবারণ করা গেল। দিল্লি-মস্কো-বার্লিন ফ্লাইট বরঞ্চ সহনীয়।
বার্লিনে মামুন নামে এক বাংলাদেশি তরুণের বাড়িতে সন্জীদা খাতুন ও আমার থাকার ব্যবস্থা। তার স্ত্রী বা বান্ধবী এলিজাবেথ জার্মান। ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ বয়স্কা, পূর্ববিবাহের সূত্রে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়গামী এক কন্যা আছে–মেয়েটির ঝোঁক যন্ত্রসংগীতে, পরে তার সঙ্গেও একদিন দেখা হয়েছিল। গৃহকত্রী ইংরেজি খুব সামান্য জানেন, সবার সামনে তা বলতে সংকোচ বোধ করেন, তবে সর্বদা হাসিমুখ এবং আমাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়ে তীক্ষ্ণ নজর রাখেন। মামুন বেশ কিছুকাল এদেশে আছে, চাকরি করে লুটহাসায়, প্রয়োজনের অধিক সমাদর করে। মামুনরা থাকতো পূর্বতন পূর্ব বার্লিনে–পশ্চিমের চেয়ে তা খানিকটা মলিন, ভাঙা জার্মানি জোড়া লাগার পাঁচ ছ বছর পরেও সে-পার্থক্যের চিহ্ন সুস্পষ্ট।
আমরা পৌঁছবার খানিক পরে মামুন জানালো, তসলিমা নাসরিন আমার। খোঁজে ফোন করেছিল, আমি এসে তার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলি–এই। অনুরোধ জানিয়ে রেখেছে। এটা খানিকটা প্রত্যাশিত ছিল। তসলিমার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও ভালোই পরিচয় ছিল। পরিচয় হয়েছিল শামসুর রাহমানের মারফত, সাগর পাবলিশার্সে। আমার বাড়িতে ৩১ জন নাগরিকের সভা শেষ করে শামসুর রাহমানের প্রয়োজনে সেখানে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম। তসলিমা তখন শান্তিনগর বাজারের কাছে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের একটি ফ্ল্যাটে থাকে। সে খুব চাইছিল শামসুর রাহমানকে সেখানে নিয়ে যেতে। শামসুর রাহমান সেই সন্ধ্যায় তার বাড়ি যেতে চাইছিলেন না, কিছুটা হয়তো আমি তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে। পরে তসলিমার সঙ্গে আমার অনেকবার যোগাযোগ হয়েছে। আমার এক বন্ধু-দম্পতি তার সঙ্গে আলাপ করতে খুব আগ্রহী ছিল। আমার অনুরোধে তসলিমা তাদের আতিথ্যগ্রহণে সম্মত হয়, আমিই তার ফ্ল্যাট থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাই এবং ফিরিয়ে আনি। আমার বিশ্ববিদ্যালয়-আবাসে সে কয়েকবার এসেছে, একাধিকবার সবান্ধব। পরে একবার কলকাতায় আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রসঙ্গত বলেছিলাম, আমি তসলিমার কবিতা ও কলামের গুণগ্রাহী, তবে তার উপন্যাসের নই। ঢাকায় ফিরে আসতে-না-আসতে তসলিমার ফোন পেলাম–তার উপন্যাস কেন ভালো লাগে না তার কারণ দর্শাতে। ধর্মান্ধ ব্যক্তির দল যখন তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে, তখন অনেকের সঙ্গে আমিও তার লেখার ও ভাবপ্রকাশের অধিকারের সমর্থনে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছি।
বার্লিনে তসলিমাকে ফোন করায় সে জানতে চাইলে তার বিরুদ্ধে মামলা সম্পর্কে কোনো খবর আছে কি না। আমি বললাম, শামসুর রাহমান তাকে জানাতে বলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তসলিমার মামলা নিয়ে শামসুর রাহমান নিজেই কথা বলেছেন। শেখ হাসিনা তাঁকে বলেছেন, তসলিমা দেশে ফিরে মামলার মুখোমুখি হোক। সরকার তেমন জোরের সঙ্গে মামলা লড়বে না, ফলে তসলিমা ছাড়া পেয়ে যাবে। তবে সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক কারণেই তসলিমার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করা সম্ভবপর নয়।
আমার কথা শুনে তসলিমা বেশ বিমর্ষ হলো। সে আশা করেছিল, সরকার মামলা তুলে নেবে–এমন একটা প্রতিশ্রুতির খবর আমি তাকে দেবো। সে বললো, মামলা মাথায় নিয়ে সে দেশে ফিরবে না, ফিরলে যে-কোনো সময়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। যে-সরকার রাজনৈতিক কারণে মামলা তুলতে সাহস করে না, রাজনৈতিক কারণেই হয়তো সে-সরকার মত বদলে তার বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকা নিতে পারে। আমি বললাম, সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে, তবে সরকারের বৈরিতার কোনো কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না। সে বললো, সরকারের ওপর সে ভরসা রাখতে পারছে না। সুতরাং সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত সে দেশে ফিরবে না।
তসলিমাকে আমি আর কী বলতে পারি! জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার সঙ্গে কি দেখা হবে? সে বললো, ‘বোধহয় না।’ আমি তার কাছ থেকে টেলিফোনেই বিদায় নিলাম।
একদিন পর তসলিমা আবার ফোন করলো। বললো, অম্লান দত্ত তার বাড়ি যাচ্ছেন। আমি যদি একই সময়ে সেখানে যাই, সে খুশি হবে। আগের বারের কথোপকথনের শেষটা আমার মনে পড়ল। বললাম, আমি পেরে উঠব না।
বার্লিনে আর যাদের সঙ্গে পরিচয় হলো, তাঁদের মধ্যে সুনীল দাশগুপ্তের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। তখনই তাঁর বয়স হয়েছে। তিনি ভারতীয় নাগরিক, বিয়ে করেছেন জার্মান, কিন্তু জন্মভূমি বরিশালকে ভোলেননি। সেই সূত্রে বাংলাদেশের সকলের সঙ্গে তাঁর বেজায় ভাব। দীর্ঘকাল কমিউনিস্ট রাজনীতি করেছেন, এখন আর রাজনীতিতে নেই। সৈয়দ মুজতবা আলীর চাচাকাহিনীর মূল চরিত্র, শুনেছি, তাঁরই পিতৃব্যের আদলে আঁকা। সুনীলদার স্ত্রী বারবারা ভালো বাংলা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অনুবাদও করেছেন জার্মান ভাষায়।
