সারাদিনের উত্তেজিত পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। সন্ধ্যাবেলায় ঢাকা ক্লাবে গিয়ে এ-সম্পর্কে শুনতে পাই। সেখানেই টেলিভিশনে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ শুনি। বিপদের আশঙ্কায় মন ভরে ওঠে। ক্লাব থেকে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসি। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ফোনে খবরাখবর বিনিময় করি। দু একদিনের মধ্যেই অবশ্য পরিস্থিতি শান্ত হয়ে থাকে। জেনারেল নাসিম কম্যান্ড ছেড়ে দিতে সম্মত হন। তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। জেনারেল মাহবুবুর রহমান নতুন সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই ঘটনা নিয়ে দশগুণ বলার দায়িত্ব নেয় যায়যায়দিন। পত্রিকাটি নানারকম তথ্য প্রকাশ করে–সবই তাদের আবিষ্কার। এর আগে পত্রিকাটি প্রধান উপদেষ্টার ডায়েরির অংশ বলে কিছু একটা মুদ্রণ করেছিল। তাতে কী ছিল, তা আমার জানা নেই, তবে সরকারিভাবে বলা হয়েছিল যে, ওটি প্রধান উপদেষ্টার ডায়েরি নয়। এবারে তারা কোনো কোনো সামরিক কর্মকর্তার টেলিফোন সংলাপ এবং আরও কিছু কিছু দলিল প্রকাশ করে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করলো। যে, সমস্ত ব্যাপারটি ছিল আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের ফল–সেনা-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় আসার ব্যর্থ প্রচেষ্টা মাত্র। পত্রিকায় এসব তথ্যপ্রকাশে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়, তবে পরে এর সত্যতায় সন্দেহ ঘনীভূত হয়। যাহোক, পরবর্তীকালে গৃহবন্দিদশা থেকে নাসিমকে মুক্তি দেওয়া হয়, সেই সঙ্গে আরও কয়েকজন সেনা-কর্মকর্তা মুক্ত হন। অবশ্য এসবই ঘটে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে।
১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এই সংসদ ষষ্ঠ না সপ্তম, তা নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করলেন না, আগের সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করলেন না, তাদের তৈরি আইন মেনে নিতেও কুণ্ঠাবোধ করলেন না। আমি ভোট দিয়ে চলে যাই কুমিল্লায়–পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর নিভৃতে নিজের কাজ করতে। সেখানে বসেই টেলিভিশনে নির্বাচনের ফলাফল জানতে পারি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কোথাও কোথাও অনিয়ম হয়েছে বলে আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে, বিএনপি দাবি করে যে প্রায় এক শ আসনে কারচুপি হয়েছে, বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা বলেন যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।
বিএনপি বোরকম প্রতিবাদের পরিকল্পনা করেছিল–পরবর্তীকালে আমাকে তা জানিয়েছিলেন একজন হাই কমিশনার ও একজন অ্যামবাসাডর। তাঁদের দুজনের ভাষ্য ছিল হুবহু এক। আমার কাছে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদার কোনো কারণ তাদের ছিল না। তারা বলেন যে, তাঁরা খবর পেয়েছিলেন, ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়া নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করতে যাচ্ছেন। তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সারা দেশে, বিশেষ করে রাজধানীতে, ব্যাপক গোলযোগের সৃষ্টি হবে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি কোনো চরম ব্যবস্থা নিয়ে ফেলবেন। এই খবর জানার পরে ব্রিটিশ হাই কমিশনারের অফিসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের রাষ্ট্রদূত এবং কানাডার হাই কমিশনার মিলিত হন। এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বেগম জিয়াকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতে সিদ্ধান্ত নেন। ব্রিটিশ হাই কমিশনারের দপ্তর থেকে ফোনে বেগম জিয়ার সঙ্গে ওই পাঁচজন দেখা করবেন বলে সময় চাওয়া হয়, কিন্তু তাদের বলা হয় যে, তিনি ব্যস্ত আছেন, পরদিন রাতে ছাড়া দেখা করতে পারবেন না। পরদিন বিকেলেই ছিল পরিকল্পিত সংবাদ-সম্মেলনের সময়। উপায়ান্তরবিহীন হয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান যে, তিনি তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি জরুরি বার্তা বেগম জিয়াকে পৌঁছাতে চান এবং তাঁর সঙ্গে দুজন রাষ্ট্রদূত ও দুজন হাই কমিশনার থাকবেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সময় দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে ওঁরা পাঁচজন খালেদা জিয়ার সামনে উপস্থিত হলে তিনি বিরক্ত হয়ে বাংলায় বলেন, এরা কেন এসেছে? এরা কিছু জানে না, বোঝে না, শুধু শুধু মাতব্বরি করতে চায়। বেগম জিয়ার দোভাষী ইংরেজিতে বলেন, আপনারা আসায় ম্যাডাম অত্যন্ত খুশি হয়েছেন এবং তিনি আপনাদের আন্তরিক স্বাগত জানাচ্ছেন। জাপানি রাষ্ট্রদূত বাংলা জানতেন, ফরাসি রাষ্ট্রদূত জানতেন জাপানি। ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে জাপানি রাষ্ট্রদূত খালেদা জিয়ার মন্তব্য তখনই জাপানিতে অনুবাদ করে শোনান। অনেকক্ষণ ধরে এই পাঁচজন কূটনীতিক বেগম জিয়াকে নির্বাচনের ফলাফল
মেনে নিতে অনুরোধ করেন, নইলে বাংলাদেশ নতুন করে সংকটে পড়বে বলেও তাঁরা সতর্ক করে দেন। বেগম জিয়া তাদের কথায় আনুষ্ঠানিক সম্মতি না জানালেও একসময়ে তারা উপলব্ধি করেন যে, তিনি নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করবেন না। তারা তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে আসেন।
৪১.
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার জুন মাসের শেষে–সম্ভবত তাদের শেষ কার্যদিবসে–জাহানারা ইমাম ও অপর ২৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। সংবাদপত্রে পড়ার আগে এ বিষয়ে আমি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারিনি। ফৌজদারি অভিযোগ মাথায় নিয়ে চলা যে কী দায়, ততদিনে তা বেশ বুঝতে পেরেছি। সুতরাং প্রধান উপদেষ্টার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা বোধ করেছি। সঙ্গে সঙ্গে জেনে গেছি, সকলে এটা ভালোভাবে নেয়নি; কেউ কেউ মনে করেছেন, এতে তার ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক পক্ষপাত প্রকাশ পেয়েছে, হয়তো বা দুইই।
