১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমিকে আনন্দ পুরস্কার প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার গ্রহণ সংগত হবে না বিবেচনা করে একাডেমি সে-প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। সে-বছর তসলিমা নাসরিন (সুরেশচন্দ্র-স্মৃতি) আনন্দ পুরস্কার পায়। সেই প্রথম বাংলাদেশের কোনো সাহিত্যিক আনন্দ পুরস্কার পেল। ১৯৯৪ সালে প্রবন্ধসমগ্র গ্রন্থের জন্যে অন্নদাশঙ্কর রায় পান (সুরেশচন্দ্র-স্মৃতি) আনন্দ পুরস্কার, আকাশ আসবে নেমে কাব্যের জন্যে শামসুর রাহমান পান (প্রফুল্লকুমার-স্মৃতি) আনন্দ পুরস্কার, সেই সঙ্গে ‘ঐতিহ্যের অঙ্গীকারের জন্যে আমরা দুজনও পুরস্কৃত হই।
পুরস্কার নিতে শামসুর রাহমান, নরেন ও আমি সস্ত্রীক কলকাতায় যাই। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল চৌরঙ্গীর পিয়ারলেস ইনে। শামসুর রাহমানের কাছে অগুনতি অনুরাগী ও সাহিত্যিকের আনাগোনা। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বেহিসেবি পান করে শামসুর রাহমানকে বিব্রত করেছিলেন, কেননা বিলটা তাঁকেই সই করতে হয়েছিল। নরেনের এক ভাই কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা, আরো কিছু আত্মীয়স্বজন সেখানে আছেন। সুতরাং তার কাছেও ভিড় কম হয়নি।
পুরস্কার-প্রদান অনুষ্ঠানটিকে উদযোক্তারা অভিহিত করেন সাহিত্য-সমাবেশ বলে। এটি গ্র্যান্ড হোটেলের বলরুমে অনুষ্ঠিত হয়। সেবারের অনুষ্ঠানটির তারিখ ছিল ৩০ এপ্রিল ১৯৯৪। প্রধান অতিথি শিবনারায়ণ রায়ের হাত থেকে আমরা পুরস্কার গ্রহণ করি। শংসাবচন পাঠ করেন সাগরময় ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ঐতিহ্যের অঙ্গীকারে পরিবেশিত ‘শ্রুতি সংস্কৃতির উপদেশনার জন্য আমাকে এবং সমগ্র প্রকল্পের নির্বাহী নায়ক’ হিসেবে বাংলাভাষী মানুষের হাতে এমন একটি ঐতিহ্যময়, অথচ আধুনিক সাংস্কৃতিক উপহার তুলে দেওয়ার জন্য নরেনকে সম্মানিত করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়।
অপরিসীম আনন্দের মধ্যেও আমার জন্যে দুঃখের বিষয় ছিল যে, অসুস্থতার কারণে গৌরকিশোর ঘোষ এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেননি। বস্তুতপক্ষে সেই যে তিনি অসুস্থ হলেন, ২০০০ সালে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আর সুস্থ হননি। তবে তারই মতো আরেকজন শুভাকাঙ্ক্ষী আমি পেয়ে যাই। তিনি নিখিল সরকার। আমার মনে হয়, নিখিল সরকারের দৌত্যেই বোধহয় ১৯৯৬ থেকে আমি আনন্দ পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীর একজন সদস্য নির্বাচিত হই।
বিচারকমণ্ডলীর প্রথম সভায় আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা উপন্যাসটি বিবেচনার জন্যে প্রস্তাব করি এবং সর্বসম্মতিক্রমে বইটিকে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ইলিয়াস তখন কলকাতার এক ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। সে ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং দু-একদিনের মধ্যেই অস্ত্রোপচার করে তার একটি পা কেটে ফেলতে হবে। বিচারকমণ্ডলীর সভা থেকে বেরিয়েই আমি ক্লিনিকে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলি। পুরস্কারগ্রহণের বিষয়ে ইলিয়াস দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। পুরস্কারলাভের সংবাদে সে প্রীত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর পুরস্কারগ্রহণ তার বামপন্থী ভাবমূর্তির সঙ্গে আদৌ সংগতিপূর্ণ হবে কি না, এ-বিষয়ে সে চিন্তিত ছিল। আমি বলি, এই পুরস্কারের সঙ্গে কোনো রাজনীতি জড়িত নেই, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো রাজনীতিমনস্ক সাহিত্যিকও এই পুরস্কার গ্রহণ করেছেন, তাছাড়া তার চিকিৎসার ব্যয়নির্বাহে পুরস্কারের অর্থ কাজে আসবে, এটাও সে বিবেচনা করতে পারে। ইলিয়াস শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়। প্রশ্নের মুখে পরে সে কোথাও বলেও ছিল যে, আমার অনুরোধেই সে এটি গ্রহণ করে। এই উত্তর পুরস্কারদাতাদের জন্যে আনন্দদায়ক ছিল না। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতার তৃণমূল পত্রিকায় ইলিয়াসের ডায়েরির যে অংশ ছাপা হয়, তাতেও এমন কথা আছে। পুরস্কারলাভের পর ইলিয়াস এক বছরও বাঁচেনি।
‘ঐতিহ্যের অঙ্গীকারে’র আরো কয়েকটি ক্যাসেট প্রকাশ করে নরেন। বিশ্বাসেরও মৃত্যু হয় ১৯৯৮ সালে। তার মৃত্যুকালে নাটকের দুটি ক্যাসেট প্রক্রিয়াধীন ছিল–সে দুটি প্রকাশ করা যায়নি। অবশ্য তার আগে থেকেই আমি তাকে বলছিলাম যে, আমাদের প্রকল্পের পূর্ণতি টানা দরকার, কেননা ভালো কিছুরও শেষ আছে। কাকতালীয়ভাবে নিখিল সরকারও তা মনে করেছিলেন।
পরে আনন্দ পুরস্কার তিনটি মিলে একটি হয়ে যায়। তার প্রথম প্রাপক ছিল তসলিমা নাসরিন। সেটি তার পক্ষে ছিল দ্বিতীয়বার আনন্দ পুরস্কার পাওয়া।
৩৯.
ঠাটারিবাজারে পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করে ১৯৮০ সালে আমার ভাগে যে-টাকা পেয়েছিলাম, তা দিয়ে রামপুরায় জমি কিনে একটা ছোটো বাড়ি বানিয়ে দেন বড়ো দুলাভাই। সেখানে আমার তিন বোন এবং মামাতো ভাই ও ফুফাতো ভাই পরস্পরসংলগ্ন জমি কিনেছিলেন। ফুফাতো ভাই তাঁর অংশ বিক্রি করতে চাওয়ায় সেটি আমার জন্যে কেনা হয়। ওই বাড়িতে আমার সত্য ও সৎ বোনেরা এবং মায়ের পক্ষের ছেলে বাস করতো। পরে আমার এই ভাইবোনদের বিয়ে হয়ে গেলে আম্মা তার ছেলের সঙ্গে থাকবেন বলে স্থির হয়। বড়োবু বাড়িটা বিক্রি করার আয়োজন করে যাতে আমি অন্যত্র নিজের মতো মাথা গোঁজার ঠাই। করে নিতে পারি। আমার মামাতো ভাই তার জমি বিক্রি করে দেন। একই জনের কাছে বড়োবুর জমি ও আমার বাড়ি বিক্রি করা হয়।
