শিকাগো থেকে ফিরে আমার প্রকৃতপক্ষে ছুটি। দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়া। গ্রীষ্মবকাশ শুরু হয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। টোনি তার ছাত্রছাত্রীদের খাওয়াবার আয়োজন করেছে বাড়িতে। সেইসঙ্গে আমাকেও ডেকেছে। পার্টি শেষ না হতেই জুলি বিদায় নিলো। টোনি আমাকে বললো, প্রিয়া কামদার নামে। একটি ভারতীয় মেয়ে তোমাকে ঘরে পৌঁছে দেবে।
গাড়িতে আসতে আসতেই প্রিয়ার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গেল। নামার সময়ে আমি বললাম, চলো, একদিন ডিনার খাই একসঙ্গে। সে বললো, যখনই তোমার সুবিধে হয়।
এক সন্ধ্যায় সে এলো আমাকে নিতে। তারপর তার পছন্দসই একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম বেশ খানিকটা দূরে। আমাকে আবার যখন সে পৌঁছোতে এলো, তখন সে ঘরে আসবে কি না জিজ্ঞেস করতেই সে নেমে এলো এবং দরজা খুলতেই সটান আমার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি বিছানার ধারে একটা চেয়ার টেনে এনে বসলাম এবং দুজনে গল্প করতে থাকলাম। তার মধ্যে। বেশির ভাগই তার নিজের এবং তার পরিবারের কথা।
খানিক বাদে সে উঠে পড়ল এবং বিদায় জানিয়ে চলে গেল। বছরখানেক পরে তার বিয়ের আমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলাম। তাতে দেওয়া বোম্বাইয়ের ঠিকানায় তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু তার প্রাপ্তিস্বীকার পাইনি।
পরে টোনির কাছে তার খোঁজ করেছিলাম। টোনি তাকে ভালো মনে করতে পারলো না। না, সে তার কোনো খবর জানে না, তার বিয়ের কথাও জানে না।
রলে ছাড়ার আগে আমারও কর্তব্য সবাইকে আপ্যায়ন করা। কোথায় করবো? অ্যাভেন্ট ফেরি কমপ্লেসে তেমন কোনো জায়গা নেই। টোনি বললো, আমার বাড়িতেই পার্টিটা দাও। তুমি বাজার করে দিও, আমি রাঁধবো। বললাম, জুলির ওপর অত্যাচার হবে। টোনি বললো, তার সয়ে গেছে।
তাই হলো। টোনি খুব ভালো বিফস্টেক তৈরি করেছিল। জুলিও ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করেছিল। সবাই খুব উপভোগ করেছিল।
জুডি আসতে পারেনি। টোনির সঙ্গে তার বাড়িতে গিয়ে কয়েকটা গিফ্ট ভাউচার দিয়ে এলাম।
আসার আগে আমার বাঁধাবাঁধিতে অনেকে সাহায্য করলো–তার মধ্যে আশফাঁক ও মাহবুব ছিল। ওদেরকে কিছু খাদ্য ও অন্য সামগ্রী দিয়ে এলাম। সবশেষে ওস্তাদের মারের মতো হাত লাগালে টোনি। তারপর বিমানবন্দরে তুলে দিলো আমাকে। আবার লন্ডনে একদিন থেমে ঢাকায় ফিরলাম।
জুলির সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি। আমি চলে আসার অল্পকাল পরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়।
৩৮.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের উদ্যোগে ১৯৬৩ সালে আমরা যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সপ্তাহ উদযাপন করেছিলাম, তা বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। বিশেষ করে হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের নির্বাচিত অংশের পাঠ, অভিনয় ও গান সকলে খুব উপভোগ করেছিলেন। বেতারে-টেলিভিশনে তখনই এর খানিকটা স্বতন্ত্রভাবে প্রচারিত হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে নানা বিদ্যায়তনে এবং সাধারণ মঞ্চে হাজার বছরের বাংলা কবিতা বা গানের অনুষ্ঠান করার একটা ঝোঁক দেখা দিয়েছিল।
১৯৬৩ সালে নরেন বিশ্বাস ছিল আমাদের ছাত্র এবং পূর্বোক্ত অনুষ্ঠানের এক সফল অংশগ্রহণকারী। পুরো আয়োজনটা তার মনে গভীর রেখাপাত করে এবং সেও নানা সময়ে ওই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আশির দশকের শেষে নরেন স্থির করে যে, হাজার বছরের বাংলা কবিতা ও গান, গদ্য ও নাটকের অডিও ক্যাসেটের একটা সিরিজ প্রকাশ করবে ‘ঐতিহ্যের অঙ্গীকার’ নাম দিয়ে। এই পরিকল্পনায় সে আমাকে যুক্ত করে উপদেষ্টা হিসেবে। ‘ঐতিহ্যের অঙ্গীকার’ নামটি আমার পছন্দ ছিল না, কিন্তু ওই নামের প্রতি নরেনের দুর্বলতা ছিল এবং সে নামটি প্রচারও করে ফেলেছিল, সুতরাং তা মেনে নিতে হয়। আমার কাজ ছিল রচনা নির্বাচন করা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুখবন্ধস্বরূপ কিছু বলা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নরেনের নির্বন্ধাতিশয্যে পাঠ করা। প্রথমে গোলাম মোর্শেদ ও আজিজুল হক চৌধুরী মানিক আর্থিক সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন, পরে এই কাজের অংশীদার হন ড. নারায়ণ বিশ্বাস ও ড. আখতার বানু। নরেন নির্দেশনা দেয়, আশরাফুল আলম আগাগোড়া গ্রন্থনার কাজটি করেন। দেশের বিশিষ্ট শিল্পী ও শিক্ষকেরা এতে অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত বোধহয় ১৪টি ক্যাসেট প্রকাশ পেয়েছিল।
১৯৯৩ সালে কলকাতায় গৌরকিশোর ঘোষ একদিন আমার কাছে। ‘ঐতিহ্যের অঙ্গীকার’ সম্বন্ধে জানতে চান এবং এর কয়েকটি সেট কিনে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। তখন পর্যন্ত বোধহয় আটটি ক্যাসেট বের হয়েছিল। পরেরবার আমি যখন কলকাতায় যাই, তখন তাঁকে কয়েকটি সেট উপহারস্বরূপ দিয়ে আসি। অচিরেই বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে পাই যে, আমাদের এই প্রয়াস আনন্দ পুরস্কার লাভ করতে যাচ্ছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠী আনন্দ পুরস্কার প্রবর্তন করেন ১৯৫৮ সালে। তখন আনন্দবাজার পত্রিকার লোকান্তরিত সম্পাদক প্রফুল্লকুমার সরকার এবং এই গোষ্ঠীর পত্রিকাসমূহের সূচনাকারী ও বাংলায় লাইনো হরফের প্রবর্তক সুরেশচন্দ্র মজুমদারের স্মৃতিযুক্ত দুটি পুরস্কার প্রদানের উদযোগ নেওয়া হয়। পুরস্কার-দুটির প্রথম প্রাপক ছিলেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় ও সমরেশ বসু। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে মননশীল সাহিত্যের জন্যেও এই পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কারের উদ্যোক্তা আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক অশোককুমার সরকারের মৃত্যুর পর ১৯৮৪ সালে তাঁর স্মৃতিযুক্ত তৃতীয় একটি আনন্দ পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা হয়। এই পুরস্কারের প্রথম প্রাপক ছিলেন সুকুমার সেন, সাগরময় ঘোষ ও বিমল মিত্র। পরে উইলিয়ম রাদিচে, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, অমিতাভ ঘোষ ও ক্লিনটন বি সিলি এই পুরস্কার পান। ১৯৯৪ সালে নরেন ও আমাকে যুক্তভাবে অশোককুমার-স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
