এই অবস্থায় আমার ভাগ্নে তৌহিদ একদিন বেবীকে নিয়ে যায় বনানীতে একটি নির্মীয়মাণ বাড়ির ফ্ল্যাট দেখাতে। বেবী ফ্ল্যাটটি ভালো বলায় তৌহিদ নিজে থেকে একটি চেক লিখে ফ্ল্যাটটি বেবীর নামে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। তখনো রামপুরার বাড়ি বিক্রি হয়নি। ফ্ল্যাটের কিস্তি দিতে আমাকে ধার করতে হয়। আমাকে প্রথম ধার দিয়েছিল আমার মামাতো বোন হালিমা, তারপর ভায়রা হাসান। তারপর অন্য বন্ধুবান্ধব। পরে সকলের টাকা পরিশোধ করেছিলাম একজনেরটা ছাড়া। সে টাকা ফেরত নেয়নি।
১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রূপসা টাওয়ারের ফ্ল্যাটের দখল পাওয়া যায়। ফ্ল্যাটটি ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করে আমি নর্থ ক্যারোলাইনা চলে যাই।
নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে আমার ফিরে আসার পর ছোটোমেয়ে শুচির বিয়ের তোড়জোড় লেগে গেল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসে আমাদের পাশের ফ্ল্যাটেই বাস করতেন আমার শিক্ষক শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পরিবার। এই পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান তাসনিম হায়দার চৌধুরী ওরফে সুমন কালক্রমে অর্থনীতিতে এম এ পাশ করে। তার সঙ্গে শুচির মেলামেশার একটা সহজ ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে ভাবির অর্থাৎ সুমনের মায়ের মৃত্যুর পরে ও-বাড়িতে শুচির যাতায়াত বেড়ে যায়। শুচি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিল লোকপ্রশাসনে প্রথমে অনার্স ও পরে এম এ ক্লাসে। একসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসস্থানে শহীদ পরিবারের থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সুমনেরা দু ভাই গুলশানে তাদের পৈতৃক বাড়িতে উঠে আসে। আমার পিতৃবন্ধু সৈয়দ আজিজুল হক ওরফে নান্না মিয়া ছিলেন ভাবির মামা অর্থাৎ সুমনের নানা। তাঁর স্ত্রী বেগম আফিফা হক একদিন ফোন করে আমার কাছে জানতে চান শুচির বিয়ের বিষয়ে কিছু ভাবছি। কি না। আমি তাকে বলি, শুচির এম এ পরীক্ষাটা হয়ে গেলে এ-বিষয়ে ভাবা যাবে। যথাসময়ে তিনি আবার আমাকে ফোন করেন এবং তাঁর বড়ো ছেলে সৈয়দ মঈনুল হককে পাঠান সুমনের সঙ্গে শুচির বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। মঈনু আমার অনুজপ্রতিম। তার সঙ্গে বিয়ের আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলার জন্যে আমার চতুর্থ ভায়রা ফজলে রাব্বি মোহাম্মদ হাসানকে অনুরোধ করে আমি ঘর থেকে উঠে যেতে চাই। মঈনু বাধা দিয়ে বলে, আপনার উঠে যাওয়ার দরকার নেই, কেননা আম্মা বলেছেন, আপনার মেয়ে, আপনি যে-শর্ত চাইবেন, সেই শর্তেই তার বিয়ে হবে। আমি এমন উদারতা আর কখনো দেখিনি।
১৯৯৫ সালের ২৫ আগস্ট শুচির বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল। রুচির মতো শুচির বিয়ের আসরও নির্ধারিত হয় নিউ ইস্কাটন রোডের সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারে। এ-বিয়েতেও চট্টগ্রাম থেকে আমার অনেক সহকর্মী এবং এ এফ রহমান হলের চতুর্থ শ্রেণির কয়েকজন কর্মী যোগ দিতে এসেছিলেন। এবারে মোহাম্মদ আলী না-থাকায় রান্নাবান্না তত্ত্বাবধানের ভার পড়েছিল আমার ভায়রা হাসানের ওপর। আয়োজন ভালোই হয়েছিল, তবে যতজন অতিথি ছিলেন, ততজনের খাওয়ার জন্যে মাশুল দেওয়া হয়নি। ফলে মাশুল ও জরিমানা ধার্য হয়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য জরিমানা দিতে হয়নি, অতিরিক্ত মাশুল দিয়েই পার পেয়েছিলাম। সেই সময়ে আমার হাত একেবারে খালি। এই টাকাটা আমাকে ধার করতে হয়েছিল ড. কামাল হোসেনের কাছ থেকে। তিনি অবশ্য পরে টাকা ফেরত নেননি আমার অনুরোধ সত্ত্বেও।
ছেলেমেয়ে নিয়ে রুচি অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরত এসেছিল ১৯৯৪ সালেই। রায়হান রয়ে গিয়েছিল, তবে শুচির বিয়ের ঠিক আগে আগেই সেও চলে আসে। উপস্থিতির দিক থেকে তাই পারিবারিকভাবে কোনো অপূর্ণতা থাকেনি।
৪০.
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলের আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠেছে। একাদিক্রমে ৩৬ ঘণ্টা কী তারও বেশি সময় ধরে হরতাল চলছে–জনজীবন বিপর্যস্ত। সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা ফেব্রুয়ারি মাসে। জানুয়ারি মাসেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বিরোধী দলীয় প্রার্থীরা। মাঠে রয়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, গুরুত্বহীন রাজনৈতিক দলের কিছু প্রার্থী, কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। প্রধানমন্ত্রী যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই বিক্ষোভ হচ্ছে, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘাত ঘটছে। এরই মধ্যে, ১ ফেব্রুয়ারি একুশের বইমেলা উদ্বোধন করতে খালেদা জিয়া বাংলা একাডেমিতে আসবেন বলে ঘোষিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়-এলাকায়। প্রধানমন্ত্রীর আগমনের প্রতিবাদে ছাত্রেরা প্রবল বিক্ষোভ করে। এতে সরকারের রোষ ধাবিত হয় মূলত জগন্নাথ হলের আবাসিক ছাত্রদের প্রতি। ওই হলে প্রবেশ করে পুলিশ দরজা-জানালা-আসবাবপত্র ভাঙে, ছাত্রদের প্রহার করে, তাদের বইখাতা নষ্ট করে, অনেককে ধরে নিয়ে যায়। ঘটনার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকেই জগন্নাথ হলের অবস্থা নিজের চোখে দেখতে যাই। যা দেখি এবং ছাত্রদের মুখ থেকে যা শুনি তাতে আমরা প্রত্যেকেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ফিরে আসি। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আমরা এই ঘটনার প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিই। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে। মিছিল করে আমরা বাংলা একাডেমির দিকে যেতে চাই ১ ফেব্রুয়ারিতে। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছোতেই পুলিশ আমাদের গতিরোধ করে। আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানেই রাস্তার ওপরে বসে পড়ি। তাতে কোনো কাজ হয় না। আমরা বসে, পুলিশ দাঁড়িয়ে–এমন সহাবস্থান। অনেকক্ষণ চলে। শেষ পর্যন্ত আমরা রণে ভঙ্গ দিয়ে কলাভবনে ফিরে আসি। পরে আমরা নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করি বইমেলা-উপলক্ষে আয়োজিত সাহিত্যসভা বর্জন করে।
