রলে থেকে অদূরে এলিজাবেথ সিটিতে অধ্যাপনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পূর্বতন শিক্ষক ড. আবদুল লতিফ চৌধুরী, আর আমার পূর্বপরিচিত ড. আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী। তারা একদিন রলেতে এলেন এবং একসঙ্গে আড্ডা দিয়ে–খেয়েদেয়ে দিনটা কাটালেন। আশরাফুলের আত্মীয়েরা আছেন রলেতে, সেইসূত্রে পরিচিতদের গণ্ডি আরো বাড়লো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৫ মার্চে বাংলাদেশ সমিতি আয়োজন করলো অনুষ্ঠানের। অনিবার্যভাবে আমি সেখানে একজন বক্তা।
রলেতে আমার কাজ হালকা। এখানে একটা বক্তৃতা দিতে হবে মাত্র। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গোটা দুই-তিন বক্তৃতা, গোটা দুই সম্মেলনে যোগদান। নিজের মতো পড়াশোনা করাই আসল। এখানে বক্তৃতার জন্যে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের প্রাথমিক পর্ব সম্পর্কে গবেষণায় লেগে গেলাম।
এপ্রিল মাসে আমার কর্মসূচি দীর্ঘ। প্রথমে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ায় একটা বক্তৃতা–বাংলা সাহিত্যে নারী-বিষয়ে। সেখানকার বাংলা শিক্ষক ক্যারল সলোমন এর আয়োজক। তাছাড়া ক্যারল, টোনি ও আমি একটা সিম্পোজিয়ম করলাম একসঙ্গে। ক্যারলের কথা আগে জানতাম–লালনগীতির একনিষ্ঠ চর্চাকারী। এই প্রথম দেখা। সেইসঙ্গে পরিচয় হলো তার ছাত্রী সুফিয়া উদ্দীনের সঙ্গে। সুফিয়ার বাবা বাঙালি, মা পোর্টোরিকান, স্বামী মার্কিন ইহুদি। সে মূলত আরবি পড়ে। বাড়িতে সিলেটি উপভাষা শিখেছে, এখন ক্যারলের কাছে প্রমিত বাংলা শিখছে। আমার ভারী সুটকেস টানাটানির কাজ সে-ই করলো। তারপর এক দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়ালো–টোনি, ক্যারল, আমি আর তার স্বামী সেখানে অতিথি। ইউ অফ পেনে দেখা হলো দীনার সঙ্গে–অধ্যাপক হাফিজ জি এ সিদ্দিকী ও নাজমা সিদ্দিকীর কন্যা। অতএব তার ও ডেভিডের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হলো ক্যারল, টোনি ও আমাকে।
ফিলাডেলফিয়া থেকে নেওয়ার্কে গেলাম একটা ছোটো প্লেনে। নজন বা দশজন যাত্রীর আসন, একজন ক্যাপ্টেন, একজন ক্রু। খুব নিচে দিয়ে যায় আর হরদম লাফায়। বেশ অস্বস্তিকর যাত্রা। নেওয়ার্কে নেমে এক যাত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই বিমান কি সবসময়ে এমনই করে? তিনি বললেন, বলতে পারি না। এই আমার প্রথম যাত্রা, আশা করি, এই শেষ যাত্রাও।
নেওয়ার্কে এলাম আমার ছোটো শ্যালিকা সিমীনের পরিবারের সঙ্গে নিউ জার্সিতে দুদিন কাটাতে। মোবারক আমাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে পরে নিউ ইয়র্কে পৌঁছে দিলো। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা-ইউ অফ পেনে যেটা দিয়েছিলাম, সেটারই পুনরাবৃত্তি। আগের সন্ধ্যায় জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও পূরবী বসু খাওয়ালো, পরের সন্ধ্যায় আবুল মাল আবদুল মুহিত ও সাবিয়া। মুহিত।
এবারে এলাম ওয়াশিংটন ডি সিতে। সেখানে অ্যাসোসিয়েশন অফ এশিয়ান স্টাডিজের বার্ষিক সম্মেলন। প্রথমে উঠলাম ইকবাল বাহার চৌধুরীর বাড়িতে, পরে নির্ধারিত হোটেলে–বাড়িতে খাইয়ে সেখানে পৌঁছে দিলেন ওয়ালিউল্লাহ। ও মাসুমা ফাহমী। সম্মেলন চললো দুদিন ধরে। এখানে দেখা হলো ক্যারলের ইতিহাসবিদ স্বামী রিচার্ডের সঙ্গে। গেইল মিনোর সঙ্গে দেখা হলো অনেকদিন পরে-সম্মেলন ফাঁকি দিয়ে বাইরে বসে গল্প করে আমরা বিকেলটা পার করলাম। আর দেখা হলো কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শিক্ষক, আমার বন্ধু, শেলি ফেল্ডম্যানের সঙ্গে। সম্মেলনের মধ্যেই এক সন্ধ্যায় গেলাম ভাইপো চন্দনের বাড়িতে।
ওয়াশিংটনে দেখা আবদুন নূরের সঙ্গে। কথাসাহিত্যিক এবং বিশ্বব্যাংকের গ্রন্থাগারিক। তাঁকে বললাম, রাজ্জাক সাহেবের জন্যে বিশ্বব্যাংকের কিছু প্রকাশনা কিনতে চাই। তিনি বললেন, আমাকে লিস্ট পাঠিয়ে দেবেন–আমি অনেক ডিসকাউন্টে কিনতে পারবো।’ শুধু তাই নয়, বইগুলো তিনি ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের অফিসে পাঠিয়ে দেওয়ার ভারও নিলেন। লন্ডনে এবং রলেতে সারের জন্যে যেসব বই কিনেছিলাম, সেগুলোও তাকে পাঠিয়ে দিলাম ডাকযোগে। সবসুদ্ধ তিনি পাঠালেন ঢাকা অফিসে। সেখানে সাহানা ইকবালের কাছ থেকে পরে সেগুলো বুঝে পেয়েছিলাম। আরো পরে জেনেছিলাম, এই সাহানা হলো লেখক ও শিল্পী সৈয়দ ইকবালের স্ত্রী।
এপ্রিল মাসের ২০-২২শে ডিউকে একটা বড়ো সেমিনারের আয়োজন হলো তিন দিন ধরে। সেখানে আমাকে বক্তৃতাটা দিতে হবে। নিজে কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারছি না–টোনিকে ধরে জুডিকে দিয়ে বক্তৃতা টাইপ করালাম। সেমিনারের আগেই টোনির জ্বর–সে যেতে পারছে না। ডেভিড নিয়ে গেল আমাকে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বক্তৃতা শেষ করতে পারলাম না। বাড়তি সময়ে বক্তৃতা দ্রুত পড়ে গেলাম–কেউ বুঝতে পারলো কি না সন্দেহ।
মাসের শেষে শিকাগোয়। সেখানে বেঙ্গল স্টাডিজ কনফারেন্স। জিল্লুর রহমান খান তার আয়োজক। রশীদুজ্জামানও এসেছে সেখানে। বঙ্গদেশ নিয়ে কাজ করে, এমন বিদ্বান অনেকেই এসেছেন। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে মুখেই কিছু বললাম। অনেক পরে এক মার্কিন বিদ্বজ্জন আমাকে বলেছিল, আমার সেই বক্তৃতা থেকেই সে তার গবেষণার বিষয়ের সন্ধান পায়।
শিকাগোর খানিকটা দূরে বোলিংব্রুকে আমার বন্ধু আবদুল আলীর ভ্রাতুস্পুত্র মিল্টন থাকে সপরিবারে। সপরিবারে বললে ঠিক হয় না, সগোত্রে বললেই যথার্থ হয়। তার স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও বাপ-মা আছেন সেখানে। অবকাশে অনুজ টিটো গেছে তার কাছে। আমার বন্ধু মোহাম্মদ আলী ও বুড়ীও সেখানে গেছে। বেড়াতে। অতএব আমাকে যেতেই হবে। ইন্টারন্যাশনাল হাউজ থেকে আমাকে নিয়ে গেলেন আলা ভাই ও মিল্টন। এর মধ্যে মিল্টনের চাচাতো ভাই মাইকেল তার মার্কিন স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে হাজির। মিল্টনের বাড়িটা বড়ো–তার মধ্যেও এতজনের জায়গা কী করে হলো, সে এক বিস্ময়! তার স্ত্রী নিলির অসীম ধৈর্য আর বানু ভাবির স্বাভাবিক নৈপুণ্য!
