লন্ডনে থামবার সুযোগ আমি সচরাচর ছাড়ি না। এবারে বিশেষ উৎসাহ জোগালেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বইয়ের দুটি তালিকা ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। তালিকাভুক্ত বইগুলি তার জন্যে যথাক্রমে ইংল্যান্ড ও আমেরিকা থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে লন্ডন পৌঁছোলাম। এবারে বোধহয় নাজমুল হকের বাড়িতে উঠি, পরে সিরাজুর রহমানের বাড়িতে বদলি হই। এর মধ্যে আবুল খায়ের লিটু লন্ডনে এসে উপস্থিত। পিকাডেলির কাছে এক রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করে সে জানতে চাইলো, ‘মাইজা আব্বা আমাকে বই আনতে দিয়েছেন কি না। আমি হাঁ বলায় সে বললো, ‘উনি নিশ্চয় আপনাকে কোনো টাকা-পয়সা দেননি।’ বললাম, ‘সে পরে দেখা যাবে। লিটু আমার হাতে তিন শ পাউন্ড ধরিয়ে দিয়ে বললো, রাজ্জাক সাহেবের পছন্দের বইয়ের দাম বেশি হওয়ারই কথা–এই টাকায় যা হয়, আমি যেন তাই কিনি, নিজের থেকে যেন খরচ না করি।
লন্ডনে সারের জন্যে বই খুঁজতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। অল্প যে-কটি বই কিনেছিলাম, তাতে দেড় শ পাউন্ডের অধিক খরচ হয়ে গিয়েছিল। সিপরি ইয়ারবুকের দামই ছিল পঞ্চাশ পাউন্ড। গোটা চারেক অ্যাটলাস কিনেছিলাম–প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক ও সাম্প্রতিক কালের। আরব ইতিহাসবিদদের সম্পর্কে একটি বই ছিল, একটি ছিল যান্ত্রিক উদ্ভাবন সম্পর্কে, আরেকটি ছিল ইংরেজদের খাদ্য বিষয়ে। এসব বই বাক্সবন্দি করে আমেরিকায় নিতে হবে, তারপরে ফেরার সময়ে দেশে। তালিকার বেশ কিছু বই ছাপা ছিল না। ভাগ্যিস ছিল না।
সিরাজুর রহমানের বাড়ি থেকে ট্যাকসিতে ভিক্টোরিয়া। সেখানে চেক-ইন করে ট্রেনে করে গ্যাটউইক। সেখান থেকে বিমানে করে রলে। যাত্রার শেষদিকে শরীরটা খারাপ লাগছিল–মাথা ঘুরছিল কেন জানি না। স্টুয়ার্ডকে বলতে সে সামনের কেবিনে নিয়ে বসালো। তাতে বিশেষ লাভ হলো না। খাওয়ার সময়ে আমি আর কিছু মুখে দিলাম না।
বিমানবন্দরে টোনি নিজেই এসেছে আমাকে নিতে। অ্যাভেন্ট ফেরি কমপ্লেক্স নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসন আছে। মূলত ছাত্রছাত্রীদের আবাস। তারই নিচতলায় একটি ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা। ঘরটি প্রশস্ত–একধারে মাইক্রোআভেন এবং হাঁড়িকুঁড়ি বাসনপত্র। লাগোয়া বাথরুম। ঘর পরিষ্কার করা, বিছানার চাদর ইত্যাদি বদলে দেওয়ার দায়িত্ব এদের। নিচতলায় লন্ড্রি আছে, পৃথক রান্নাঘর আছে।
জিনিসপত্র ঘরে রেখে টোনি আমাকে খাওয়াতে নিয়ে গেল। সে খেতে ভালোবাসে। ফলে শুধু সে-রাতে নয়, প্রায়ই আমরা একসঙ্গে লাঞ্চ অথবা ডিনার খেতাম।
পরদিন টোনি এসে আমাকে তার বিভাগে নিয়ে গেল। একটা জয়েনিং রিপোর্ট লিখলাম–জুড়ি নামে সেক্রেটারি সেটা টাইপ করে দিলো। তারপর অনেকগুলো কাগজে সই নিলো আমার। যখন উঠে বেরিয়ে আসছি, সে বললো, তোমার পি সি ফেলে যাচ্ছ।
জিজ্ঞাসা করলাম, কিসের পি সি?
বললো, তোমার কম্পিউটার–ঘরে বসে কাজ করার জন্যে।
বললাম, আমি তো তার ব্যবহার জানি না।
এবারে টোনি হাল ধরলো, এটা বিভাগ থেকে তোমার নামে বরাদ্দ হয়েছে, ঘরে নিয়ে চলো। ব্যবহার জানো না তো শিখে নেবে। শিখতে দিন দুইয়ের বেশি লাগবে না।
টোনি আমাকে নিয়ে গেল আমার ঘরে টেলিফোন-সংযোগের ব্যবস্থা করতে। তারপর সুপারমার্কেটে। সে খাবারদাবার বাছাই করছে দেখে আমি বললাম, টোনি, আমি রাঁধতে পারবো না, বাইরে খাবো।
সে বললো, অর্ধেক রান্নাকরা খাবার কিনে নাও, মাইক্রোআভেনে গরম করে নিলেই হবে। অনর্থক বাইরে খেয়ে পয়সা নষ্ট করবে কেন? ব্রেকফাস্টটা অনায়াসে ঘরে সারতে পারবে, মাঝে মাঝে দুপুর বা রাতের খাবারটাও।
নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির তিনটে ক্যাম্পাস–রলে, ডিউক ও চ্যাপেল হিল। একটার সঙ্গে যুক্ত হলে বাকি দুটোর সকল সুবিধে ভোগ করা যায়। একটা থেকে অন্যটায় যাবার বাসও আছে। রলেতে ইউনিভার্সিটির বাস সারা ক্যাম্পাস ঘোরে। উঠে পড়লেই হলো–টিকিট লাগে না। পরে বাস ড্রাইভারদের সঙ্গে চেনাজানা হয়ে গেলে তারা অনেক সময়ে নিময়ভঙ্গ করে আমার সুবিধামতো জায়গায় নামিয়ে দিয়েছে।
রলেতে পৌঁছোবার পরের দিন সন্ধ্যায় ইতিহাস বিভাগের ডেভিড গিলমার্টিন এসে আমাকে নিয়ে গেল ডিনারে। ডেভিড মজার লোক। কেউ যদি তাকে জিজ্ঞাসা করে এক পাত্র পান করবে কি না, তার উত্তর হবে, যদি তুমি জোর করো-ইফ ইউ টুইস্ট মাই আর্ম। জোর করতে হতো না, একবার বলাই যথেষ্ট হতো।
প্রথম সপ্তাহান্তেই নিমন্ত্রণ কার্ল আর্নস্টের বাড়িতে। তিনি মস্ত বড়ো পণ্ডিত। টোনি ও তার স্ত্রীকে ডেকেছেন, সেই সঙ্গে আমাকেও। টোনি শহরের বাইরে থাকে, আর্নস্টরাও শহরের অন্য প্রান্তে। টোনির স্ত্রী জুলি বড় এক কোম্পানির একজিকিউটিভ–প্রায়ই তাকে বাইরে যেতে হয়। সে-ই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল।
রলের সামাজিক জীবনে আমাদের স্বদেশিদেরও ভূমিকা কম নয়। আমি পৌঁছোবার পরপরই টেলিফোন করে আমার বাসস্থানে এলো আশফাঁক ও মাহবুব। তারা আমাকে দিনে ক্যাম্পাসে দেখেছে। তারা যে সকল সময়ে সাহায্য করতে রাজি, সে কথা জানাতেই তাদের আসা। তারা সে কথা রেখেছিল। এছাড়া খুব উল্লেখযোগ্য ফারুক ও লোপার নাম। তারা দুজনেই প্রকৌশলী, বড়ো চাকরি করে। পরিচয় পাওয়ার পরে জানলাম, ফারুকের ভাইবোনেরা আমার অনেককালের চেনা। লোপা জানালো, শৈশবে সে একদিন তার খালু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমাদের বাড়ি গিয়েছিল। এরপর তাদের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া আমার নিত্যকর্ম হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
