সেই সন্ধ্যায় আমি একটু আয়েশ করার পরিকল্পনা করেছি। সঁজে-এলিসের দিকে যাবো। পথের ধারে কোনো টেবিলে কিছু সময় কাটাবো। সন্ধ্যা নামার পরে ভালো একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করবো। কাজে যাচ্ছি না বলে ধীরপদে চলছি। একটা মেট্রোতে লাইন বদলাতে হবে। আমি ট্রেন থেকে নেমে ধীরে ধীরে হেঁটে এসকেলেটরে উঠেছি। প্রায় শেষ প্রান্তে যখন এসেছি, তখন। পেছন থেকে ধাক্কা খেলাম। আমি লাফিয়ে সমান জায়গায় পড়লাম উপুড় হয়ে। পেছন থেকে লাফিয়ে এসে একজন আমার ঘাড়ের ওপর পড়ল। সামনে থেকে একজন এলো সাহায্য করতে–আমাকে নয়, আমার আক্রমণকারীকে। আমি সাহায্যের জন্যে চীৎকার করতেই একটা ঘুসি খেলাম। মুহূর্তের মধ্যে আমার ট্রাউজারের পেছনের পকেট থেকে মানিব্যাগ, শার্টের বুকপকেট থেকে আইডি, কলম, মেট্রোর টিকিট কার্ড এবং জ্যাকেটের পকেট থেকে অ্যাড্রেসবুক নিয়ে তারা চলে গেল–শুধু পকেট-চিরুনিটা দিয়ে গেল।
ভূমিশয্যা ত্যাগ করে সিঁড়ি বেয়ে প্ল্যাটফরমে উঠলাম। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কাছে অনুচ্চকণ্ঠে জানতে চাইলাম, কেউ ইংরেজি বলেন কি না। একজন উত্তর দেওয়ায় তাঁকে আমার অবস্থার কথা বললাম। ট্রাউজারের পেছনের পকেটটা আক্রমণকারী ছিঁড়ে ফেলেছিল-সেটা দেখালাম। বললাম, আমি ফেরত যাবো, কিন্তু বিনা টিকিটে ভ্রমণ করা কি ঠিক হবে? আমার কাছে টিকিটের মূল্য সাত ফ্রা কেন, একটি ফ্রাঁও নেই। ভদ্রলোক আমাকে দশ ফ্রা দিলেন। জানতে চাইলাম, কোথায় তার অর্থ ফেরত দেবো? তিনি বললেন, ফেরত দিতে হবে না, এমন আমারও ঘটতে পারতো। ভিক্ষার টাকায় টিকিট করে ঘরে ফিরে এসে ফ্রাঁসকে ফোন করলাম। তার কাছে খবর পেয়ে প্রলয় দত্ত এলো। আমাকে নিয়ে কাছাকাছি একটা ক্যাফেতে সে অনেকখানি সময় কাটালো। স্নায়বিক আঘাতে ভুগি কি না, সেটাই বোধহয় ছিল তার দুশ্চিন্তা।
পরদিন আনোয়ার আবদেল-মালেকের বাড়িতে আমার বিদায়ী নৈশভোজ। তাকে বললাম ঘটনাটা। তিনি জানতে চাইলেন, আক্রমণকারীরা দেখতে কেমন। বললাম, সামান্য যা দেখেছি, তাতে তো আরব মনে হলো।
তা শুনে তার ফরাসি বান্ধবী খুব একচোট হাসলেন।
প্যারিস থেকে লন্ডনে এলাম কোচে। আমাকে নিতে এলেন আমার ছাত্রী হাসিনা হক ও তাঁর স্বামী, লন্ডনের সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক, নাজমুল হক। উঠলাম পূর্ব লন্ডনে আমার ছাত্রী এবং আমার বড়ো মেয়ে রুচির ননদ মুনীরা ওরফে বিউটির কাউনসিল ফ্ল্যাটে। বিউটির স্বামী নাসিরুল হোসেন ওরফে জসীমও সোনালী ব্যাংকে কর্মরত। ওদের মেয়ে মালিহা নিতান্তই ছোটো–দৌড়ঝাঁপ করে বিউটিকে ব্যস্ত রাখে। বিউটিদের বাসায় থাকার সময়ে একদিন কেমব্রিজ থেকে আমার ছাত্র মহীবুল আজিজ ও তার স্ত্রী শামীমা সুলতানা ওরফে মিতু এলো দেখা করতে। তারা দুজনেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছে। মিতু এসেছে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচ ডি করতে। মহীবুল এসেছে তাকে সঙ্গ দিতে, হাতে যথেষ্ট সময় আছে বলে লাইব্রেরিতে বসে মনের সুখে পড়ছে। তাদেরকে পেয়ে দিনটা খুব ভালো কাটলো।
নাজমুল হকদের বাড়িতেও থাকা হলো। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কাটালাম। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখি, স্থান-পরিবর্তনের উদ্যোগ চলছে। তাদের জন্যে অন্য যে-ক্যাটালগটি করেছিলাম, মনে হলো, সেটা ছাপতে সময় নেবে।
৩৬.
দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো বটে, তবে তার চর্চা তেমন নেই। সরকার ও বিরোধী দলে বিরোধ ক্রমশ বাড়ছে। ১৯৯৩ সাল থেকে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার-প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে চলেছে। সেই দাবিতে সভা-সমাবেশ-মিছিল-হরতাল চলছে। সভা-সমাবেশ-মিছিলে সরকারের পুলিশ কিংবা দলীয় কর্মীরা প্রায়শই হামলা চালাচ্ছে।
১৯৯৪ সালের ২০ মার্চে মাগুরায় উপনির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থী কাজী সলিমুল হক কামাল নির্বাচিত হলেন। এই উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে বলে সকল বিরোধী দল অভিযোগ করলো। ভোটগ্রহণের দিনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাগুরায় গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি অচিরেই ফিরে আসেন। কারো কারো মতে, তিনি ফিরে আসেন সেখানকার অব্যবস্থা দেখে অসহায় বোধ করে। যে-ধরনের ভ্রান্তির সুযোগে ট্রাজেডিতে নায়কের পতন ঘটে, সরকারের পক্ষে মাগুরা উপনির্বাচন ছিল তেমনি। অনেক কিছু করে সরকার পার পেয়ে গেছে, কিন্তু এবারে স্বেচ্ছাচারটা এত বড়োরকম হলো যে সবার ধৈর্যের বাধ ভালো। ফলে এখন থেকে সরকারের পদত্যাগ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি প্রবল হয়। এমনকী তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদা পর্যন্ত বলে ফেলেন যে, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে বিদ্যমান সংকটের সমাধান হবে। ফলে তাঁকে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত প্রবলতর হতে থাকে। বিরোধী দল সংসদ বর্জন করে, বিরোধী দলীয় নেত্রী সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেন এবং ডিসেম্বর মাসে সকল বিরোধী দলীয় সংসদ-সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন।
৩৭.
আমার বন্ধু টোনি কে. স্টুয়ার্ট নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ধর্ম ও দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা করে। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম ও বাংলার লৌকিক ধর্ম তার অধ্যয়ন-অধ্যাপনার বিশেষ ক্ষেত্র। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক এবং তার শিক্ষকতুল্য এডওয়ার্ড সি. ডিমক জুনিয়রের সঙ্গে মিলে সে তখন কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত অনুবাদ করছিল ইংরেজিতে। টোনিই আমার জন্যে একদিকে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ স্টাডিজের কাছে প্রস্তাব দিয়ে অর্থবরাদ্দ করিয়েছিল এবং অন্যদিকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে লিখে আমন্ত্রণ সংগ্রহ করেছিল।
