ফরাসি দূতাবাস থেকে টিকিট ও ভিসা সংগ্রহ করে ১৯৯৪ সালের অক্টোবর মাসে উড়ে গেলাম প্যারিসে। পরদিনই একদিনের জন্যে লন্ডন গিয়েছিলাম কোচে-ডোভার দিয়ে। প্যারিসে তিন সপ্তাহ থাকবো। সোরবোনের অদূরে একটি অতিথিশালায় আমার থাকার চমৎকার ব্যবস্থা। সেখানে ঢুকেই অতিথিদের তালিকায় নাম দেখি অনিরুদ্ধ রায়ের, কিন্তু খোঁজ করে শুনি, দিন দুই আগে পাখি উড়ে গেছে স্বদেশে। প্যারিসে আমাকে দুটি বক্তৃতা দিতে হবে সি এন আর এসে, একটি সোরবোনে এবং দুটি ইনালকোতে। সি এন আর এসে তখনো আনোয়ার আবদেল-মালেক আছেন, ক্রিস্টিন কলপা তাঁর সঙ্গে না থাকলেও ওই বিদ্যাভবনে আছেন–উভয়েই খুব খুশি আমাকে দেখে। সিতেয় না থাকলেও হাসনাত জাহানও প্যারিসে আছে এবং আছে প্রলয় দুতা অর্থাৎ দত্ত। ফ্রাঁস তো আছেনই, উপরন্তু লোকনাথ ভট্টাচার্য এখন আছেন। অধিক আর কি চাই?
আগে প্যারিসে এসে বিবলিওথেক নাসিওনালে ওগুস্তে ওসার বাংলা-ফরাসি শব্দকোষের পাণ্ডুলিপি দেখে গিয়েছিলাম। ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে চন্দননগরে সংকলিত বাংলা-ফরাসি শব্দের এই সর্বপ্রথম সংকলনটির একটি ফটোকপি সংগ্রহ করেছেন ফ্রস। প্রত্যেক সপ্তাহান্তে তার বাড়িতে বসে এর পাঠোদ্ধার করি, দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সারি, বিকেলে চা খেয়ে তবে তাঁর বাড়ি থেকে উঠি। লোকনাথ ভট্টাচার্য বেছে বেছে ওয়াইন সংগ্রহ করে রাখেন, তার সত্ত্বার হয়। ফ্রাঁস নিরামিষাশী, মদ্যমাংস স্পর্শ করেন না। আমি ঠাট্টা করলে বলেন, ভুলে যাবেন না, আমি ভাটপাড়ার পুত্রবধূ। আমি বলি, ভাটপাড়ার ঐতিহ্যরক্ষার দায়িত্ব পুত্রকে টপকে পুত্রবধূর ওপর বর্তালো কেমন করে? তিনি বলেন, আমার দায়িত্ব আমি পালন করছি, ওরটা ও বুঝে নেবে। সত্যি, খুব ভালো সময় কেটেছিল ওঁদের সান্নিধ্যে। বাজারে নতুন ওয়াইন ওঠার মোচ্ছব হয় সারা শহর জুড়ে। লোকনাথ আমাকে নিয়ে যাবেন সেখানে। কিন্তু তিনি গাড়ি চালান না। ফ্রাঁসই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন, যদিও তিনি আনন্দে শরিক হলেন না। শব্দকোষের কাজটিতেও মজা পাচ্ছিলাম। বাংলা শব্দের তালিকায় ফরাসি শব্দ ঢুকে গেছে–তা আমার পরিচিত নয়, ফ্রাঁস তা শনাক্ত করেন। আবার বাংলা বা ফরাসি শব্দের তালিকায় এমন শব্দ পাওয়া গেল, যা ফ্রাঁস বা আমি কেউ শনাক্ত করতে পারলাম না। পরে অভিধান ঘেঁটে ফ্রস বের করলেন, ওগুলো পর্তুগিজ শব্দ।
সোরবোনে তখন হেগিওগ্রাফি তথা সন্ত-জীবনী নিয়ে একটি বক্তৃতামালা চলছিল। ফ্রস তাতে আমার নাম ঢুকিয়ে দিলেন। আমি সপ্তদশ শতাব্দীর কবি সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়েছিলাম। নবীদের তালিকায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব ও হরির নাম যে কবি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, এ-তথ্য জেনে শ্রোতারা খুব মজা পেয়েছিলেন এবং এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল।
সিএনআরএসে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলাম বাংলাদেশে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে। বক্তৃতার শেষে এক মহিলা এসে বললেন, আমার নাম আন-মারি ওয়ালীউল্লাহ্। আপনার বক্তৃতা আমার ভালো লেগেছে। আমার মনে হয়, এ বিষয়ে ওয়ালীউল্লাহ যদি বক্তৃতা দিতো, সে আপনার মতোই বলতো। বললাম, তিনি নিশ্চয় অনেক ভালো বলতেন। তারপর তাকে মনে করিয়ে দিলাম যে, ১৯৬৯ সালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও তিনি যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন সৈয়দ আলী আহসানের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ থেকে আমরা তাদের নৈশভোজে আপ্যায়িত করেছিলাম। আমাকে চিনতে না পারার জন্যে আন-মারি লজ্জিত হলেন। বললাম, লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই, পরিচয় না দিলে আপনাকেও আমি চিনতে পারতাম না। ২৫ বছর আগে স্বল্পকালের জন্যে দেখা–এতদিন মনে থাকবে কী করে?
আন-মারি আশ্বস্ত হলেন। বললেন, আপনার সঙ্গে এ-যাত্রায় আরো দেখা। হবে আশা করি। আমরা টেলিফোন নম্বর বিনিময় করলাম। পরে চায়ের টেবিলে মিলিত হলাম। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে তাঁর প্রেমপূর্ণ কথাবার্তা শুনে আপ্লুত হলাম। তিনি বললেন, অচিরে তাঁর ঢাকায় যাওয়ার ইচ্ছে আছে; এলে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন।
ইনালকোতে বাংলা ভাষা-শিক্ষার্থীদের কাছে বক্তৃতা দেওয়া ছিল অন্য ধরনের ব্যাপার। আমি ইচ্ছে করেই বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করে প্রশ্ন ও উত্তর পর্বের জন্যে বেশি সময় রেখেছিলাম। সেটাই উপযুক্ত হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীরা অনেক কিছু জানতে চেয়েছিল, আমি সাধ্যমতো উত্তর দিয়েছিলাম।
এর মধ্যে ঢাকা থেকে খবর পেলাম, আমার বন্ধু টোনি স্টুয়ার্ট ফোন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে–সে আমাকে নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে দু মাসের জন্যে আমন্ত্রণ জানাতে চায়। আমি যথাসময়ে যেতে পারবো কি না, তাকে যেন জানিয়ে দিই। পরদিন ফোন করলাম টোনিকে। স্থির হলো, ফেব্রুয়ারিতে যাবো তাদের ওখানে।
আমার সর্বশেষ বক্তৃতা হয়ে যাওয়ার পরে ফ্রস আমাকে নিয়ে গেলেন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিদায় নিতে। সেখানে গিয়ে শুনলাম, থাইল্যান্ড থেকে। আগত আমার মতো এক অতিথি সেদিন সকালে ফিরতি টিকিট কিনতে এয়ারলাইনসের অফিসে যাচ্ছিলেন। পথে দুবৃত্তরা সব টাকাকড়ি ছিনিয়ে নিয়েছে। তার থেকে। উপস্থিত সকলে আমাকে সাবধানে থাকতে বললেন। আমি বললাম, আমি আছি আর দুদিনমাত্র, এতদিন যখন নিরাপদ ছিলাম, তখন আর দুটি দিন মনে হয় নিরাপদেই কাটিয়ে দিতে পারব।
