তাঁর অপরিসীম সৌজন্যও উল্লেখযোগ্য। অনুষ্ঠানের পরে চা-পানের সময়ে তিনি আমাকে তাঁর বাসভবনে আমন্ত্রণ জানালেন। আমি থাকতে পারছি না শুনে অনুযোগ করলেন, এত দূর থেকে এত কম সময় হাতে নিয়ে আসি কেন!
গোলাপের কাটার মতো এই অনুষ্ঠানেরও একটা অন্য দিক ছিল। নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানস্থল ছিল মেরিল্যান্ডের একটি কলেজের মিলনায়তন। আমরা যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে দেখি পুলিশ আর পুলিশ এবং আমাদের প্রবেশ আপাতত নিষিদ্ধ। কী ব্যাপার? কেউ ফোন করে পুলিশকে বলেছে, মিলনায়তনে বোমা পাতা আছে। অতএব সবটা তল্লাশি করে নিশ্চিন্ত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ কাউকে ঢুকতে দেবে না। বলা বাহুল্য, কিছুই পাওয়া যায়নি।
কাজটা যে কোনো উদ্যমী বাঙালির, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। সম্ভবত সেখানেও বাঙালিদের মধ্যে এ-পক্ষ ও-পক্ষ ছিল। যারা মিথ্যে খবর দিয়েছিলেন, তাঁরা অনুষ্ঠান বন্ধ করতে পারেন নি, তবে বিলম্বিত করেছিলেন।
সেবার ইকবালের জন্যে একটা অবাক-করা উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম : নজরুল-পাণ্ডুলিপি। ১৯২৬ ও ১৯২৯ সালে নজরুল ইসলাম চট্টগ্রামে এসেছিলেন। মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহারের আগ্রহাতিশয্যে। তিনি অতিথি ছিলেন বাহারের মাতামহ খান বাহাদুর আবদুল আজীজের তামাকুমুণ্ডি লেনের বাড়িতে। দুবারই একটি করে রুল-টানা খাতায় তিনি বেশ কিছু কবিতা ও গান লিখেছিলেন। প্রথম খাতার কবিতাগুলি মূলত গ্রন্থভুক্ত হয় সিন্ধু-হিল্লোল (১৯২৭) কাব্যে, দ্বিতীয় খাতার কবিতাগুলি প্রধানত চক্ৰবাকে (১৯২৯)। পাণ্ডুলিপি দুটি বাহারের কাছেই ছিল। তাঁর কন্যা সেলিনা বাহার জামান সেগুলো বাংলা একাডেমিকে প্রদান করলে নজরুলের হস্তলিপিতেই নজরুল-পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয় (১৯৯৪)। বইটির সম্পাদক সেলিনা বাহার জামান, উপদেশকমণ্ডলীর সদস্য আমি, মোহাম্মদ আবদুল কাইউম ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। মান্নান সৈয়দ পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রিত পাঠ মিলিয়ে পাঠভেদ নির্দেশ করেছিলেন। নজরুল-পাণ্ডুলিপি অত্যন্ত সুচারুভাবে মুদ্রিত হয় কাইয়ুম চৌধুরীর নির্দেশনায় এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদের আগ্রহে।
নজরুল-পাণ্ডুলিপি ছাপার আগে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল, সেটা এর আগে কোথাও বলা হয়নি। বাংলা একাডেমিকে খাতা দুটি দেওয়ার আগে সেলিনা তার ফটোকপি করে রাখতে চেয়েছিলেন। ফটোকপি করতে যে নিয়ে গিয়েছিল, সে ফিরে এলে দেখা গেল, খাতার প্রত্যেকটি পাতা বাধাই থেকে এমনভাবে বিযুক্ত করে নিয়ে ফটোকপি করা হয়েছে যে, কোন পাতা কোন খাতার তা আর বোঝার উপায় নেই এবং পাতার ক্রমও হারিয়ে গেছে। উদ্ভ্রান্ত সেলিনা ওই অবস্থায় পাণ্ডুলিপি ও ফটোকপি এনে আমাকে দেন। আমি খানিকটা শ্রমস্বীকার করে। খাতার কালি ও কাগজ এবং মুদ্রিত কবিতা দেখে দেখে খাতাদুটি পুনর্বিন্যাস করি।
যুক্তরাষ্ট্র রওনা হওয়ার পূর্বমুহূর্তে দু কপি নজরুল-পাণ্ডুলিপি সেলিনা আমার হাতে দেন ইকবালকে পৌঁছোবার জন্যে। বই পেয়ে ইকবাল যে কী খুশি হয়েছিল, তা বর্ণনাতীত।
ইকবালের ব্যবস্থাপনায় দিনদশেক ভালোই কেটেছিল। মাসুমা খাতুন ওয়ালীউল্লাহ ফাহমীদের বাড়ি গেলাম–তারা তখন একটি বাংলা বেতারকেন্দ্র চালাতে ব্যস্ত। ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগে যাওয়া এবং অনিবার্যভাবে একটি সাক্ষাৎকার দেওয়া হলো। কামরু ভাই-ভাবি তখন মেরিল্যান্ডে থাকেন বড়ো ছেলে চন্দনের কাছে। সেখানে একরাত কাটানো গেল। আমার সঙ্গে সেখানে দেখা করতে নিউ জার্সি থেকে এলো আমার খালাতো ভাই ফজলে এবং মামাতো বোন রোখসানা। আমার সম্পর্কে-নাতি সৈয়দ আখতার মাহমুদের বাড়িতে একদিন চা-পর্ব সারলাম। তারপর সে আমাকে পৌঁছে দিল ওয়াশিংটন ডিসিতে এ কে এন আহমদের বাড়িতে। সেখানে আরেক দফা চা-পর্ব।
ফিরতি পথে লন্ডনে পাঁচ-ছদিন কাটিয়ে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন।
৩৫.
ফ্রাঁস ভট্টাচার্য প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ভাষা ও সভ্যতা বিষয়ক ইনসটিটিউটে (ইনালকো) বাংলা ভাষার অধ্যাপক। তিনি অনেকদিন ধরে চাইছিলেন, তাঁর ইনসটিটিউট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিনিময় কর্মসূচি নিয়ে একটা চুক্তি হোক। তাঁদের দিকে আনুষ্ঠানিকতা চুকিয়ে তিনি আমাকে লিখলেন এ-বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তৎপর করে তুলতে। আমাদের। উপাচার্য মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা ফরাসিপ্রেমী–তার নিজের ডিগ্রিও ফ্রান্সের। তাঁকে বলায় তিনি সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। ফ্রাঁস চুক্তির খসড়া পাঠালেন এবং কিছুদিন পর জানালেন, যদিও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো সাড়া পাননি, তবু আমার কথার ওপরে নির্ভর করে ঢাকায় আসছেন চুক্তি সই করতে। আমি উপাচার্যকে সতর্ক করতে গিয়ে জানতে পারলাম, আমাদের প্রান্তে সে-চুক্তি সম্পর্কে নথিতে দরকারি টীকা-টিপ্পনী রচিত হয়নি। তখনো–খসড়াটি নথিভুক্ত হয়ে আছে মাত্র। আমার কথায় তিনি সংশ্লিষ্ট শাখাকে তাগাদা দিলেন। এদিকে ফ্রস এসে পড়লেন, আমরা তখনো প্রস্তুত নেই। উপাচার্য এবারে জোরালো তাগাদা দিলেন। চুক্তি সই হলো। ফ্রস বুঝে গেলেন, তিনি চলে গেলে নথি আবার ঘুমিয়ে পড়বে। সুতরাং তিনি উপাচার্যকে বললেন, তার ইচ্ছা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই চুক্তির অধীনে আমাকে এক মাসের জন্যে তাঁর ইনসটিটিউটে পাঠাক। সকল আর্থিক দায় ইনসটিটিউটের, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল আমাকে মনোনয়ন দেবে। পরের বছরে একজন ফরাসি বিদ্বানের শুধু স্থানীয় আতিথেয়তার ব্যবস্থা করবে বিশ্ববিদ্যালয়, তাঁর আসা যাওয়ার খরচও দিতে হবে না। উপাচার্য এ-প্রস্তাব গ্রহণ করলেন।
