অধ্যাপক মাহমুদকে দেখলাম খুব দুর্বল, কিন্তু তার মনোবল বরাবরের মতো। তবে তাঁর কথায়ও সেদিন মনোযোগ দিতে পারছিলাম না, কল্পনা দত্তের আর্তকণ্ঠ বারবার কানে বাজছিল। এঁদের কারো সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি। অধ্যাপক মাহমুদ বেঁচে ছিলেন আরো দু বছর, কল্পনা দত্তের জীবনাবসান হয় এক বছরের মধ্যেই।
যেদিন ওঁদের দেখে এলাম, তার পরদিনই বোধহয় জীবনানন্দ দাশের জন্মবার্ষিকী-উপলক্ষে তার কন্যা মঞ্জুশ্রী-আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিলাম প্রধান অতিথিরূপে। এই অত্যাশ্চর্য ব্যাপারটি কীভাবে ঘটলো, তা আনুপূর্বিক বলা চলে।
আমি একদিন মঞ্জুশ্রী দাশের একটি চিঠি পাই। জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে গবেষণা করতে–তাঁর সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে তিনি বাংলাদেশে আসতে চান এক বছরের জন্যে। আমাকে অনুরোধ করেছেন, ওই সময়ের জন্যে তাকে একটা বৃত্তি জোগাড় করে দিতে। আমি তাকে জানিয়েছিলাম, এক বৎসরের জন্যে বৃত্তি পাওয়া দুরূহ, তবে তিনি যদি অল্প সময়ের জন্যে আসেন, তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালে তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভবপর। তিনি আমাকে আর কিছু জানাননি।
এবারে রামকৃষ্ণ মিশন ইনসটিটিউটের অতিথিশালায় এক সকালে তিনি এসে হাজির। রিসেপশন থেকে আমার ঘরে ফোন করে জানাচ্ছেন, তিনি মঞ্জুশ্রী দাশ–আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
অভ্যাগতদের ঘরে গিয়ে দেখা করলাম। তাঁর চিঠির যে জবাব দিয়েছি, সেজন্যে ধন্যবাদ দিলেন। তারপর জানালেন, তিনি পিতার জন্মোৎসব করছেন, আমাকে তার প্রধান অতিথি হতে হবে। আমি যতই নিজের অযোগ্যতার কথা বলি, তিনি ততই বলেন, যে-বাংলাদেশ জীবনানন্দ দাশকে এত ভালোবাসে, সে-বাংলাদেশের প্রতিনিধিস্বরূপ আমাকেই প্রধান অতিথি থাকতে হবে। তাঁর ইচ্ছে, বাংলাদেশে জীবনানন্দ দাশকে সবাই কেমন ভালোবাসে, সে-কথাটা যেন আমি শ্রোতাদের জানিয়ে দিই।
তিনি আরেকদিন এলেন মুদ্রিত আমন্ত্রণপত্র পৌঁছোতে। সেদিন তিনি বললেন, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ক্লিন্টন বি সিলি যে আমার বন্ধু, তা তিনি জানেন। ক্লিন্টকে বলে আমি কি তাকে শিকাগো পাঠাবার ব্যবস্থা করতে পারিনে? নিশ্চয় পারি, ইচ্ছে করলেই পারি। ক্লিন্ট তো তার অচেনা নয়, বস্তুত সে তাদের পারিবারিক বন্ধুই, কিন্তু নিজের কথা তিনি কেমন করে ক্লিনকে বলবেন? আমি যদি বলি–বলা মানে সুপারিশ করা–তাহলে সবদিক রক্ষা হয়।
আমার মনে হলো, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হওয়ার আসল যোগ্যতা আমার ক্লিন্টের বন্ধু হওয়া।
অনুষ্ঠানে গেলাম বরুণ দের সঙ্গে। তিনিও বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত। জীবনানন্দ দাশ তাঁর মেসোমশায়। বরুণও বলেছিলেন যে, আত্মীয়তা সত্ত্বেও জীবনানন্দ দাশের সম্পর্কে সভাস্থলে বক্তৃতা করবার যোগ্যতা বা অধিকার তার নেই, কিন্তু সেকথা মঞ্জুশ্রীর কাছে দায়িত্ব এড়ানোর প্রয়াস বলে অগ্রাহ্য হয়েছে।
আমাদের পৌঁছোতে একটু বিলম্ব হয়েছিল–সেদিন ইনসটিটিউটে আমার বক্তৃতা ছিল, সেটা শেষ করে তবে যেতে পেরেছিলাম–তবু আমরা সাদরে বৃত। হয়েছিলাম। বরুণ সংক্ষেপে যা বললেন, তা থেকে বোঝা গেল, জীবনানন্দ দাশের প্রশ্রয় তিনি পাননি, কেননা আত্মীয় হলেও কবি মিশুক মানুষ ছিলেন না, বরং একটু সন্দেহবাতিক ছিলেন। সভায় আমার সম্পর্কে খানিকটা কৌতূহলের উদ্রেক হয়েছিল। আমি সামান্য যা বলেছিলাম, তাকে প্রধান অতিথির ভাষণ বললে অনেক বাড়িয়ে বলা হয়।
পরে আমি ক্লিন্টকে মঞ্জুশ্রীর অনুরোধের কথা জানিয়েছিলাম। ক্লিন্ট বলেছিলেন, মঞ্জুশ্রী স্বয়ং এমন একটি লিখিত প্রস্তাব তাঁকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে-ইচ্ছাপূরণ ক্লিন্টের পক্ষে দুরূহ।
তারপর মঞ্জুশ্রীও খুব বেশিদিন বাঁচেননি।
সেবার কলকাতায় আমাকে আরো একটি বক্তৃতা দিতে হয়েছিল। অনুষ্টুপ আয়োজিত সমর সেন স্মারক বক্তৃতা। ৫ মার্চে স্টুডেন্টস হলে বিশ্বভারতীর উপাচার্য অধ্যাপক সব্যসাচী ভট্টাচার্য বক্তৃতা দেন তথাকথিত বুদ্ধিজীবী : শ্রেণিচরিত্র ও রাজনীতি বিষয়ে। তারপর আমি বলি বাংলাদেশ : বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানে’ সম্পর্কে। দুটোই ছিল মৌখিক বক্তৃতা। ভাগ্যিস মৌখিক ছিল–লিখিত বক্তৃতা আবশ্যক হলে পেরে উঠতাম না।
৩৪.
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড ও ওয়াশিংটন ডিসির প্রবাসী ও অভিবাসী বাংলাদেশিরা ১৯৯৪ সালে সাড়ম্বরে নজরুল-জয়ন্তী উদ্যাপন করতে মনস্থ করেন। তাতে আমন্ত্রিত হয়ে আমি যুক্তরাষ্ট্রে যাই ২৯ বছর পরে। সেই কবে শিকাগো ছেড়েছিলাম, তারপর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দিয়ে গেছি, তার বিমানবন্দরে থেমেছি, কিন্তু দেশে ঢোকা হয়নি। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ইকবাল। বাহার চৌধুরী, তারই আতিথ্য উপভোগ করার ব্যবস্থা হয়েছে।
অনুষ্ঠানটি বেশ সুন্দর হলো। যুক্তরাষ্ট্রের নানা জায়গা থেকে শ্রোতা ও অংশগ্রহণকারীরা এসেছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রদূত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবীর। হুমায়ূন কবীর ভালো বললেন, তবে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের বক্তৃতা ছিল অতি চমঙ্কার। তিনি যে আশৈশব বাড়িতে নজরুলের কথা শুনতে শুনতে বড়ো হয়েছেন, তার মাতামহ মাতামহীর সঙ্গে নজরুলের যে কী আন্তরিক সম্পর্ক ছিল, চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুতে নজরুলের লেখা চিত্ত-নামা তাদের সকলকে যে কী অসাধারণ আলোড়িত করেছিল–সেসব কথা খুব হৃদয়গ্রাহী করে বললেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে স্মৃতি থেকে নজরুলের কবিতাংশ উদ্ধৃত করেও তিনি সকলকে চমৎকৃত করেছিলেন।
