ফেব্রুয়ারি মাসের ১৮, ১৯, ২২ ও ২৩ তারিখে মওলানা আজাদ ইনসটিটিউটে লিখিত বক্তৃতা দিই। যেদিন আমার দ্বিতীয় বক্তৃতা সেদিন সকালেই বেবী ফোন করে জানালো, আমাদের বন্ধু চৌধুরী মহীউদ্দীনের একমাত্র পুত্র বাবু ঢাকায় বাড়ির আঙ্গিনায় গাড়ি-দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মারা গেছে। মহীউদ্দীন তখন মেদিনীপুরে পীরের উরসে। এ-মর্মান্তিক খবরে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম।
Tooteome facciata 1509: A Question of Identity, Religion and Politics, Looking Back at 1971 978 Looking Forward to What? বক্তৃতার সারাংশ শ্রোতাদের মধ্যে বিলি করা হয়। প্রশ্নোত্তর-পর্বের আলোকে বক্তৃতাগুলি সামান্য পুনর্লিখন করি। রণবীরের পরামর্শও কাজে লাগাই। ইনসটিটিউটের হয়ে পর বছর তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে নয়া উদ্যোগ–Identity, Religion and Recent History নামে। বইটির উৎসর্গপত্র Boy 4997: To those friends in India/who, in 1971, had shared/our dream of Bangladesh/and our drive for its realization. 0759157 সম্পর্কে হ্যাজলিটের একটা উক্তি উদ্ধৃত করেছিলাম : ‘We often forget our dreams so speedily : if we cannot catch them as they are passing at the door, we never set eyes on them again.’gency 44 spousta on 63– স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার সম্পর্কে, আমার বিশ্বাস, কথাটা খুব প্রযোজ্য।
মার্চ মাসে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ এলো। সেখানকার স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ ডিভিশনের ড. সুখরঞ্জন চক্রবর্তী বাংলাদেশ সম্পর্কে দুদিনব্যাপী সেমিনার আয়োজন করেছেন। তিনি যখন জয়পুরে রাজস্থান ইউনিভার্সিটিতে ছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। এখন তিনি আমাকে চান তাঁর সেমিনারে। মওলানা আজাদ ইনসটিটিউটে দেওয়া একটি বক্তৃতা খানিক অদল-বদল করে পড়ে দিয়ে এলাম Religion and Politics in Bangladesh নামে। এই সেমিনারে বাংলাদেশের অনেকে ছিলেন : অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমেদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, রঙ্গলাল সেন, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ইমতিয়াজ আহমদ ও আবদুর রব খান। মওলানা আজাদ ইনসটিটিউট থেকে রণবীর সমাদ্দার ও মোহাম্মদ তাজউদ্দীন গিয়েছিল, মনে হচ্ছে বরুণ দেও। তার বাইরে মুচকুন্দ দুবের মতো কূটনীতিক ছিলেন, কলিম বাহাদুর, অনিরুধ গুপ্ত, কান্তি বাজপেয়ী, ইন্দ্রনাথ মুখার্জী, ন্যান্সি জেটলি ও শ্যামলী ঘোষসহ আরো অনেক বিদ্বজ্জন যোগ দিয়েছিলেন। সেমিনারের প্রবন্ধগুলো S. R. Chakravarty (ed.) Society, Polity and Economy of Bangladesh Foreign Policy of Bangladesh নামে দু খণ্ডে নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত হয় (১৯৯৪)।
৩৩.
মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনসটিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজের ভিজিটিং ফেলো হিসেবে ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে আমি যখন কলকাতায় থাকি, তখন একদিন শুনতে পাই, অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাব মাহমুদ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পি জি [প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অধ্যাপক এ ডব্লিউ মাহমুদ ওরফে বাচ্চু মিয়ার কথা এই রচনায় আগে বলেছি, সুতরাং তার পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন। রণবীর সমাদ্দার ও আমি তাকে দেখতে গেলাম হাসপাতালে, সঙ্গে আরো দু-একজন ছিলেন। হাসপাতালে ঢোকার মুখে তাঁদেরই কেউ যেন বললেন, ‘কল্পনা যোশীও আছেন এই হাসপাতালে, দেখতে যাবেন?’
কল্পনা যোশী আমাদের কাছে বহুদিন ধরে বহু শ্রদ্ধেয় এক নাম। ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম বিপ্লব সরকারি চাকুরে পরিবারের মেধাবী সন্তান কল্পনা দত্তকে এমনই উদ্দীপ্ত করে যে তিনি কলকাতায় অধ্যয়ন স্থগিত করে জন্মভূমি চট্টগ্রামে চলে এসে মাস্টারদা সূর্য সেনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমুখ বিপ্লবীর সঙ্গে কয়েকটি দুঃসাহসিক অভিযানে অংশগ্রহণের পর তিনি গ্রেপ্তার হন। সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গেই তার বিচার হয়, তাতে তাঁর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের আদেশ হয়, পরে তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়, তবে গান্ধির প্রচেষ্টায় ১৯৩৮ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন। তখন তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন এবং একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সি (পূরণচাঁদ) যোশীকে তিনি বিয়ে করেন ১৯৪৩ সালে, তবে তারপরও অনেক বছর চট্টগ্রামেই রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যান এবং ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে এখান থেকেই প্রার্থী হন। শুনেছি, পাকিস্তান-প্রতিষ্ঠার পরেও তিনি কিছুকাল চট্টগ্রামে ছিলেন, পরে প্রথমে কলকাতা ও তারপর দিল্লিতে থেকে সার্বক্ষণিক রাজনীতি করতেন।
সুযোগ পেয়েও কল্পনা যোশীকে দেখতে যাব না, তা কেমন করে হয়? তবে না গেলেই বোধহয় ভালো হতো। তখন তাঁর বয়স আশি পেরিয়ে গেছে, শরীর ভেঙেছে, মানসিক বিপর্যয়ও ঘটেছে। পাছে পড়ে যান, তাই বিছানার চারপাশে রেলিং দেওয়া আছে। আমাদের দেখে তার কী আকুতি! আপনারা আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবেন?’, ‘আপনারা আমার কাছে থাকবেন তো?’, ‘আমাকে ফেলে আপনারা চলে যাবেন না তো?’–সর্বক্ষণ এসব কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতে থাকলেন। একবার তার ছেলের কথা বললেন, ছেলে যে তার কাছে নিশ্চিত আসবে সেকথাও জানালেন। তারপর আবার সেই আগের কথা। আমরা চলে যাওয়ার উপক্রম করতেই কান্নাভেজা গলায় আমাদের ডাকতে লাগলেন, তার কাছে থাকতে মিনতি করতে লাগলেন। আমরা একরকম পালিয়েই গেলাম।
